মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

আলেকজান্ডারের বিশ্ব অভিযান ও তার দিগ্বিজয়ের গল্প

আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ইতিহাসে এক বহুল আলোচিত নাম। সেই সুদূর গ্রিস থেকে একের পর এক দেশ জয় করে তাঁর বাহিনী চলে এসেছিল ভারত অবধি। পারস্যের কাছে তিনি পরিচিত ইস্কান্দার বাদশাহ হিসাবে আর ভারতবর্ষে ইস্কান্দারের অপভ্রংশ সেকান্দার বাদশাহ হিসাবেও বহুল পরিচিত তিনি। দুই সহস্রাব্দ পেরিয়ে গেলেও আলেকজান্ডারকে নিয়ে বিশ্ববাসীর আগ্রহ একটুও কমেনি। আর কমবেই বা কেন? ৩২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি জয় করেছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাম্রাজ্য। শুধু তাই নয় হাতেগোনা কয়েকজন অপরাজিত জেনারেলের মধ্যেও তিনি অন্যতম। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই বীরযোদ্ধাকে নিয়ে লেখা হয়েছে আজকের ফিচারটি।
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট source: www.historyofmacedonia.orgআলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট source: www.historyofmacedonia.org
জন্ম ও বংশ পরিচয়
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের জন্ম হয়েছিল প্রাচীন গ্রিসের মেসিডোনিয়াতে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ অব্দে। তবে বর্তমানে মেসিডোনিয়া একটি সম্পুর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাঁর পিতা ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ আর তাঁর মা ছিলেন উচ্চাভিলাষী রানী অলিম্পিয়া। আলেকজান্ডারের জীবনে তাঁর মায়ের ভূমিকা ছিল অসামান্য। ছেলেবেলা থেকেই তিনি শিশু আলেকজান্ডারকে বুঝিয়েছিলেন পারস্য জয় করার জন্য তাঁর জন্ম হয়েছে। বলা বাহুল্য অলিম্পিয়া ছিলেন ফিলিপের সাত স্ত্রীর মধ্যে চতুর্থ। অন্যদিকে অসম্ভব বিচক্ষণ এবং বীরযোদ্ধা রাজা ফিলিপ বালক আলেকজান্ডারের শিক্ষার কোন ত্রুটি করেননি। জগৎবিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টোটলকে নিযুক্ত করেছিলেন আলেকজান্ডারের শিক্ষক হিসাবে। আলেকজান্ডার আর দশজন অভিজাত গ্রীক কিশোরের মতই শিখছিলেন দর্শন, শরীরচর্চা ও যুদ্ধবিদ্যা। প্রায় তিন বছর সান্নিধ্যে থাকার পর ১৬ বছর বয়সে এরিস্টোটলের কাছে তাঁর পাঠগ্রহণ সম্পুর্ণ হয়। এরপর আলেকজান্ডার যোগ দেন পিতার সামরিক বাহিনীতে। অসম্ভব সাহসিকতার সাথে লড়েন প্রতিটি যুদ্ধে।
উপদেশরত গুরু এরিস্টোটল ও শ্রবণরত শিষ্য আলেকজান্ডার source: quotesgram.comউপদেশরত গুরু এরিস্টোটল ও শ্রবণরত শিষ্য আলেকজান্ডার source: quotesgram.com
ক্ষমতায় আরোহণ ও উত্থান
আলেকজান্ডারের উত্থান বুঝতে হলে আমাদের ধারণা থাকা দরকার তৎকালীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলো সম্পর্কে। সে জামানায় গ্রিস একক কোন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলনা বরং বিভক্ত ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট নগররাষ্ট্রে। পরাক্রমশালী পারস্য সাম্রাজ্যে বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য স্পার্টানরা ছাড়া বাকি সবাই জোটবদ্ধ হয়ে তখন সম্মিলিত বাহিনী গঠন করেছিল। আলেকজান্ডারের পিতা ছিলেন সেই সম্মিলিত বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার। মূলত তাঁর একক সামরিক প্রচেষ্টাতেই বিবাদমান নগর রাষ্ট্রগুলোকে এক ছাউনিতে আনা সম্ভব হয়েছিল। পারস্য জয় করা ছিল ফিলিপের একান্ত বাসনা। কিন্তু পারস্য অভিযানের আগেই ফিলিপ আততায়ীর হাতে নিহত হলেন। আলেকজান্ডারের বয়স যখন কুড়ি ছুই ছুই। পিতার স্থালাভিসিক্ত হতে সর্বাত্নক চেষ্টা চালালেন যুবক আলেকজান্ডার। সফলও হলেন তিনি। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৬ অব্দে বসলেন মেসিডোনিয়ার সিংহাসনে। মূলত আলেকজান্ডারের ঘটনা বহুল জীবনের বাঁক শুরু হল এখান থেকেই। মেসিডোনিয়ার মসনদে বসার পর আলেকজান্ডার আর মাত্র ১৩ বছর জীবিত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি জয় করে নেন পারস্য, মিশর, ব্যবিলন ও ভারতের পাঞ্জাব।
আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের মানচিত্র source: kids.britannica.comআলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের মানচিত্র source: kids.britannica.com
এদিকে ফিলিপের মৃত্যুকে কেন্দ্র গ্রিসের নগররাষ্ট্র গুলো দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ল। তরুণ আলেকজান্ডারের নেতৃত্ব মেনে নিতে চাইলনা অনেকই। আলেকজান্ডার এবার বুঝতে পারলেন বিবাদমান নগর রাষ্ট্রগুলোকে এক শিবিরে আনতে না পারলে তাঁর পিতার পারস্য জয়ের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই রয়ে যাবে। তাই আলেকজান্ডার অভিযান শুরু করলে প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে। খুব শক্ত হাতে বিদ্রোহ দমন করে অচিরেই সম্মিলিত বাহিনী প্রস্তুত করলেন পারস্য অভিযানের উদ্দেশ্যে। আলেকজান্ডারের পদাতিক সৈন্যসংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের মত আর অশ্বারোহী সৈন্য ছিল প্রায় ৬ হাজার। এছাড়া তাঁর ১২০ টি জাহাজে ছিল ৪০হাজারের মত নাবিক ও মাঝি মাল্লা।
পারস্য অভিযান
পারস্য অভিযানের আগে চতুর আলেকজান্ডার অভিযান চালালেন বলকান অঞ্চলে। উদ্দেশ্যে পারস্য প্রবেশের পথটা একদম পরিষ্কার করা। বলে রাখা ভাল আলেকজান্ডারের পারস্য বিজয় একদিনে কিংবা একটি যুদ্ধে সম্ভব হয়নি। আসলে সেটি হওয়ার কথাও না। কারণ পারস্য সাম্রাজ্যের মত বিশাল সাম্রাজ্যকে পদানত করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। এশিয়া মাইনর অর্থাৎ বর্তমান তুরস্কে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে পারসিয়ানদের সাথে জেতার পর আলেকজান্ডার মিশর দখলের উদ্দেশ্যে প্রায় বিনা বাঁধায় এগিয়ে যেতে থাকেন। যদিও সে যুগে মিশর আর আগের মিশর ছিলনা। অতীত জৌলুস হারিয়ে মিশর তখন পারস্য সাম্রাজ্যের সামান্য অংশ মাত্র। তবে মিশরে প্রবেশের পথে বর্তমান ফিলিস্তিনের গাজায় শক্তিশালী বাঁধার সম্মুখীন হন আলেকজান্ডার। যদিও গাজা জয় করার পর নির্বিচারে পুরুষদের হত্যা ও নারীদের বন্দীর নির্দেশ দিয়ে অত্যন্ত হঠকারিতার পরিচয় দিয়েছিলেন আলেকজান্ডার। গাজা জয়ের পর টায়ার নগর অবরোধ করেন তিনি। টায়ারের পরিণতিও হয়েছিল গাজার মতই। আলেকজান্ডার মিশরে পৌঁছালে তাঁকে মিশরের নতুন ফারাও ঘোষণা করা হয়। তারপর শুরু হয় পারস্যের বিরুদ্ধে তাঁর মূল অভিযান। বেশ কয়েকটি যুদ্ধের পর খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে অবশেষে বিখ্যাত গগোমেলার যুদ্ধে পারস্যের রাজা তৃতীয় দারিয়ুস চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন আলেকজান্ডারের কাছে। পরাজিত দারিয়ুস সাম্রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যান পরে তার সেনাপতিরাই তাকে হত্যা করে।
পারস্যের জয়ের পথে আলেকজান্ডারের বাহিনী source: www.historyofmacedonia.orgপারস্যের জয়ের পথে আলেকজান্ডারের বাহিনী source: www.historyofmacedonia.org
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান
পারস্য বিজয়ে পর খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। সে সময় উত্তর-পশ্চিম ভারত অনেকগুলো পরস্পর বিবাদমান ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল । প্রথমে আলেকজান্ডার পুষ্কলাবতীর রাজা অষ্টককে, তারপর অশ্বক জাতিকে পরাজিত করেন। অন্যদিকে তক্ষশীলার রাজা তার নিকট স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন কিন্তু ঝিলামের রাজা পুরু তাঁর বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত ও বন্দী হন। বন্দী পুরু ও আলেকজান্ডারের ঘটনা তো সর্বজনবিদিত। সবমিলিয়ে ভারতবর্ষে প্রায় ১৯ মাসের মত ছিলেন আলেকজান্ডার।
alex8_newভারতীয়দের সাথে আলেকজান্ডারের বাহিনীর যুদ্ধ source: www.historyofmacedonia.org
এদিকে দীর্ঘদিন মাতৃভূমির বাইরে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী আর সামনে অগ্রসর হতে চাইলনা। তাই বাধ্য হয়ে তিনি ফিরে গেলেন পাঞ্জাব থেকে। ফেরার পথে বিজিত অঞ্চলগুলোতে শাসন পাকাপোক্ত করার জন্য কিছুদিন করে অবস্থান করেন আলেকজান্ডার। পথিমধ্যে ব্যাবিলনে থাকা অবস্থায় নেবুচাদনেজারের প্রাসাদে অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুর পর আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্য তাঁর ৭ জন সেনাপতি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। ভারত পড়েছিল সেনাপতি সেলুকাসের ভাগে। তবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থানের কারণে ভারতবর্ষে গ্রিক শাসন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
আলেকজান্ডার মৃত্যু
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের মৃত্যু আজও এক বিরাট রহস্য। আমরা এমন এক সময়ের কথা বলছি যখন না ছিল আজকের মত উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, না ছিল উন্নত মানের ফরেন্সিক টেস্ট। তাই ঠিক কি কারণে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়েছিল তা বলা দুষ্কর। এই ব্যাপারে দুটি মত প্রচলিত। প্রথমটি হল ম্যালেরিয়া দ্বিতীয়টি হল বিষ প্রয়োগে মৃত্যু। তবে প্রথমটির পক্ষেই বেশি সমর্থন পাওয়া যায়। মৃত্যুর আগে আলেকজান্ডার দুই সপ্তাহের মত শয্যাশায়ী ছিলেন। অবশেষে ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১০ বা ১১ জুন পরলোকগমন করেন দিগ্বিজয়ী এই মহাবীর।
মৃত্যু সজ্জায় আলেকজান্ডার source: www.history.comমৃত্যু সজ্জায় আলেকজান্ডার
যেখানে অনন্য আলেকজান্ডার
আলেকজান্ডার ইতিহাসে কেন অনন্য? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের চলে যেতে হবে প্রাচীন পৃথিবীতে। ইতিহাসে কেবল একজন মানুষই আলেকজান্ডারের চেয়েও বেশি এলাকা জয় করতে পেরে ছিলেন আর তিনি হলেন চেঙ্গিস খান। আলেকজান্ডারের মত চেঙ্গিসও ছিলেন একজন অপরাজিত জেনারেল। আলেকজান্ডার যেমন বিবাদমান গ্রীক নগর রাষ্ট্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন ঠিক তেমনি তাঁর ১৫০০ বছর পরে জন্ম নেওয়া চেঙ্গিস ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন মঙ্গোলিয়ার বিবাদমান ছোট ছোট গোত্রগুলোকে। তবে আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্যের প্রায় অর্ধেক। শুধু তাই নয় উত্তরাধিকারী না থাকায় আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্য তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে চেঙ্গিসের উত্তরাধিকারীরা সাফল্যের সাথে পিতার সাম্রাজ্যকে আরও অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত করেছিল। এই পর্যায়ে একটি প্রশ্ন চলে আসে তাহলে কে বেশি সফল? আলেকজান্ডার না চেঙ্গিস? উত্তর সহজ নয়। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সাথে পারস্য সাম্রাজ্যের প্রায় এক সহস্রাব্দের অধিক সময় জুড়ে চলামান বিবাদে একমাত্র আলেকজান্ডারই পেরেছিলেন সম্পুর্ণভাবে পারস্যকে পদানত করতে যেটা করে দেখাতে পারেননি আর অন্য কোন ইউরোপীয় জেনারেল কিংবা সম্রাট। শুধু তাই নয় পারস্য হয়ে আলেকজান্ডার চলে এসেছিলেন সোজা ভারতে যা পরবর্তী ২০০০ বছরে অর্থাৎ ইংরেজদের আগে আর কেউ পারেনি।
চেঙ্গিস খানের ইতিহাস ঘাটলে ধ্বংস ও মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রায় ৪ কোটি মানুষের মৃত্যুর জন্য চেঙ্গিস প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। বেইজিং, উরগেঞ্জ, সমরখন্দের মত শহর সম্পুর্ণ ধ্বংস হয়েছিল তার তান্ডবলীলায়। অন্যদিকে আলেকজান্ডার শুধু বিজেতাই নন, বিচক্ষণ শাসকও। তবে ফিলিস্তিনের গাজা, টায়ার ও অন্যান্য কিছু শহরে আলেকজান্ডারও ভয়ানক গণহত্যা চালিয়েছেন। কিন্তু একটি কথা অনস্বীকার্য নতুন দেশ জয় করে তিনি সেদেশের সভ্যতা ধ্বংস করেননি বরং আত্মীকরণ করেছেন তাদের সংস্কৃতি। যেমন পারস্য জয়ের পর আলেকজান্ডারকে দেখা গেছে পারসিয়ান পোশাকে কিংবা ভারতের রাজা পুরুর সাথে গড়ে উঠেছিল তাঁর সখ্যতা। সবমিলিয়ে আলেকজান্ডার সেতু বন্ধন রচনা করেছিলেন প্রাচ্যের সাথে পাশ্চাত্যের। ভারত, পারস্য ও গ্রীক এই তিনটি মহান সভ্যতার সম্মিলন খুব অল্প সময়ের জন্য সম্ভব হয়েছিল তাঁর বিজয়াভিযানের ফলে। তাই ইতিহাসে আলেকজান্ডার এত অনন্য, এত বেশি আলোচিত।
ইতিহাসের সাক্ষী পাঁচ গাছ
গাছ শব্দটির মধ্যে কোথাও যেন একটা জীবনের ঘ্রাণ রয়েছে। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর হাত ধরে গাছের প্রাণ ও অনুভূতির উপস্থিতি আজ আর নতুন করে ভাবনার রসদ জোগায় না। তবুও গাছের সাথে যেন সুনিবিড় সম্পর্ক আমাদের। সামান্য গাছ বিহীন এলাকা হলেই অক্সিজেন এর অভাব আর জীবনের নাভিশ্বাস নিয়ে তর্ক বিতর্কের অন্ত রাখি না। আজ কাল তাই গাছ লাগাও স্লোগান আর কর্মসূচী নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার মাত্র।
ঘরের সামনের বাগানের সদ্য ফোটা ফুলটা দেখলে মন কতই না আনন্দে মেতে ওঠে। আবার পারিবারিক পরম্পরায় অনেক গাছ সাক্ষী হয়ে থাকে অনেক বাস্তব গল্পের। তেমনি ইতিহাসের সাথে গাছের সম্পর্ক সুনিবিড় এবং চিরন্তন। অনেক গাছ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের ধারক ও বাহক তা আজ আর বলতে দ্বিধা নেই। আজ তেমনি পাচটি গাছের কথা বলতে যাচ্ছি যার সাথে রয়েছে ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার যোগ।
জাপানি চেরি ট্রি, ওয়াশিংটন ডিসি
যারা ওয়াশিংটন ডিসি তে বেড়াতে গিয়েছেন বা কিছুটা হলেও জানেন তাদের কাছে এর চত্বরে টাইডাল বেসিনের চেরি গাছগুলো সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। এই গাছগুলোতে চেরি ফুল যখন ফুটে রঙিন হয়ে ওঠে তখন বোঝা যায় বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। এই চেরি গাছগুলো দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি এর পেছনে রয়েছে এক সৌহার্দের ইতিহাস।
জাপানি চেরি ট্রি, ওয়াশিংটন ডি সিজাপানি চেরি ট্রি, ওয়াশিংটন ডি সি
১৯১২ সালের ৭ মার্চ টোকিওর মেয়র ইয়ুকিও ওজাকি ওয়াশিংটনকে উপহারস্বরূপ তিন হাজার চেরি গাছ পাঠান দুদেশের মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক এগিয়ে নিতে। পরে একাধিকবার উপহার বিনিময় হয় এই দুদেশের মধ্যে কিন্তু এই চেরি গাছ আদান প্রদান এর ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয় চেরি ব্লসম ফেস্টিভ্যাল। চার সপ্তাহ ধরে চলে এই উৎসব। ২০১২ সালে খুব ধুম ধামের সাথে চেরি গাছের এই উৎসবের শত বৎসর উদযাপন করা হয়। সত্যি চেরি গাছের পেছনে যে লুকিয়ে রয়েছে কত আবেগ আর স্মৃতি।
ইমান্সিপেশন ওক, ভার্জিনিয়া
ইমান্সিপেশন ওক গাছটির রয়েছে এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য। আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত হাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে এই গাছটি। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকান সিভিল ওয়ার-এর সময় ফোর্ট মনরো ছিল আফ্রো-আমেরিকান দাসদের কাছে মুক্তির জায়গা। ১৮৬১ সালে ‘আমেরিকান মিশনারি এ্যাসোসিয়েশন’ মেরি স্মিথ পিককে অনুরোধ করে এই সদ্যমুক্ত ক্রীতদাসদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য। এই ওক গাছটির নিচেই শুরু হয় ক্রীতদাসদের প্রথম পাঠশালা।
ইমান্সিপেশন ওক, ভার্জিনিয়াইমান্সিপেশন ওক, ভার্জিনিয়া
পরবর্তীতে এই গাছটি আরও মূল্যবান কিছু ঘটনারয় সাক্ষী হয়ে যায়। ১৮৬৩ সালে এই গাছটির নিচেই অসংখ্য আফ্রো-আমেরিকান মানুষ একত্রিত হন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের বিখ্যাত সেই দাসমুক্তির ওপর ভাষণ শোনার জন্য। এর পর থেকেই গাছটি পরিচিত হয়ে আসছে ‘মুক্তির ওক গাছ’ হিসেবে যেটি দাসবিরোধী ও বর্ণবাদ বিরোধী ইতিহাসের প্রতিবাদ চিহ্ন হিসেবে এখনও স্থির দাঁড়িয়ে আছে।
অ্যানা ফ্রাঙ্ক চেস্টনাট ট্রি, আমস্টারডাম
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জার্মানির প্রবল আগ্রাসনের কবলে নেদারল্যান্ডস। নাৎসিদের থেকে প্রাণে বাঁচতে বিভিন্ন পরিবার গোপন আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে। জার্মান লেখিকা অ্যানা ফ্রাঙ্ক তখন অনেক ছোট। সে ও তার পরিবার প্রাণে বাঁচতে আশ্রয় নেয় একটি গোপন ডেরায়। পরে এই বাড়িটি অ্যানা ফ্রাঙ্ক হাউজ নামে পরিচিতি পায়। এই বাড়িটিতে এমনই সুব্যবস্থা ছিল যে ঘরের সদর দরজা ঢেকে রাখা হয়েছিল বইয়ের আলমারি দিয়ে। এই বাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যেত একটি চেস্টনাট ট্রি। অ্যানার বিবর্ণ সময় কাটত সেই গাছটির দিকে নিষ্পলক চেয়ে থেকে। এই গাছটির দিকেই তাকিয়ে থেকেই হয়তো তিনি খুঁজে নিতেন স্বাধীনতার অপূর্ণ ইচ্ছে।
বাড়ির জানালা দিয়ে দেখা অ্যানা ফ্রাঙ্কের চেস্ট নাট ট্রিবাড়ির জানালা দিয়ে দেখা অ্যানা ফ্রাঙ্কের চেস্ট নাট ট্রি
ডায়রি লেখার অভ্যাস ছিল অ্যানার। তিন তিনবার গাছটির কথা লেখেছিলেন তিনি তার ডায়েরি ‘দ্য ডায়েরি অফ আ ইয়ং গার্ল’ এ। ১৯৪৪ সালের ১৩ মে তার ডায়েরিতে তৃতীয় বারের মত এই গাছটির কথা উল্লেখ করেন। ‘সাপোর্ট অ্যানা ফ্রাঙ্ক ট্রি’ ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন দেখাশুনা করা হয় ইতিহাসের স্মারক এই গাছটিকে। ২০১০ সালের ২৩ আগস্ট প্রবল ঝড়ে গাছটি ভেঙ্গে পড়ে। সেই সময় গাছটির বয়স হয় আনুমানিক ১৫০ থেকে ১৭০ বছর। তবে পরবর্তীতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এই গাছটির বীজ লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়।
অ্যানা ফ্রাঙ্ক চেস্টনাট ট্রি, আমস্টারডামঅ্যানা ফ্রাঙ্ক চেস্টনাট ট্রি, আমস্টারডাম
সেপ্টেম্বর ইলেভেন সারভাইভর ট্রি, নিউইয়র্ক
এবার আসছি ৯/১১ এর কথায়। ৯/১১ নিয়ে লিখতে গেলেই হাত শিউরে ওঠে। অনেক নির্মম ধ্বংস চিত্র চোখের সামনে ফুটে ওঠে। কম বেশি সবারই এই দিনটির কথা জানা। কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও একটি গাছ রয়ে গেছে সেই ভয়াল দিনের সাক্ষী হয়ে। গাছটি প্রজাতিতে ক্যালারি পিয়ার গোষ্ঠীর।
সেপ্টেম্বর ইলেভেন সারভাইভর ট্রি, নিউ ইয়র্কসেপ্টেম্বর ইলেভেন সারভাইভর ট্রি, নিউ ইয়র্ক
৯/১১ এর পর উদ্ধারকাজের সময় প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় গাছটিকে পাওয়া গিয়েছিল। ডালপালা ভেঙে চুরমার অবস্থা, শিকড়ের কোন অস্তিত্ব নেই। অনেকটা অংশ পুড়ে যাওয়া সত্ত্বেও গাছটিকে সিটি ডিপার্টমেন্ট এর আওতায় নিয়ে আসা হয়। ধীরে ধীরে অনেক যত্নের পর গাছটিকে সুস্থ করে তোলা হয়। ২০১০ সালে ৯/১১ মেমোরিয়ালে গাছটি পুনরায় প্রতিস্থাপন করা হয়। গাছটি ৯/১১ এর এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে রয়েছে যা দেখতে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ ভিড় করে নিউইয়র্ক এ ৯/১১ এর নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
বোধিবৃক্ষ, ভারত
গৌতম বুদ্ধের নাম শুনেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। আর বুদ্ধের সাথে জড়িয়ে আছে একটি ডুমুর গাছের নাম যা পরবর্তীতে বোধিবৃক্ষ নামে পরিচিতি লাভ করে। বিহারের বুদ্ধগয়ায় এই ডুমুর গাছটি অবস্থিত।
বোধিবৃক্ষ, ভারতবোধিবৃক্ষ, ভারত
সিদ্ধার্থ গৌতম তখনও ‘বুদ্ধ’ হয়ে ওঠেন নি। সেই সময় সিদ্ধার্থ পৃথিবীর মানুষের দুঃখ দেখে বড্ড কষ্ট পান। তিনি এই দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান। সেই লক্ষে সিদ্ধার্থ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। একদিন পৌঁছে যান উরুবেলায় (বর্তমান বিহারের গয়া)। সেখানে এই গাছটির নিচে বসে সাতদিন ধরে কঠোর তপস্যা করেন। এই তপস্যার ফলে সিদ্ধার্থ ‘বোধি’ বা পরম জ্ঞান প্রাপ্ত হোন। মহাবোধি মন্দিরের এই গাছ তাই ঐতিহাসিক তাৎপর্যের পাশাপাশি পবিত্র বলেও ধরা হয়ে থাকে।
কিন্তু ভগবান বুদ্ধ যে গাছটির নিচে বসে সাধনা করেছিলেন সেই গাছটি এখন নেই। বর্তমানে যে গাছটি রয়েছে সেটিকে সেই ‘পবিত্র’ গাছটির বংশধর হিসেবে ধরা হয়। বলাই বাহুল্য এই গাছটির প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের রয়েছে দুর্নিবার আগ্রহ। এই আগ্রহ মেটাতে মহার্ঘ এই গাছ দর্শনে দেশ বিদেশের প্রচুর লোক ভিড় করে এই ডুমুর তলায়।
‘ইতিহাস’ শব্দটির মধ্যে সব সময় কোন কিছু না দেখাকে দেখা, না জানাকে জানার এক ধরনের আকুলতা বিরাজ করে। জানার আগ্রহ থেকে ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে আমরা জানতে চাই। শুধু যেন জানার মধ্যে জ্ঞান সীমিত থাকতে চাই না। জন্মায় চাক্ষুষ দেখার আগ্রহ। সে তো আর সম্ভব নয়। তার চাইতে বরং ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে যে সব গাছ এখনো বেঁচে আছে তাদের চোখ দিয়েই ইতিহাসের সেই সময়টাকে ধরার চেষ্টা করি।
তেলের স্বার্থ নিয়ে ঘটে যাওয়া বিশ্বের ৫ যুদ্ধ
বিশ্ব অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে তেল বা জ্বালানি বহুল আলোচিত একটি শব্দ। বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটের অনেক কিছুই এই তেলের সঙ্গে সম্পর্কিত। যে দেশ যত বেশি তেল বা গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ তাদের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোরও রয়েছে বেশ আগ্রহ। তেলের জন্য যুদ্ধকথন তাই আজ আর শুধু মুখের গল্প বা চায়ের কাপেই ঝড় তোলে না, কাগজে কলমেও এর প্রমাণ মেলে। বিগত পাঁচ দশক ধরে ছোট-বড় অনেক যুদ্ধের সূচনা এই তেলের কারণেই সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। এমনকি এখন সিরিয়া ও ইরাকে যে যুদ্ধ চলছে তার নেপথ্যেও রয়েছে এই তেল। বিভিন্ন যুদ্ধের ভুমিকায় তেলের কারণ উঠে এসেছে এই রকম পাঁচটি যুদ্ধ নিয়ে আমাদের আলোচনা।
তেলের খনিতেলের খনি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এযাবৎকালে সংঘটিত সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল, এই ছয় বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়সীমা ধরা হলেও ১৯৩৯ সালের আগে এশিয়ায় সংগঠিত কয়েকটি সংঘর্ষকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। তৎকালীন বিশ্বে সকল পরাশক্তি এবং বেশিরভাগ রাষ্ট্রই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং দুইটি বিপরীত সামরিক জোটের সৃষ্টি হয়, মিত্রশক্তি আর অক্ষশক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অনেকগুলো কারণের মধ্যে ফ্যাসিবাদকে অন্যতম বলে ভাবা হয়। যদিও এই যুদ্ধের নেপথ্যে তেলের ভূমিকাও কোন অংশে কম নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান যখন চীনে অভিযান চালায় তখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে সুসম্পর্ক হেতু জাপানে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। জাপানের অর্থনীতি পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল আমদানি করা তেলের ওপর। এতে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবারে আক্রমণ চালায়। অন্যদিকে ইউরোপীয় রণক্ষেত্রে সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের তেলসমৃদ্ধ তলপেট দখল করাই ছিল জার্মানদের একটি প্রধান লক্ষ্য। ফলে, তেলের জন্যই যে যত যুদ্ধ তা আর না বোঝার কোন অবকাশ রাখে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
১৯৫৩ সালের ইরান অভ্যুত্থান
১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন মিলে ইরানে অভ্যুত্থান ঘটায়। এই অভ্যুত্থানের পেছনে তেলের স্বার্থ ছিল বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। সেই সময়কার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের সরকারকে তারা ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এর প্রধান কারণ ছিল যে তিনি ইরানে ব্রিটিশ মালিকানাধীন তেল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করেছিলেন। এরপর থেকেই মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়। এর পরিণতিতেই কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়, ক্ষমতাচ্যূত হন রেজা শাহ পাহলভি। ১৯৭৯ সালে ঘটা এটি এমন এক অভ্যুত্থান যেটা ইরানকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির উদারনীতি থেকে আয়াতুল্লাহ খামেনীর ইসলামি রক্ষণশীল দেশে পরিণত করে।
১৯৫৩ সালের ইরান অভ্যুত্থান১৯৫৩ সালের ইরান অভ্যুত্থান
পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ
২ আগস্ট, ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে এই যুদ্ধের ব্যাপ্তিকাল শেষ হয় ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম নামে সমধিক পরিচিত এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় ইরাক এবং ৩৪টি দেশের জাতিসংঘ অনুমোদিত যৌথ বাহিনীর মধ্যে। ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে ইরাকের কুয়েত আগ্রাসন এবং কুয়েতি ভূখণ্ড দখলের প্রেক্ষিতে ইরাকী বাহিনীর হাত থেকে কুয়েতকে মুক্ত করাই ছিল এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য।
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের আগে যেসব যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হতো, সেগুলোতে একটা জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল ‘তেলের জন্য রক্ত নয়’। এই যুদ্ধে তেলের স্বার্থ যে সবচেয়ে বড় ছিল তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। ইরাক মূলত কুয়েতের তেল সম্পদের লোভেই প্রতিবেশি দেশ দখল করে নেয়। সাদ্দাম হোসেন অবশ্য কুয়েতকে তাদের একটি প্রদেশ হিসেবে দাবি করে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা কুয়েতকে দখলমুক্ত করে নেয়। এর মূলেও যে তেলের স্বার্থ রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। তারা চেয়েছে কুয়েতের বিপুল তেলের সরবরাহ যেন তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তাই তারা কুয়েতকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধপারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ
২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ
২০০৩ সালের ২০শে মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত বাহিনীর ইরাক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল ইরাক যুদ্ধ। এই আগ্রাসী বাহিনীতে অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড এবং অন্যান্য কয়েকটি জাতির সৈন্যদল অংশ নিয়েছিল। ইরাক আক্রমণ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও কোয়ালিশন বাহিনী যে কারণ দেখিয়েছিল তা হল: ইরাক ১৯৯১ সালের চুক্তি অমান্য করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ করছে এবং তাদের কাছে এ ধরনের অস্ত্রের মজুদও আছে। তখন সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিল, ইরাক হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় ধরণের হুমকি। কিন্তু লোক দেখানো এসব কারণের পেছনে যে মূল কারণ ছিল তেল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যখন ইরাক যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, তখন তৎকালীন ইরাকি উপ-প্রধানমন্ত্রী তারেক আজিজ বলেছিলেন, ইরাকের তেলের লোভেই পশ্চিমা শক্তি এই যুদ্ধে যাচ্ছে। আরব বিশ্বে সে সময় এই ধারণাটাই আসলে বদ্ধমূল ছিল। ইরাকের রয়েছে বিপুল তেলসম্পদ। বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই তেলের স্বার্থ ঐ যুদ্ধের অন্যতম কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন, যাদের কোন ভাবেই সাদ্দাম হোসেনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বলা যাবে না, তারাও এক নিবন্ধে এ কথা স্বীকার করে। ইকোনমিস্টের ঐ নিবন্ধে বলা হয়, ইরাকের বিপুল তেল সম্পদ উন্মুক্ত করা এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। অন্যদিকে সাদ্দাম হোসেন যেভাবে এই তেলসম্পদকে ইরাকের প্রভাব বৃদ্ধির কাজে লাগাচ্ছিলেন, সেটা বন্ধ করাও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্দেশ্য ছিল।
২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ
সিরিয়া এবং ইরাকের যুদ্ধ, ২০১১ থেকে বর্তমান
বর্তমানে সিরিয়া আর ইরাকের যুদ্ধ বহুল আলোচিত একটি বিষয়। ইসলামিক স্টেট ঘোষণা করা সিরিয়ার তেলের যে ভাণ্ডার তার প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর লালায়িত চোখ বহু আগে থেকেই। এই যুদ্ধে তেলের যে বিরাট ভূমিকা আছে তা মোটামুটিভাবে সন্দেহাতীত। কথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গীদের আয়ের বড় উৎস তেল সম্পদ। তারা সিরিয়া তেল সমৃদ্ধ অঞ্চলের বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণ করে। ইরাক যুদ্ধের পেছনেও ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর তেলের স্বার্থ। ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট প্রতিদিন দুই মিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রি করত বলে ধারণা করা হয়। ইরাকের মোসুলের কাছে অনেক তেলকূপও তাদের দখলে। এই তেল নাকি তারা চোরাচালানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পক্ষের কাছে বিক্রি করে। চোরাচালানিরা আবার এই তেল বিক্রি করে সিরিয়ার আসাদ সরকার থেকে শুরু করে প্রতিবেশি তুরস্কের কাছে। রাশিয়া আসলে তাদের অভিযোগে এই বিষয়টির দিকেই ইঙ্গিত করেছে। বিবিসির সংবাদ দাতা ফ্রাংক গার্ডনার বলছেন, তেল নিয়ে এই ব্যবসা যে চলছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এতে তুরস্কের সরকার জড়িত থাকার কোন প্রমাণ এখনো নেই।
২০১১ সাল থেকে চলমান সিরিয়া-ইরাক যুদ্ধ২০১১ সাল থেকে চলমান সিরিয়া-ইরাক যুদ্ধ
তেলের জন্য তৈলাক্ত রাজনীতি আজ আর মুখের কথা নয়। বিভিন্ন আগ্রাসানের নেপথ্যে রয়েছে তেলের জন্য লালসা। তেল পশ্চিমা বিশ্বের এক অপরিহার্য উপজীব্য। তেলের জন্য হাহাকার তাই পুরো বিশ্বে। আর এই তেলের বিভিন্ন উৎস ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। এই তেলের জন্য এসব দেশকেও কম মূল্য দিতে হচ্ছেনা। প্রতিনিয়ত তেলের চাহিদা বেড়ে চলেছে আর তেল সমৃদ্ধ এসব দেশ দিন দিন আরও ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর কোন সমাধান অদূর ভবিষ্যতেও আছে কিনা তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
দু:সাহসী অভিযাত্রীদের নায়াগ্রা জলপ্রপাত অতিক্রমের ভয়ঙ্কর সব গল্প
নায়াগ্রা ফলস সম্পর্কে আমরা সকলেই কম বেশি জানি। আমেরিকায় নায়াগ্রা জলপ্রপাত বিখ্যাত এক পর্যটন কেন্দ্র। উত্তর আমেরিকার নিউইয়র্ক ও কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সীমান্তে এই নায়াগ্রার অবস্থান। ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ যেমন আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিতির চিহ্ন ঠিক তেমনি ২৮ অক্টোবর ১৮৮৬ সালের আগে নায়াগ্রাই ছিল এখানকার প্রধান আকর্ষণ।
নায়াগ্রা ফলস নায়াগ্রা ফলস
দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ছুটে আসেন প্রকৃতি সৃষ্ট এই জলপ্রপাতের সৌন্দর্য দেখার আশায়। নায়াগ্রার দুটো অংশ। মাঝখানে রয়েছে গোটা আইল্যান্ড। এই আইল্যান্ডের যুক্তরাষ্ট্রের অংশে রয়েছে আমেরিকান ব্রাইডাল ভেল ও কানাডার অংশে রয়েছে হর্স শু জলপ্রপাত। এই তিনটি জলপ্রপাত নিয়ে তৈরি সমগ্র নায়াগ্রা অঞ্চল।
নায়াগ্রা ফলসনায়াগ্রা ফলস
অনুমান করা হয়, আজ থেকে প্রায় দশ হাজার নয়শ বছর আগে এই জলপ্রপাতকে প্রথম চিহ্নিত করা হয়েছিল। পর্যটকদের কাছে এক ভয়ংকর সুন্দর নায়াগ্রা জলপ্রপাত। জলপ্রপাতের দিকে তাকালে একদিকে যেমন ভয়ে আপনার বুক কেঁপে উঠে তেমনি কিছুতেই এর মোহময় আকর্ষণকে আপনি উপেক্ষা করতে পারবেন না।
এই আকর্ষণই অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষকে টেনে আনে নায়াগ্রাকে ছুঁয়ে দেখার কিংবা তার উপর হেঁটে যাওয়ার এক অদম্য বাসনা নিয়ে। এমনি কিছু দুঃসাসী অভিযাত্রীর গল্প দিয়ে সাজানো আজকের এই লেখা।
স্যাম পেচ, আমেরিকান নায়াগ্রা ফলস বিজয়ীস্যাম পেচ, আমেরিকান নায়াগ্রা ফলস বিজয়ী
১৮২৯ সালের অক্টোবরের দিকে স্যাম পেচ নামের এক দুঃসাহসী অভিযাত্রী ঝাঁপ দিয়েছিলেন নায়াগ্রায়। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ঝাঁপ দেয়ার পরও এই ভদ্রলোক কিন্তু বেঁচে গিয়েছিলেন। স্যামের এই অদ্ভুত কাণ্ড আরও অনেক মানুষকে দু:সাহসী করে তোলে। তা ধারাবাহিকতায় রূপ নেয়। স্যামের দেখানো পথ ধরেই হেঁটে চলেছেন নায়াগ্রার নায়করা।
কেউ দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে ভয়ংকর এই জলপ্রপাত পার হয়েছেন, কেউ নিজেদের একটা ব্যারেলে ভরে নিয়ে ভেসে গিয়েছেন জলপ্রপাতের উত্তাল জলস্রোতের মধ্যে, ব্যারেলসুদ্ধ আছড়ে পড়েছেন ১৭৩ ফিট উচ্চতা থেকে। এদের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফাঁনামবুলিস্ট’।
জাঁ ফ্রাঁসোয়া গ্রাভলো (দ্যা গ্রেট ব্লঁদ্যা)জাঁ ফ্রাঁসোয়া গ্রাভলো (দ্যা গ্রেট ব্লঁদ্যা)
পরবর্তীতে জানা যায় নায়াগ্রাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এসব দুঃসাহসী অভিযান করা হয়েছিল। পর্যটকদের মনোরঞ্জনই ছিল যার লক্ষ্য। এজন্য দড়ির উপর দিয়ে হেঁটেও কোন কোন অভিযাত্রী নায়াগ্রা পার হয়েছেন। যেসব নায়ক দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে নায়াগ্রা পার হয়েছেন, তাদের মধ্যে সেরা জাঁ ফ্রাঁসোয়া গ্রাভলো বা দ্যা গ্রেট ব্লঁদ্যা। যিনি ১৮৫৯ থেকে ৬০ সালের মধ্যে মোট ২৩ বার নায়াগ্রা পারাপার করেছিলেন। তার পরেই আছেন সিগনর ফেরিনি, হ্যারি লেসলি, অ্যান্ড্রু প্রোফেসর জেঙ্কিন্স, হেনরি বেলেনি, স্টিফেন পিয়র, জেমস হার্ডিরা। নারীও আছেন একজন, মিসেস এ্যানী টেইলর। এদের সাথে এবার যুক্ত হল নিক ওয়ালান্ডার নাম।
মিসেস এ্যানী টেইলরমিসেস এ্যানী টেইলর
তারা সকলেই চেষ্টা করতেন, দড়ির উপর দিয়ে শুধু না হেঁটে মাঝপথে কিছু কায়দাকানুন করে দেখাতে। এ ব্যাপারে সকলকে টেক্কা দিয়েছিলেন ব্লঁদ্যা। তিনি যখনই নায়াগ্রা পার হতেন, সকলের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা থাকত, এবার কি খেল দেখতে পাওয়া যাবে!
প্রথমবার এই কাণ্ড দেখতে জড়ো হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার দর্শক। তারপর সকলের কাছে ব্লঁদ্যার নায়াগ্রা পার হওয়া নিয়ে কোনো সংশয়ই ছিল না। দর্শক মনোরঞ্জনের জন্য কখনো তিনি ঝুলন্ত তারের উপর দিয়ে দৌঁড়াতেন, একপায়ে দাঁড়িয়ে পড়তেন, উল্টো মুখে হাঁটতেন, কখনো আবার ইচ্ছে করে পড়ে গিয়ে তার ধরে ঝুলে দর্শকদের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিতেন। সবচেয়ে রুদ্ধশ্বাস যাত্রা ছিল, যেদিন ইংল্যান্ডের প্রিন্স অফ ওয়েলস অ্যালবার্ট এডোয়ার্ড এসেছিলেন তার খেলা দেখতে। প্রিন্সকে কাঁধে নিয়েই নায়াগ্রা পার হতে চেয়েছিলেন। স্বভাবতই প্রিন্স রাজি হন নি। তখন নিজের ম্যানেজার কলকর্ডকে তিনি আদেশ করেন, তার পিঠে চড়তে। কলকর্ডকে কাঁধে নিয়ে তিনি হেঁটেছেন, যাত্রাপথে ৭ বার থেমেছেন।
সাতবারই কলকর্ডকে পিঠ থেকে নামিয়েছেন। আবার নতুন করে কাঁধে তুলেছেন। আরেক দিনের গল্প ছিল এমন, ব্ল্ঁদ্যা একটা রান্নার স্টোভ নিয়ে তারের উপর দিয়ে হেঁটে মাঝপথে থেমে যান। তারপর স্টোভ জ্বালিয়ে অমলেট বানিয়ে খেলেন। এরপর নায়াগ্রা পার হন। রাতের অন্ধকারেও একাধিক বার তিনি নায়াগ্রা পার হয়েছিলেন।
সিগনর ফেরিনি সিগনর ফেরিনি
তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছিলেন আর একজন ব্যক্তি। নাম তার সিগনর ফেরিনি। এই দুজনের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিযোগিতা। একজন নতুন কিছু করে দেখালেই অন্যজন চেষ্টা করতেন, তার চেয়েও আরও বেশি কিছু করতে। কাঁধে লোক নিয়ে বা অমলেট না বানিয়ে ফেরিনি একটা ওয়াশিং মেশিন নিয়ে গিয়ে নিচে প্রচণ্ড তেজে বয়ে চলা নায়াগ্রা থেকে জল তুলে মেয়েদের কয়েকটা রুমাল কেচেছিলেন।
১৮৫৯ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত এরকম উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় নায়াগ্রা পার হওয়া একটা নেশায় পরিণত হয়েছিল। মার্কিন গৃহযুদ্ধের কয়েকটা বছর পর এই খেলা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তারপর আবার শুরু হয়। তখন নায়াগ্রা ফলসকে জয় করার জন্য আরও যেসব খেলা দেখানো হত তা হল, ব্যারেলের মধ্যে ঢুকে জল প্রপাতের সঙ্গে নিচে আছড়ে পড়া, বোটে চেপে জল প্রপাত বেয়ে নিচে নামা বা কোনও কিছুর সাহায্য ছাড়াই জলে ঝাঁপ দিয়ে ভেসে গিয়ে আছড়ে পড়েও বেঁচে ফিরে আসা। স্বভাবতই সকলে বেঁচে ফেরেন নি। অনেকে আবার ভয় পেয়ে মাঝ পথে ফিরেও এসেছেন। এমন খবরও পাওয়া যায়, দারিদ্র্যের হাত থেকে বাঁচতে, নায়াগ্রা পার হতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে অনেকে নিজের প্রাণ দিয়েছেন। ক্রমে নায়াগ্রা পার হওয়া নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অনুমতি চেয়েও অনেকদিন অনেকেই হতাশ হয়েছেন। পরবর্তীতে নায়াগ্রা পার হওয়ার জন্য অনুমতি নিতে হত।
এরপর একরকম বন্ধই হয়ে ছিল নায়াগ্রা পার হওয়া। তবে ২০১২ সালের ১৫ জুন, নিক ওয়ালান্ডা নামের এক মার্কিন নাগরিক দুই ইঞ্চি তারের উপর দিয়ে হেঁটে নায়াগ্রা জল প্রপাত পার হয়েছিলেন। কিন্তু নিককে এজন্য কর্তৃপক্ষের কিছু শর্ত মানতে হয়। যেমন: নায়াগ্রা পার হওয়ার জন্য তার শরীরের সঙ্গে সেফটি বেল্ট বাঁধা থাকতে হবে, যাতে নিচে পড়ে গেলেও টেনে তোলা যায়।
নায়াগ্রা ফলস এর উপরে নিক ওয়াল্যান্ডানায়াগ্রা ফলস এর উপরে নিক ওয়াল্যান্ডা
কিন্তু সেকালের নায়কদের শরীরে এই বেল্ট থাকত না। তবে নিক যেখান দিয়ে এই জলপ্রপাত পার হয়েছিলেন, সেটি হর্স শু জলপ্রপাতের একেবারেই উপর দিয়ে। ব্লঁদ্যারা পার হতেন জলপ্রপাতের মুখ থেকে খানিকটা সরে গিয়ে, নদীর উপর দিয়ে। কারণ, গোট আইল্যান্ডের কোনও পাথরে তাদের তার বাঁধতে দিতে অস্বীকার করেছিলেন আতঙ্কিত গোট আইল্যান্ডের মালিকরা।
তবে প্রশ্ন জাগে, ব্লঁদ্যা কি পারতেন যেখান দিয়ে নিক নায়াগ্রা পার হয়েছিলেন, ঠিক সেখান দিয়েই পার হতে? ব্লঁদ্যা সম্পর্কে যারা জানেন, তাদের মতে, বেঁচে থাকলে তিনি নিকের এই চ্যালেঞ্জকে প্রত্যাখ্যান করতেন। সেটাই ছিল তার স্বভাব। তিনি চাইতেন, অন্যরা তাঁর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুক, তিনি নন। নিক ওয়ালান্ডা তাই বলেছেন, “আমি ওর উত্তরাধিকারকে বহন করতে চেষ্টা করেছি। আমি চেয়েছি এই শহরের নামের সঙ্গে আমার নামটা চিরকালের জন্য যুক্ত হয়ে যাক”।
দড়ির উপর দিয়ে হাঁটা নিশ্চয় নতুন কিছুই নয়। আমাদের গাঁ- গঞ্জের মেলাতে এরকম দৃশ্য হরহামেশাই দেখা যায়। মানুষের প্রকৃতিকে জয় করার নিয়ত বাসনা থেকেই ভয়ংকর নায়াগ্রা জলপ্রপাত পার হওয়ার এই দীর্ঘ ইতিহাস।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন