অ্যালবার্ট ফিশঃ নরখাদক এক সিরিয়াল কিলার
আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগের কথা। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে মে। নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড টেলিগ্রাম পত্রিকায় কাজের সন্ধান চেয়ে প্রকাশিত হলো একটি বিজ্ঞাপন- “Young man, 18, wishes position in country. Edward Budd, 406 west 15th Street”
বিজ্ঞাপনটি দিয়েছিলেন অ্যালবার্ট এবং ডেলিয়া বাড দম্পতি। পাঁচ সন্তানের বড় এক পরিবার নিয়ে তারা থাকতেন ছোট্ট এক অ্যাপার্টমেন্টে। তাই পরিবারে কিছু বাড়তি আয়ের আশায়, কিছুটা স্বচ্ছলতার মুখ দেখার আশায় তাদের বড় ছেলে এডওয়ার্ড বাডের জন্য চাকরি চেয়ে তারা বিজ্ঞাপনটি দিয়েছিলেন। মনে ক্ষীণ আশা, ‘কেউ যদি তাদের এই যুবক ছেলেটির কথা শুনে একটু এগিয়ে আসে’!
খুব বেশি দিন অবশ্য অপেক্ষা করতে হলো না তাদের। পরদিন বিকেলেই তাদের দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ এলো। ঘরে আর কেউ না থাকায় দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন ডেলিয়া বাড। দরজা খুলেই অপর পাশে দাঁড়ানো মানুষটিকে এক নজর দেখে নিলেন তিনি। লোকটির বয়স ষাট বছরের মতো হবে। উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির মতো, ওজন ১৩০ পাউন্ডের কাছাকাছি। তার পড়নে ছিলো নেভি ব্লু স্যুট, কালো শার্ট, কালো পশমী হ্যাট এবং পালিশ করা কালো জুতা। লোকটির চুলগুলো ছিলো সাদা কিন্তু চোখগুলো ছিলো নীলাভ। সব মিলিয়ে লোকটিকে বেশ অবস্থাসম্পন্ন বলেই মনে হয়েছিলো ডেলিয়ার। সমস্যা শুধু ছিলো এক জায়গায়, লোকটির দাঁতে। তার দাঁতগুলো ছিলো ভাঙা এবং বিবর্ণ। এমনকি কয়েকটি দাঁত ছিলোই না সেই লোকটির।
লোকটির নাম ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ড, পেশা কৃষিকাজ। তিনি জানালেন যে, পত্রিকায় এডওয়ার্ডের বিজ্ঞাপনটি তিনি দেখেছেন। নিজের খামারে এডওয়ার্ডকে চাকরি দেবার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করলেন তিনি। এতক্ষণ পর ডেলিয়া লোকটির আগমনের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন। তার মন আনন্দে ভরে উঠলো। লোকটিকে ভেতরে বসতে বলে তিনি এডওয়ার্ডকে ডাকতে গেলেন। কিছুক্ষণ পর এডওয়ার্ড আসলো। সে নিজেও লোকটির প্রস্তাবে খুশি মনেই সায় দিলো।
ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ড জানালেন যে, লং আইল্যান্ডের ফার্মিংডেল গ্রামে তার একটি খামার আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসা বেশ ভালো চলায় তার একজন সহকারীর দরকার হয়ে পড়েছে। আর এজন্যই তার এডওয়ার্ডের খোঁজে আসা। প্রতি সপ্তাহে এডওয়ার্ডের জন্য ১৫ ডলার করে মজুরির প্রস্তাব করলেন তিনি। তখনকার সময়ে এটি ছিলো বেশ ভালো অঙ্কেরই এক পারিশ্রমিক। তাই এডওয়ার্ডের পরিবার হাওয়ার্ডের এই প্রস্তাব সানন্দে মেনে নিলো। এডওয়ার্ড জানতে চাইলো সে তার বন্ধু উইলি করম্যানকে সাথে নিতে পারবে কিনা। এডওয়ার্ডের এই প্রস্তাবে হাওয়ার্ড রাজি হলেন। তিনি সেদিনের মতো বাডদের বাড়ি ত্যাগ করলেন। যাওয়ার আগে জানিয়ে গেলেন যে, আসছে শনিবার তিনি এডওয়ার্ড আর তার বন্ধুকে নিয়ে যাবেন। শনিবার আসলো, পরিবারের সবাই সারাদিন ধরে হাওয়ার্ডের জন্য অপেক্ষা করলো। কিন্তু হাওয়ার্ডের টিকিটিরও খোঁজ মিললো না। সেই রাতেই হাওয়ার্ডের কাছ থেকে তাদের কাছে একটি টেলিগ্রাম আসলো। তাতে হাওয়ার্ড জানালেন যে, ব্যবসায়িক এক জরুরি কাজে হঠাৎ করেই তাকে নিউ জার্সিতে যেতে হয়েছিলো। তাই তিনি আসতে পারেননি। আগামীকাল আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টেলিগ্রামের ইতি টানেন তিনি।
পরদিন সকাল এগারোটার দিকে ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ড এডওয়ার্ডদের বাড়িতে উপস্থিত হন। এডওয়ার্ডের মালপত্র তখনও পুরোপুরি গোছানো শেষ হয়নি। তাই হাওয়ার্ড আর বাড দম্পতি তাদের বসার ঘরে আলাপচারিতা চালাতে লাগলেন। এমন সময় সেখানে এসে উপস্থিত হলো দশ বছর বয়সী গ্রেস বাড। মেয়েটি যদি তখনও জানতো যে এই ঘরে আসাটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হতে যাচ্ছে…
গ্রেসের পড়নে সেদিন ছিলো সুন্দর সাদা একটি জামা। তার গাঢ় বাদামী রঙের চুলগুলো ছোট করে কাটা ছিলো। সেই সাথে ছিলো অসাধারণ সুন্দর, নীলাভ এক জোড়া চোখ। হাওয়ার্ড ছোট্ট পরীর মতো এই মেয়েটির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। মেয়েটি অল্প সময়ের মাঝেই হাওয়ার্ডের সাথে ঘনিষ্ট হয়ে গেলো। দাদুর বয়সী এই লোকটির কোলে বসে নির্ভয়ে সে গল্প জুড়ে দিলো। তিনি মেয়েটির সাথে একটু খেলতে চাইলেন। তাই মেয়েটিকে তিনি তার কাছে কত ডলার আছে সেটি গুণতে দিলেন। মেয়েটিও গুণে দিলো (৯১ ডলার)। তিনি মেয়েটিকে পুরষ্কার হিসেবে কিছু অর্থ দিলেন।
হঠাৎ করে হাওয়ার্ডের মাথায় এক বুদ্ধি আসলো। তিনি বাড দম্পতিকে জানালেন যে, আজ তার এক ভাগ্নির জন্মদিন যে কিনা কলম্বাস এভিনিউতে ১৩৭ নং সড়কে থাকে। তিনি গ্রেসকে নিয়ে তার ভাগ্নির জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে ঘুরে আসতে চাইলেন। ডেলিয়া বাড এতে আপত্তি জানালেন। কিন্তু স্বামী অ্যালবার্টের জোরাজুরির কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন তিনি। ঠিক হলো হাওয়ার্ড গ্রেসকে নিয়ে কয়েক ঘন্টা পর যখন ফিরে আসবেন তখনই তিনি এডওয়ার্ড আর তার বন্ধুকে নিয়ে ফার্মিংডেলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন।
কিছুক্ষণ পরই গ্রেস আর ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বের হয়ে গেলো। কিন্তু মায়ের মন বলে কথা। ডেলিয়া বাড তাই পরে বলেছিলেন যে, কোনো এক অজানা কারণে গ্রেসকে হাওয়ার্ডের সাথে দিতে তার মন চাইছিলো না। এমনকি মোড় ঘুরবার সময় গ্রেস নাকি চিৎকার করে কিছু একটা বলেছিলো তবে তিনি তা শুনতে পান নি।
বাড দম্পতি সবচেয়ে বড় ভুল কোথায় করেছিলো জানতে চান? আসলে কলম্বাস এভিনিউ শেষ হয়ে গিয়েছিলো ১০৫ নং সড়কেই, ১৩৭ নং সড়কের কোনো অস্তিত্বই তখন ছিলো না! তাহলে? না, আপনি যা ভাবছেন ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ড আসলে তা করতে যাচ্ছেন না। তিনি আসলে এমন কিছু করতে যাচ্ছেন যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কখনো কল্পনাও করতে পারবে না।
গ্রেস নিখোঁজ হওয়ার কাছাকাছি সময়েই নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট নিখোঁজ লোকদের সন্ধানের জন্য একটি শাখা খুলেছিলো। গ্রেসের দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই তারা সেখানে দুজন তদন্তকারী কর্মকর্তা পাঠায়। তাদের মাঝে একজনের নাম ছিলো উইল কিং। কিং ছিলেন কর্কশ স্বরের অধিকারী এক ব্যক্তি। প্রচুর ধূমপানের অভ্যাস ছিলো তার। নিয়ম-নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন অবিচল। সেই সাথে কোনো কাজের ব্যাপারে তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, একজন গোয়েন্দার জন্য যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক গুণ।
অল্প সময়ের মাঝেই গ্রেসের নিখোঁজ হওয়ার খবরটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। প্রচন্ড চাপের মুখে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান সংক্রান্ত শাখার প্রধান ৫০ জন গোয়েন্দাকে এই ঘটনার তদন্তে নিয়োজিত করলেন। কিংকে প্রধান করে গঠন করা হলো একটি টাস্কফোর্স।
গ্রেস জীবিত কি মৃত সেটি কিং-এর কাছে এতটা বড় ব্যাপার ছিলো না। কিন্তু একজন লোক সবার সামনে দিয়ে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে একটি মেয়েকে নিয়ে একেবারে হাওয়া হয়ে যাবে এই ব্যাপারটি তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই কেসটি সমাধানের যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। অন্যান্য গোয়েন্দারাও তাদের কাজ নিষ্ঠার সাথে চালিয়ে যেতে লাগলেন। তারা বাডদের সারা ঘর জুড়ে হাওয়ার্ডের হাতের ছাপ খুঁজে বেড়ালেন। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন থেকে হাওয়ার্ড বাডদের কাছে যে টেলিগ্রামটি পাঠিয়েছিলেন সেই ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তারা ফার্মিংডেলে গিয়ে খামার মালিকদের সাথেও কথা বললেন। কিন্তু এতকিছুর পরও গ্রেসের কোনো হদিসই তারা খুঁজে পেলেন না। কয়েক মাস পর সবাই অন্যান্য কেস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে গ্রেসের কেসটি আড়ালেই চলে যেতে থাকলো। কিন্তু ব্যাপারটিকে একেবারে আড়ালে চলে যেতে দিলেন না একজন ব্যক্তি, তিনি উইল কিং। অধ্যবসায়ের এক আশ্চর্য স্বাক্ষর রেখে নিয়মিতই তিনি গ্রেসের এই কেসটি নিয়ে তদন্ত চালাতেন। সম্ভাব্য সকল পথই ঘুরে দেখতে চাইছিলেন তিনি।
গ্রেসের খবরটি মিডিয়াতে আসার পরপরই বাড পরিবারের কাছে বিভিন্ন ধরণের চিঠি আসা শুরু করে যার বেশিরভাগই ছিলো সমবেদনায় পূর্ণ। উইল কিং বাডদের জানিয়ে রেখেছিলেন যে, তারা যাতে চিঠি না খুলেই সেগুলো তার কাছে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে কখনোই তারা এমনটি করেন নি। ফলে বাড পরিবারের সাথে ধীরে ধীরে কিং-এর এক ধরণের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। এভাবে দিন গেলো, মাস গেলো, দেখতে দেখতে ছয়টি বছরও চলে গেলো। তবু ছোট্ট গ্রেসের কোনো সন্ধান মিললো না।
১৯৩৪ সালের শুরুর দিকের কথা। প্রতিদিনই নিত্যনতুন নানা কেসের চাপ, সেই সাথে গ্রেসের কেসটির চাপ সামলাতে না পেরে উইল কিং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এজন্য তাকে তিন মাস হাসপাতালে কাটাতে হলো। ছাড়ার আগে ডাক্তাররা শরীরের ব্যাপারে তাকে বিশেষ মনোযোগী হতে বললেন। পুলিশ ডিপার্টমেন্টও তাকে ফিল্ড ওয়ার্কের বদলে ডেস্কের সামনে বসিয়ে দিলো। তবুও গ্রেসের কেসটির ব্যাপারে তিনি হাল ছাড়লেন না। যেখানেই সামান্যতম আলোর সন্ধান পেলেন, সেখানেই সমাধানের আশায় ছুটে যেতে লাগলেন তিনি।
অবশেষে আসলো নভেম্বর মাসের ২ তারিখ। ডেলিয়া বাডের কাছ থেকে উইল কিং-এর কাছে একটি টেলিফোন কল আসলো। ডেলিয়া জানালেন যে, এক অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি একটি চিঠি পেয়েছেন যা তার কাছে গ্রেস সম্পর্কিত বলে মনে হচ্ছে। এটুকু শোনার পরই কিং-এর আশার আলোটা আবার জ্বলে উঠলো। তিনি বাড পরিবারের বাসায় আসলে এডওয়ার্ড তার কাছে চিঠিটি এনে দেয়। এবারের চিঠিটি কিন্তু আর আগের মতো খোলা ছিলো না! একটু পড়েই বাড বুঝতে পারলেন যে, চিঠিটি সেই ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ডের, ছয় বছর আগে যে কিনা গ্রেস বাডের মতো একটি ফুটফুটে বাচ্চা মেয়েকে অপহরণ করেছিলো।
কিন্তু কী ছিলো সেই চিঠিতে? পুরো চিঠি জুড়েই গ্রেসকে কীভাবে অপহরণ করা হয়েছিলো এবং পরবর্তীতে তিনি নিষ্পাপ বাচ্চা মেয়েটির সাথে কী রকম পাশবিক আচরণ করেছিলেন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা ছিলো। পাঠকদের কাছে সেই চিঠির কথাগুলো ভালো না-ও লাগতে পারে। তাই শুধু শেষের দুই-তিন লাইন তুলে দিচ্ছি- “তার পুরো শরীরটি খেতে আমার নয় দিন লেগেছিলো। আমি তার সাথে কোনো শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হইনি, যদিও চাইলেই আমি তা পারতাম। সে একজন কুমারী হিসেবেই মারা গেছে…।”
এবার থেকেই উইল কিং যেন তার আসল খেলা দেখানো শুরু করলেন। তিনি খেয়াল করলেন- যে খামে করে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে, তাতে কোনো একটা প্রতীক ছিলো, আর প্রেরক সেটি ঘষে তুলে ফেলার চেষ্টা করেছে। তবুও তিনি আলোতে খামটি ধরে বুঝলেন যে সেখানে লেখা ছিলো NYPGBA; ফোন বুক চেক করে জানা গেলো এর পূর্ণ রূপঃ New York Private Chauffeur’s Benevolent Association। এর অবস্থান ছিলো নিউ ইয়র্কের ১২৭ লেক্সিংটন এভিনিউতে। উইল কিং ছুটে গেলেন তাদের হেড কোয়ার্টারে। অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টকে খুলে বললেন সবকিছু।
সেদিন মাঝরাত পর্যন্ত প্রায় সাত ঘন্টা ধরে কাজ করলেন তিনি। NYPGBA-এর সদস্যপদ লাভের জন্য করা সবগুলো দরখাস্তের হাতের লেখা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন তিনি। কিন্তু তাকে হতাশ হতে হলো। কোনো হাতের লেখাই যে ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ডের সেই হাতের লেখার সাথে মিললো না!
এবার অন্য কৌশল অবলম্বন করলেন তিনি। সমিতির সদস্যদের কাছে তিনি জানতে চাইলেন ইদানীং তারা NYPGBA-এর সীলমোহর যুক্ত কোনো খাম ব্যবহার করেছেন কিনা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বাসায় নিয়ে গেছেন কিনা। তিনি তাদের কাছে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যটি গোপন রাখলেন। কথাগুলো বলার পর তিনি প্রেসিডেন্টের রুমে অপেক্ষা করছিলেন। এমন সময় লিও সিকোস্কি নামক ছোট, লাল চুলওয়ালা এক লোক ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি জানান ৬২২ লেক্সিংটন এভিনিউয়ের একটি বাড়িতে থাকার সময় তিনি কিছু খাম নিয়ে নিজের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। আশার আলো দেখতে পেয়ে সেখানে ছুটে গেলেন উইল কিং। কিন্তু না, আবারো তাকে হতাশ হতে হলো। কারণ সিকোস্কি বাড়িটি ছাড়ার পর কেউই আর সেখানে ভাড়াটে হিসেবে আসে নি। প্রতিবেশীদের কেউও হাওয়ার্ডের মতো কাউকে দেখে নি বলেই জানান।
আবারো সিকোস্কির কাছে ছুটে গেলেন তিনি, জানতে চাইলেন সিকোস্কি আর কিছু মনে করতে পারেন কিনা সে সম্পর্কে। সিকোস্কি জানান যে, তারও আগে তিনি ২০০ পূর্ব ৫২ নং সড়কে থাকতেন। সেই বাসায় বিছানার পেছনের শেলফে তিনি একই ধরণের আরো কিছু খাম ফেলে এসেছিলেন। কিং দ্রুত ছুটে গেলেন ৫২ নং সড়কের সেই বাসায়। বাড়ির মালিককে হাওয়ার্ডের চেহারার বর্ণনা দিয়ে কিং জানতে চাইলেন এমন কাউকে তিনি চেনেন কিনা। বাড়ির মালিক তাতে সায়ও দিলেন। তবে সমস্যা বাঁধলো অন্য জায়গায়। বাড়ির মালিকের মতে লোকটির নাম ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ড নয়, অ্যালবার্ট ফিশ! মহিলা জানালেন যে, ঐ লোকটি ৭ নাম্বার রুমে থাকেন। মাঝে মাঝে এসে সিভিলিয়ান কনজার্ভেশন কর্পসে কাজ করা তার ছেলের কাছ থেকে পাঠানো চেক নিয়ে আবার চলে যান। কিং নজর দিলেন রেজিস্টারে অ্যালবার্ট ফিশের হাতের লেখার দিকে। আরে! এ যে ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ডেরই হাতের লেখা! দীর্ঘ ছয় বছর ধরে অনুসন্ধানের পর অবশেষে অপহরণকারীর সন্ধান পেলেন কিং। তবে এখনো কিন্তু তিনি তাকে ধরতে পারেন নি, কেবল অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছেন। পরবর্তীতে জানা যায় লোকটির আসল নাম অ্যালবার্ট ফিশ। তবে অপরাধ করে সহজে যাতে ধরা না পড়েন সেজন্য গ্রেসের বেলায় তিনি ফ্রাঙ্ক হাওয়ার্ড ছদ্মনামটি ব্যবহার করেন।
এবার শুরু হলো কিং-এর অপেক্ষার পালা। কখন ফিশ আসবে, কখন তিনি তাকে পাকড়াও করবেন। তিনি কাছাকাছি একটি বাড়ির সবচেয়ে উপরের ফ্লোরে এসে থাকতে শুরু করলেন যাতে ৫২ নং সড়ক এবং ৩ নং এভিনিউয়ের সংযোগস্থলটা সেখান থেকে সহজেই চোখে পড়ে। ব্যায়াম, ধূমপান, খাওয়া-দাওয়া সবই চলতে লাগলো। সেই সাথে চলতে লাগলো ফিশের খোঁজে তাকিয়ে থাকা। প্রতিদিন প্রায় ২২ ঘন্টা করে জেগে থাকা শুরু করলেন তিনি। তবুও ফিশের দেখা মিললো না। তবে কি কিং-এর গন্ধ পেয়ে ফিশ আগেই সেখান থেকে সটকে পড়েছেন?
না। অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই ডিসেম্বর। প্রতিদিনের ছকে বাঁধা জীবন থেকে একটু অবসরের আশায় বড়দিনের জন্য কেনাকাটা করতে বের হলেন উইল কিং। প্রায় দু’ঘন্টার মতো বাইরে ছিলেন তিনি। যখনই ফিরলেন তার কিছুক্ষণের মাঝেই দরজায় জোরে আঘাতের শব্দ আসলো। দরজা খুলে দেখেন ফিশের বাড়ির মালিক দাঁড়িয়ে। মহিলা জানালেন যে, আধা ঘন্টা আগে ফিশ এসেছেন। তবে তিনি তাকে জানিয়েছেন যে, চেক আসে নি (মিথ্যা কথা)। তাই ফিশ চেকের জন্য অপেক্ষা করছেন।
এতদিন পর শিকার একেবারে হাতের মুঠোয়। পয়েন্ট থার্টি এইট রিভলবারটি কোমরে গুঁজে তিনি বের হলেন ফিশের সন্ধানে। দরজা খুলে দিলেন ফিশই। হাওয়ার্ড আর ফিশ যে একই ব্যক্তি তা এই লোকটিকে দেখে শতভাগ নিশ্চিত হলেন কিং। তিনি নিজেকে পুলিশের লোক হিসেবে পরিচয় দিলেন। জানালেন যে, ফিশের লেখা একটি চিঠি নিয়ে তিনি একটু কথা বলতে চান এবং এজন্য তাকে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে যেতে হবে। ফিশ তাতে মৃদু সম্মতি দিলেন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন দুজনে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ করে দু’হাতে রেজর নিয়ে ফিশ ঝাঁপিয়ে পড়লেন কিং-এর উপর। কিন্তু কিং-এর সাথে পেরে উঠলেন না তিনি। অল্প সময়ের মাঝেই কিং তাকে পরাজিত করে তার হাতে হাতকড়া লাগিয়ে দেন। দীর্ঘ ছয় বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর অবশেষে সফল হলেন উইল কিং, ধরা পড়লেন অ্যালবার্ট ফিশ।
১৯২৪ থেকে ১৯৩২ সাল সময়কালে দশজনেরও বেশি মানুষকে খুন করেছিলেন অ্যালবার্ট ফিশ। ফাঙ্ক হাওয়ার্ড, থমাস এ. স্প্রাগ, রবার্ট হেইডেন ও জন ডব্লিউ. পেল ছদ্মনামগুলো ব্যবহার করতেন তিনি। গ্রেস বাডকে খুনের অভিযোগে ১৯৩৫ সালের ১১ মার্চ ফিশের বিচার কার্য শুরু হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে ফিশকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ইলেকট্রিক চেয়ারের মাধ্যমে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি ফিশের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
আগেকার দিনের ভয়াবহ কিছু নির্যাতনের যন্ত্রপাতি ও এর ইতিহাস
অপরাধীকে শাস্তি দেয়া হোক- এমনটা চায় সবাই। তবে আজকালকার দিনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড কার্যকরের বেলায় প্রায় একই ধারা অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ পড়লে বিস্ময়ে মুখ হাঁ হয়ে যেতে বাধ্য। কারণ তখনকার দিনে একজন অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতটাই ভয়াবহ অত্যাচার পদ্ধতির দ্বারস্থ হতো, যা আজকের দিনের কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। ফেলে আসা দিনের কল্পনাতীত সেসব নির্যাতনের কাহিনী দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখা।
গামলা
অপরাধীকে একটি গামলায় এমনভাবে রাখা হতো যাতে তাদের মাথাটিই শুধু বাইরে থাকে। এরপর একজন প্রহরী এসে তার মুখে মধু ও দুধ মেখে দিয়ে যেতো! ফলে অল্প সময়ের মাঝেই মাছি এসে সেখানে জড়ো হতো। তাকে নিয়মিতভাবেই খাবারদাবার দেয়া হতো এবং শেষ পর্যন্ত নিজের মলমূত্রের মাঝেই গামলায় থেকে মৃত্যুবরণ করতে হতো অপরাধীকে।
পিতলের ষাঁড়
বন্দী নির্যাতনের জন্য এ ষাঁড়টি ব্যবহৃত হতো প্রাচীন গ্রীসে। একটি দরজা দিয়ে অপরাধীকে ঢুকিয়ে তারপর সেটি বন্ধ করে দেয়া হতো। এরপর নিচে থেকে জ্বালিয়ে দেয়া হতো আগুন। উত্তাপে পিতলের তৈরি এ ষাঁড়টি গনগনে লাল বর্ণ ধারণ করার আগপর্যন্ত আগুন জ্বলতেই থাকতো। তারপর আগুন নেভানো হতো। ততক্ষণে ভেতরে থাকা মানুষটি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পুড়ে মারা যেতো। আর ভেতরে আটকে পড়া তার সেই আর্তনাদ অনেকটা ষাঁড়ের গর্জনের মতোই শোনা যেতো।
শূলে চড়ানো
এক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তিকে তীক্ষ্ম ফলা বিশিষ্ট মোটা একটি দন্ডের উপর জোর করে বসিয়ে দেয়া হতো। এরপর ধীরে ধীরে দন্ডটি উপরের দিকে উঠাতে থাকলে অপরাধীর নিজের ওজনেই আস্তে আস্তে দন্ডটি তার শরীর ভেদ করে ঢুকতে থাকতো ছবির মতো করে। এভাবে একজন ব্যক্তির মারা যেতে ৩ দিন পর্যন্ত সময় লাগতো। এ ধরণের শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে বেশ কুখ্যাত ছিলেন ভ্লাদ দ্য ইম্পেলার। কথিত আছে, একবার তিনি খেতে খেতে ২০,০০০ মানুষকে শূলে চড়িয়ে তা উপভোগ করেছিলেন।
কাঁটা
একটি বেল্টে দুই প্রান্তে কাঁটা বিশিষ্ট এ জিনিসটি আটকে তা অপরাধীর গলায় পরিয়ে দেয়া হতো। কাঁটার একদিক থাকতো তার চিবুকের নিচে, অপরদিক স্টার্নামে। এরপর দোষী ব্যক্তিকে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। গলায় দ্বিমুখী কাঁটা আটকে থাকায় বেচারা সারাক্ষণ গলা সোজা করে রাখতে বাধ্য হতো। ঘুম আসলেই খবর ছিলো!
কাঁটার মালা
কাঠ কিংবা ধাতব পদার্থের তৈরি এ মালাও পরানো হতো দোষীর গলায়। ফলে মাথা নিচু করা, খাওয়াদাওয়া করা কিংবা শোয়া- কোনোকিছুই করতে পারতো তা তারা।
ক্রুশবিদ্ধকরণ
এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে কাঠের তক্তায় চড়িয়ে বেঁধে রাখা হতো কিংবা তার হাতে পেরেক গেঁথে আটকে রাখা হতো। এভাবে বেশ কিছুদিন রাখার ফলে শ্বাসরোধ হয়ে একসময় মৃত্যু ঘটতো দন্ডিত ব্যক্তির।
লেড স্প্রিঙ্কলার
প্রথমে গলিত সীসা, আলকাতরা, গরম পানি কিংবা গরম তেল দিয়ে পূর্ণ করা হতো যন্ত্রটি। তারপর অপরাধীর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ঢেলে দেয়া হতো সেগুলো। ফলে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো বেচারা।
আয়রন মেইডেন
লোহার তৈরি এ কেবিনেটের দরজার ভেতরের দিকে কাঁটার মতো অংশ থাকতো। অপরাধীকে একবার ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেই কাঁটার কারণে তার পক্ষে আর নড়াচড়া করা সম্ভব হতো না। তখন অপর পাশ থেকে প্রশ্নকর্তা তাকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেন আর দরকার মনে করলে সেসব খাঁজকাটা অংশ দিয়ে খোঁচাও দিতেন।
কফিন টর্চার
মধ্যযুগের অত্যন্ত পরিচিত এক নির্যাতন পদ্ধতি ছিলো এ কফিন টর্চার। লোহার তৈরি এসব খাঁচায় একজন মানুষকে ঢুকিয়ে তার উপর নির্যাতন করা হতো বলেই এরুপ নামকরণ। কাউকে সেই খাঁচায় ঢুকিয়ে তারপর ছবির মতো করেই গাছ কিংবা অন্য কোনো অবলম্বন থেকে ঝুলিয়ে রাখা হতো। তাদের মৃতদেহ শবভূক পাখিদের খাদ্যে পরিণত হবার আগপর্যন্ত সেখানে থাকা লাগতো দুর্ভাগাদের।
থাম্বস্ক্রু
থাম্বস্ক্রু বা পিলিউইঙ্কস নামে পরিচিত এ যন্ত্রটি ব্যবহার করা হতো মধ্যযুগে, বন্দীদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যে। উপরের হাতলটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভেঙে দেয়া হতো হাত ও পায়ের আঙুল। এতেও কাজ না হলে এরই বড় ভার্সন ব্যবহার করে ভাঙা হতো অপরাধীর কনুই ও হাঁটু। আর যদি তাতেও কাজ না হতো, তাহলে হেড ক্রাশার মানে মাথা ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে দেয়ার চলও ছিলো।
গিলোটিন
গিলোটিনের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড কার্যকর পদ্ধতি মানব ইতিহাসে বেশ কুখ্যাত এক বিষয়। এ পদ্ধতিতে একটি দড়িতে প্রথমে ধারালো ব্লেড আটকে ঝুলিয়ে রাখা হতো। এরপর অপরাধীর মাথা ফ্রেমে জায়গামতো রেখে দড়ি ছেড়ে দিলেই দেহ থেকে আলাদা হয়ে যেতো মাথাটি। এতক্ষণ ধরে যেসব নির্যাতনের কথা বললাম, তার মাঝে গিলোটিনে মৃত্যুই সবচেয়ে দ্রুত কার্যকর হওয়ায় আগেকার দিনে এটাকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সবচেয়ে ‘মানবিক’ উপায় হিসেবে গণ্য করা হতো!
র্যাক
মধ্যযুগে পৃথিবীতে যত রকম নির্যাতন চালু থাকার কথা জানা যায়, তার মাঝেই র্যাকের ব্যবহারকেই ধরা হয়ে থাকে সবচেয়ে নির্মম। এর উপরে ও নিচে দুটি করে মোট চারটি দড়ি থাকতো। অপরাধীকে সেখানে এনে তার হাত-পা ছবিতে দেখানো উপায়ে বেঁধে ফেলা হতো। এরপর একজন নির্যাতনকারী এসে দোষী ব্যক্তির হাত-পায়ের কাছে থাকা হ্যান্ডেলগুলো ঘোরাতে শুরু করতো। এভাবে লোকটির হাত-পা ছিঁড়ে আসার আগপর্যন্ত চলতো এ নির্যাতন!
জিহ্বা কেটে ফেলা
আদালত যদি দোষী ব্যক্তির জিহ্বা কাটার রায় দিতো, তাহলে ব্যবহার করা হতো কেচির মতো দেখতে এ জিনিসটি। অবশ্য এর আগে মাউথ ওপেনার ব্যবহারের মাধ্যমে জোর করে দন্ডিত ব্যক্তির মুখ খুলে রাখার ব্যবস্থাও নেয়া হতো।
ইঁদুরের হাতে মৃত্যু
আগেকার দিনের নৃশংসতার আরেক ভয়াবহ নমুনা ছিলো এ নির্যাতন। এ পদ্ধতিতে বন্দী ব্যক্তির পেটের উপর একটি বাক্স বেঁধে এর ভেতর কিছু ইঁদুর ছেড়ে দেয়া হতো। বাক্সটির সবদিক বন্ধ থাকলেও শুধু বন্দীর শরীরের সংস্পর্শে থাকা অংশ খোলা থাকতো। এরপর বাক্সের আশেপাশে থেকে প্রচন্ড উত্তাপ দেয়া হতো। তখন পালানোর আর কোনো জায়গা না পেয়ে ইঁদুরগুলো বন্দীর শরীরের ভেতরেই মাংস খেয়ে খেয়ে ঢুকতো!
সিমেন্টের জুতা
সিমেন্টের জুতার আগমন ঘটেছিলো আমেরিকান মাফিয়াদের হাত ধরে। তারা যখন কোনো শত্রু, বিশ্বাসঘাতক কিংবা গোয়েন্দাকে শেষ করে দিতে চাইতো, তখন তার পা দুটো প্রথমে আংশিক পোড়া কাঠের ব্লকের মাঝে রাখতো। এরপর সেই ব্লকটিকে তারা বালু-সিমেন্টের মিশ্রণ দিয়ে ভরে দিতো। কিছুক্ষণ পর সেই মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে দোষী ব্যক্তিটি সেখানেই আটকা পড়তো। এরপর তাকে ফেলা দেয়া হতো কোনো জলাশয়ে। সেখানেই সলিল সমাধি হতো তার।
ক্যাথেরিন হুইল
কোনো অপরাধীকে যদি খুব ধীরে ধীরে মারার দরকার হতো, তাহলে ক্যাথেরিন হুইল নামক এ জিনিসটির শরণাপন্ন হতেন বিচারকেরা। এজন্য দোষীকে ব্যক্তিকে প্রথমে বড়সড় একটি কাঠের চাকার স্পোকের সাথে দৃঢ়ভাবে বাঁধা হতো। এরপর সেই চাকাটি আস্তে আস্তে ঘোরানো হতো। একই সময়ে একজন লোক হাতুড়ি দিয়ে অপরাধীর শরীরের নানা জায়গায় নির্মমভাবে পেটাতে থাকতো। হাড়গোড় ভেঙে একাকার হয়ে গেলে তাকে সেখানেই ফেলে রাখা হতো। কখনো আবার উঁচু পোলে ঝুলিয়ে রাখা হতো যাতে পাখিরা এসে তাকে খেয়ে যায়। এভাবেই একসময় মারা যেত অপরাধী ব্যক্তিটি।
করাত
করাত দিয়ে কাউকে মারতে গেলে তাকে ছবির মতো উল্টো করে ঝোলানো হতো। এরপর শরীরের মাঝ বরাবর তার দেহটি কাটা হতো। যন্ত্রণার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে অধিকাংশ সময়ই তার পেট পর্যন্ত কাটা হতো। ফলে নিদারুণ যন্ত্রণার স্বাদ বেশ কিছুক্ষণ ভোগ করে তবেই মৃত্যু ঘটতো অপরাধীর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের গুপ্তচরবৃত্তির ৩ টি রোমাঞ্চকর ঘটনা
গল্পের বইয়ে তো কত রকম গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনায় আমরা পড়ে থাকি। এসব রোমহর্ষক অভিযানের গল্প আমাদের নিয়ে যায় কল্পনার এক অন্য রকম রাজ্যে। কিন্তু আজ কোন কাল্পনিক গল্প নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কয়েকটি সত্যিকারের স্পাই বা, গুপ্তচরবৃত্তির গল্প নিয়েই আজকের এই আয়োজন। তো চলুন শুরু করা যাক।
একটি মৃতদেহ যা হিটলারকেও বোকা বানিয়েছিল
তখন ১৯৪৩ সাল। মিত্রশক্তি তখন সিসিলি আক্রমণের ছক করছিল। তারা জানত যে, তারা সিসিলি আক্রমণ করলে হিটলারের নাজি বাহিনী খুব দ্রুতই সেখানে তাদের শক্তি বর্ধিত করার ক্ষমতা রাখে। তাই এখানে আক্রমণের জন্য ব্রিটিশরা কিছু ফন্দী বের করতে থাকে। আর এ জন্যই সাজানো হলো এক মিথ্যা নাটক। এ নাটকের ধারণাটি দিয়েছিলেন বিখ্যাত স্পাই চরিত্র জেমস বন্ডের স্রষ্টা ইয়ান ফ্লেমিং।
নাটকের প্লট অনুসারে মিত্রবাহিনী গ্লিনডোর মিশেল নামের এক ভবঘুরে মানুষের মৃতদেহ খুঁজে বের করেন। মিত্র বাহিনী লাশটির নাম দেয় ক্যাপ্টেন উইলিয়াম বিল মার্টিন। এই কাল্পনিক চরিত্রটির জন্ম সাল বানানো হয় ১৯০৭ সালকে। তার জন্ম হয়েছিল ওয়েলসের কার্ডিফে। মার্টিন নামটি পছন্দ করা হয়েছিল কারণ ব্রিটিশ রয়্যাল মেরিন বাহিনীতে ক্যাপ্টেন বা, মেজর পদে মার্টিন নামের অনেক সেনা ছিল তখন। তার পরিচয় পত্রে যে মানুষটির ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল তিনি ছিলেন এম আই ফাইভ অফিসার রনি রিড। তার চেহারা অনেকটাই মৃতদেহটির মত ছিল।
মৃতদেহটিকে মিত্র বাহিনীর পোশাক পড়িয়ে দেয়া হয় এবং তার কোমরের বেল্টের সাথে এক ধরণের বিশেষ শিকলের সাহায্যে একটি ব্রিফকেস বেঁধে দেয়া হয়। এই ব্রিফকেসে ছিল গ্রীসে মিত্রবাহিনীর এক মিথ্যা কিন্তু বিশাল আক্রমণের নকশা। তারা একটি নষ্ট প্যারাসুট মৃতদেহটির গায়ে লাগিয়ে দিয়ে মৃতদেহটিকে সমুদ্রের স্রোতের সাথে ভাসিয়ে দিল যাতে হিটলারের নাজি বাহিনী তা খুঁজে পায়।
ব্রিটিশ বা, মিত্র বাহিনী যেরকম আশা করেছিল ঠিক সেরকমই ঘটল। নাজিরা মৃতদেহসহ ব্রিফকেসটি খুঁজে পেল। আসলে মৃতদেহটি স্পেন খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু তাদের ইন্টেলিজেন্স বাহিনীর সাথে জার্মান ইন্টেলিজেন্স বাহিনীর যোগাযোগ ছিল। তারা ভাবল কোন বিমান দুর্ঘটনায় মিত্র বাহিনীর এই সৈনিকটি মারা গিয়েছে। তারা আক্রমণের নকশাটিকে আসল ভেবে বসল। হিটলার নিজেও এ বিষয়ে জানতেন এবং তিনি নিজেও ঘটনাটিকে সত্য বলেই মনে করলেন। ফলাফলস্বরুপ জার্মানরা তাদের সেনাবাহিনীর এক বড় অংশকে (প্রায় ৯০ হাজার সৈন্যকে) সেই মিথ্যা আক্রমণের জায়গায় পাঠিয়ে দিল। ফলে মিত্র বাহিনী খুব সহজেই সিসিলি আক্রমণ করে বসল কারণ সেখানে সৈন্য সংখ্যা কমে গিয়েছিল এবং বাইরে থেকে সৈন্য আনার মত অবস্থাও ছিল না নাজিদের। যার ফলে মিত্রবাহিনীর হাজার হাজার সৈনিকের জীবন বেঁচে যায়। ব্রিটিশদের এ আক্রমণের আরো ২ সপ্তাহ পর পর্যন্ত জার্মানরা বিশ্বাস করে বসে ছিল যে, মূল আক্রমণটি গ্রীসেই হবে। কিন্তু সেই আক্রমণটি আর কখনই হয়নি।
এ ঘটনাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এ ঘটনার ফলে জার্মানরা পরবর্তিতে অনেক আসল ঘটনা কাকিতালিয়ভাবে আগেই জেনে যাওয়ার পরও ব্রিটিশদের ফাঁদা পাত ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিল এবং ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিল।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা বই “দ্যা ম্যান হু নেভার ওয়াস” প্রকাশের পরপরই বেস্ট সেলার বই হয়ে যায়। দুই বছর পর এই একই নামে একটি সিনেমাও মুক্তি পায়।
পোল্যান্ডের এক স্পাইয়ের সাহসিকতার গল্প
ক্রিস্টিনে গ্রানভিলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেশ কিছু সাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু তার সবচেয়ে সাহসী অভিযান ছিল এক উদ্ধার অভিযান।
ঘটনাটি ফ্রান্সের। তখন ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাস চলছিল। ক্রিস্টিনে ফ্রান্সের এক গেস্টাপো নিয়ন্ত্রিত জেলখানায় ঢুকে পড়েন। গেস্টাপো হচ্ছে তৎকালিন জার্মানদের পুলিশ বাহিনীর নাম। ক্রিস্টিনে সেই জেলে বন্দী থাকা ৩ জন স্পাই যাদের মৃত্যুদন্ডের ঘোষণা হয়েছিল তাদের মুক্ত করে আনেন।
এ ঘটনার আগে থেকেই সারা ফ্রান্সে ক্রিস্টিনের মুখ সহ ধরিয়ে দিন লেখা পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে লাগানো ছিল। কিন্তু ক্রিস্টিনে এমনভাবে সেখানে গিয়েছিলেন যে কেউই তাকে চিনতে পারেনি। সে কারারক্ষীদের এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, সে একজন ব্রিটিশ স্পাই এবং একজন ব্রিটিশ জেনারেলের ভাগ্নী। সে ক্যাপ্টেন আলবার্ট শেঙ্কের সাথে দেখা করতে সক্ষম হয়। সে আলবার্ট শেঙ্ককে এই বলে হুমকি দেন যে, মিত্র বাহিনী খুব শীঘ্রই তাদের আক্রমণ করতে যাচ্ছে। যদি ধরা পড়া ৩ জন স্পাইয়ের কোন রকম ক্ষতি করা হয় তবে তাদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ করে দেয়া হবে। ক্রিস্টিনে তাকে আরো বলেন, তারা যদি ধরা পড়া ৩ জন স্পাইকেই ছেড়ে দেয় তাহলে তাদেরকে পরবর্তিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেয়া হবে এবং মিত্র বাহিনী তাদের কোন ক্ষতি করবে না।
ক্রিস্টিনে তাদের ২০ লাখ ফ্রাঙ্ক পরিমাণ অর্থ দেয়ার লোভ দেখিয়েছিল। ক্রিস্টিনে প্রায় ৩ ঘন্টা ধরে তাদের সাথে কথা কাটাকাটি করে। সে তাদের সাথে আপোষ করার চেষ্টা করে। সে তার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে তাদের বিভ্রান্ত করে দেয়। ক্রিস্টিনে তাদের বলেছিল মিত্রবাহিনী যেকোন সময় সেখানে চলে আসবে এবং তার সাথে তাদের তারবিহীন যোগাযোগ রয়েছে। সে স্পাইদের একজনকে নিজের স্বামী হিসেবে (যা সত্য ছিল না) এবং অন্যান্যদের তার স্বামীর বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
ক্রিস্টিনের ব্যক্তিত্ত্ব, অর্থের লোভ এবং মিত্র বাহিনীর আক্রমণের ভয়ে জার্মান পুলিশরা তার প্রস্তাবে রাজি হয় এবং ৩ জন স্পাইকেই ছেড়ে দেয়। ক্রিস্টিনেকে তার সাহসের জন্য আজও ইতিহাসের পাতায় স্মরণ করা হয়।
এক বিখ্যাত জাজ গায়িকা যিনি তার মিউজিক শিট এবং অন্তর্বাসের ভেতরে করে তথ্য পাচার করতেন
জোসেফাইন বেকার। আমেরিকাই তার জন্ম। বেশ জনপ্রিয় গায়িকা ছিলেন তিনি। নাচতেনও বেশ ভাল। তিনি ১৯৩৭ সালে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। যখন ২য় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকেই ফ্রান্স জার্মানদের দখলে চলে আসে তখন বেকার তাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে তিনি আসলে তাদেরই দলের লোক। জোসেফাইন বেকার পরবর্তিতে বেশ কিছু বছর মিত্র শক্তির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেন। তিনি উচ্চবিত্তদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে উচ্চ পদের সেনাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতেন।
তিনি তথ্য পাচারের সময় তার মিউজিক শিটে স্বাভাবিকভাবে দেখা যায় না এমন ধরণের অদৃশ্য কালি দিয়ে তার তথ্যগুলো লিখতেন। যখন কোন গোপন ছবি পাচার করার প্রয়োজন পড়ত তিনি তা তার অন্তর্বাসের ভেতরে পিন দিয়ে আটকিয়ে নিতেন।
এরকম আরো অসংখ্য রোমাঞ্চকর কাহিনীর ভেতর দিয়ে শেষ হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। যার অনেকগুলো কাহিনী হয়ত এখনও সাধারণ মানুষেরা জানে না। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এমন আরো কিছু রোমাঞ্চকর ঘটনা নিয়ে
প্রাচীন পৃথিবীর কিছু অনন্য নিদর্শন
আজকের যুগে আধুনিক সব যান্ত্রিক সুবিধার মধ্যে বসবাস করার সময় মাঝে মাঝেই আমরা ভাবি, অনেক অনেক কাল আগে যখন এসবের ধারণাও জন্মায় নি মানুষের মনে, যখন জীবনযাপন ছিল এমন ধরণের সুযোগ সুবিধা বর্জিত, তখনকার সেই ঐতিহাসিক পৃথিবীটা কেমন ছিল? চোখের সামনে আজ যা দেখি সেগুলোর প্রথম দিকের নিদর্শনগুলো ঠিক কেমন ছিল? প্রত্নতাত্ত্বিকদের নিয়ত পরিশ্রম আর গবেষণার কারণে আমরা জানতে পারছি এসব প্রশ্নের উত্তর। আবার কখনও কখনও একেবারে নতুন কোনো আবিস্কার পাল্টে দিচ্ছে এতদিন পর্যন্ত চলে আসা ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে। এমনই কিছু আবিস্কার নিয়ে আমাদের নিয়মিত লেখার আজকের পর্বে থাকছে প্রাচীন পৃথিবীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির কথা যেগুলো ঋদ্ধ করেছে ইতিহাস বিষয়ক মানুষের জ্ঞানকে।
এন্টিকাইথেরা মেকানিজম
এন্টিকাইথেরা মেকানিজম হল পৃথিবীর প্রাচীনতম এনালগ কম্পিউটার। এটি আবস্কৃত হয় গ্রিসের এন্টিকাইথেরা দ্বীপ থেকে। মহাকাশের বিভিন্ন বস্তুর অবস্থান, সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের সময় ইত্যাদি জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত কাজ করা হত এটি দিয়ে। তারিখ গণনা, জ্যোতিষবিদ্যা ও প্রাচীন অলিম্পিক গেইমের সময় নির্ধারণের জন্যই নির্মিত হয়েছিল যন্ত্রটি।
এন্টিকাইথেরা দ্বীপের অবস্থান ক্রিট এবং পেলোপনিজের মাঝখানে এজিয়ান সাগরের বুকে। ১৯০০ সালে একদল ডুবুরি সাগরের প্রায় দেড়শ ফুট গভীরে খুঁজে পান একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। সেখান থেকে ব্রোঞ্জ ও মার্বেলের তৈরি মূর্তি, পাত্র, কাঁচের জিনিস, অলঙ্কার, মুদ্রা ইত্যাদি অসংখ্য দ্রব্যসামগ্রী সাথে পাওয়া যায় এই যন্ত্রটি। এরপর এগুলো রাখা হয় এথেন্সের প্রত্নতাত্ত্বিক যাদুঘরে। আবিস্কারের দুই বছর পর্যন্ত এই বিশেষ যন্ত্রটি কেউ খেয়ালই করেনি।
১৯০২ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক ভ্যালেরিওস স্টেইস উদ্ধারকৃত জিনিসগুলো পরীক্ষা করতে গিয়ে যন্ত্রটি লক্ষ্য করেন। তখনই তিনি ধারণা করেন এটি হয়ত জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যবহৃত কোনো মহাকাশ ঘড়ি। তখন অনেক বিশেষজ্ঞই মতামত দেন যে, ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত অন্য জিনিসগুলো যে সময়কার, এটি সে সময়ের নয়। কারণ তখন অত জটিল ধরনের যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব ছিল না। এরপর ১৯৫১ সালের আগ পর্যন্ত এটি নিয়ে আর কোনো গবেষণা হয়নি। দীর্ঘ ২৩ বছর গবেষণার পর এন্টিকাইথেরা মেকানিজম বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়।
এই যন্ত্রটি একটি কাঠের বাক্সের ভেতরে বসানো থাকত। অন্তত ত্রিশটি তামার তৈরি গিয়ারের মাধ্যমে চলত এই ঘড়ি সদৃশ জটিল যন্ত্রটি। বিজ্ঞানীরা এটি পুননির্মাণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে কাজ করত এন্টিকাইথেরা মেকানিজম। সেই জাহাজে এটি কীভাবে এল তা এখনও গবেষকদের অজানা। ১৯৭৪ সালে যন্ত্রটির গঠনপ্রকৃতি গবেষণা করে ধারণা করা হয়, এটি নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৮৭ সালের দিকে। দুবছর পর আরেক গবেষক ধারণা করেন, এর নির্মাণকাল আরেকটু পরে, খ্রিস্টপূর্ব ৭৬ থেকে ৬৭ সালের মধ্যে।
২০০৬ সালে যন্ত্রটি নিয়ে একটি গবেষণা প্রজেক্টের রিপোর্টে বলা হয়, গ্রিসের বিখ্যাত কোরিন্থে চর্চিত জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞানের প্রয়োগ আছে এই যন্ত্রে। সে কারণেই এটি এ অঞ্চলে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তার উপর কোরিন্থেরই একটি কলোনি সিরাকিউসে বসবাস করতেন স্বয়ং আর্কিমিডিস। এ কারণে যন্ত্রটির নির্মাণে আর্কিমিডিসের সরাসরি বা তাত্ত্বিক প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
উদ্ধারকৃত জাহাজটিতে আরও পাওয়া গিয়েছিল রোডস দ্বীপের ফুলদানি। আবার, খ্রিস্টপূর্ব ১৪০ থেকে ১২০ সালের মধ্যে রোডস দ্বীপে কর্মরত ছিলেন বিজ্ঞানী হিপার্কাস যার প্রদত্ত চাঁদের ঘূর্ণন সংক্রান্ত সূত্র এই যন্ত্রে কাজে লাগানো হয়েছে। তাই এমনও ধারনা করা হয়, হিপার্কাস এটি তৈরি করেছিলেন বা তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন।
২০১৪ সালে দুজন বিজ্ঞানী গবেষণা করে মত দেন, এন্টিকাইথেরা মেকানিজমের নির্মাণকাল সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সাল। তারা এও বলেন, গ্রিক ত্রিকোণমিতিক পদ্ধতির চেয়ে বরং ব্যাবিলনীয় পাটিগণিতীয় পদ্ধতির সাথে এই যন্ত্রের কৌশলের অধিক মিল রয়েছে।
এন্টিকাইথেরা মেকানিজম কখন নির্মিত হয়েছে তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। যে যুগে এটি তৈরি হয়েছিল সে সময়েও যে এমন ধরনের যন্ত্র নির্মাণ করা যেতে পারে- এই তথ্যটাই ইতিহাসে জন্য এক আশ্চর্যজনক আবিস্কার।
আশুরবানিপল লাইব্রেরি
আশুরবানিপল লাইব্রেরি ছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে নির্মিত একটি লাইব্রেরি। আজকের গোটা মধ্য প্রাচ্য নিয়েই এককালে ছিল নিও-আসিরিয়ান সাম্রাজ্য। লৌহ যুগের এই মেসোপটেমিয়ান সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী রাজা আশুরবানিপলের নামে এই লাইব্রেরির নামকরণ করা হয়েছিল। প্রাচীন পারসিক ও আর্মেনীয় ইতিহাস অনুসারে ধারণা করা হয়, আশুরবানিপল লাইব্রেরি দেখেই আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ইতিহাস বিখ্যাত ‘লাইব্রেরি অব আলেকজান্দ্রিয়া’র নির্মাণ কাজ শুরুর জন্য। এই লাইব্রেরির সংগ্রহেই ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত ‘এপিক অব গিলগামেশ’ তথা গিলগামেশের মহাকাব্য।
এই লাইব্রেরিতে কাদামাটির ফলকে লিপিবদ্ধ আছে সে সময়ের বিভিন্ন বিষয়ের ইতিহাস ও জ্ঞান। ফলকগুলো উদ্ধার করা হয়েছে খণ্ড খণ্ড অবস্থায়। ধারণা করা হয়, সব মিলিয়ে অন্তত দশ হাজার রচনা ছিল এই লাইব্রেরিতে, যেগুলো পরে খণ্ডিত হয়ে যাওয়ার কারণে আলাদা আলাদা করে মোট ৩০,৯৪৩ টি ফলক তৈরি হয়েছে। এখন যেখানে ইরাকের মসুল শহর অবস্থিত, তার কাছেই ছিল অ্যাসিরিয়ার রাজধানী নিনেভাহ। সে জায়গাতেই আবিস্কৃত হয়েছে এই লাইব্রেরিটি।
অ্যাসিরীয় রাজা সেনাশেরিব এর প্রাসাদ যেখানে ছিল, সেখানে ১৮৪৯ সালে একটি লাইব্রেরি আবিস্কৃত হয়। সেই লাইব্রেরির অধিকাংশ ফলক পাঠিয়ে দেয়া হয় ইংল্যান্ডে, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নিকট। এর তিন বছর পর আবিস্কৃত হয় আশুরবানিপল লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরির ফলকগুলো ইংল্যান্ডে পাঠানোর পর কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেগুলো মিশে যায় আগের আবিস্কৃত অন্যান্য ফলকের সাথে। এ কারণে গবেষকদের পক্ষে এই লাইব্রেরির একেবারে নিজস্ব সংগ্রহের মূল তালিকা তৈরি করা আর সম্ভব হয়নি।
রাজা আশুরবানিপল তার সাম্রাজ্যের প্রতিটি স্থানে আদেশ পাঠিয়ে আনিয়ে নিয়েছিলেন বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান লিপিবদ্ধ করা ফলকগুলো। খণ্ডিত অবস্থায় থাকা প্রায় ত্রিশ হাজার ফলকের মধ্যে আছে তৎকালীন সাম্রাজ্যের ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন স্থানের খবর, রাজ্যের বিভিন্ন ঘোষণা, আইন ও অর্থনৈতিক অবস্থা সংক্রান্ত নানা ধরনের তথ্য। আরও আছে জ্যোতিষিদের ভবিষ্যৎবানী, সতর্কবার্তা, মন্ত্র ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে লিখিত রচনা। চিকিৎসাশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত এবং সাহিত্যিক রচনাও রয়েছে ফলকগুলোতে। ধারণা করা হয়, একবার আগুনে পুড়ে গিয়ে লাইব্রেরির অনেকগুলো কাদামাটির ফলক আরও মজবুত রূপ পায়। প্রাচীন পৃথিবীর ভাষা, সাহিত্য, সমাজ, রাজ্য পরিচালনা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় জানার জন্য এই লাইব্রেরির ফলকগুলো কাছে ঋণী হয়ে আছে মানুষের ইতিহাস।
গবেকলিটেপি মন্দির
গবেকলিটেপিকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম মন্দির। তুরস্কের সানলিউরফা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে রয়েছে এই প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনাটি। ধারণা করা হয়, এই মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ সালে। এবং সেই আমলে এ ধরণের জটিল স্থাপত্যবিদ্যার প্রয়োগ কীভাবে সম্ভব হল সে প্রশ্নটাই জন্ম দিয়েছে ইতিহাসের এক আশ্চর্যজনক অধ্যায়ের।
১৯৯৫ সালে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লাউজশ্মিঠের নেতৃত্বে এই স্থানে খননকাজ শুরু হয়। খননের পর আবিস্কৃত হয়, গবেকলিটেপি কেবল একটিমাত্র স্থাপনা ছিল না। এটি কতগুলো বৃত্তাকার ও ডিম্বাকৃতির স্থাপনার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল একটি পাহাড়ের উপর। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায়, এই স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়েছিল ধর্মীয় আচার-অর্চনা পালনের উদ্দেশ্যে। অন্তত ২০ টি স্থাপনা ছিল এই জায়গাটায়। পুরো মন্দিরের গঠন প্রকৃতি থেকে জানা যায়, প্রতিটি স্থাপনার ঠিক কেন্দ্রে ছিল দুটি বিরাট আকৃতির পিলার। সেগুলোকে ঘিরে ছিল আরও দেয়ালের মত অংশ। এগুলোর মধ্যেও ছিল আরও কিছু পিলার।
প্রতিটি পিলার ছিল ‘T’ আকৃতির এবং ৩ থেকে ৬ মিটার উঁচু। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করছেন, এই ‘T’ আকৃতির পিলার আসলে মানুষের আকৃতির আদলে গড়া। কিছু পিলারে রয়েছে মানুষ সদৃশ নকশা খোদাই করা। রহস্যময় এই পাথরের স্থাপনাগুলোর গায়ে আরও রয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর নকশা ও বিমূর্ত প্রতীক। আবার কোথাও এই প্রতীকগুলো মিলে একটি দৃশ্যের অবতারণা করেছে।
শেয়াল, সাপ, বুনো ভালুক, বক, বুনোহাঁস ইত্যাদির ছবি রয়েছে অনেক জায়গায়। বেশিরভাগ নকশাই পিলারের সমতল অংশে খোদাই করা। আবার কিছু কিছু পিলারে রয়েছে ত্রিমাত্রিক ধরণের ভাস্কর্য, যেখানে দেখা যায় সিংহ সদৃশ কোনো শিকারি প্রাণীর ছবি খোদাই করা আছে পিলারের এক প্রান্তে।
গবেকলিটেপির সংরক্ষনের জন্য ব্যবহৃত পদ্ধতির কারণেই এই বিস্ময়কর স্থাপনাটি টিকে ছিল এত দিন ধরে। মন্দিরটি নির্মাণের সময় মাটিতে যে গর্তগুলো করতে হয়েছিল সেগুলো একেবারে গভীর পর্যন্ত এমন ভাবে ভরাট করে দেয়া হয় যেন কোথাও ফাঁকা না থাকে। এ কারণে এর ভিত্তি হয়েছিল অত্যন্ত মজবুত।
প্রতিটি ‘T’ আকৃতির পিলারের ওজন ছিল অন্তত ৪০ থেকে ৬০ টন! বিস্মিত হবার জায়গাটা এখানেই। যখন কেবল সাধারণ হাতে বানানো টুকটাক যন্ত্রপাতি তৈরির যুগ শুরু হয়েছে, তখন কীভাবে এমন বিশাল ওজনের পাথর খণ্ড একটার উপর আরেকটা বসিয়ে এই বিশালাকৃতির স্থাপনা গড়ে তোলা হল সেটাই তো আশ্চর্যের। যখন উল্লেখ করবার মত কোনো সমাজ কিংবা জনবসতিই প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যখন কৃষিকাজের ধারণাই মানব মনে এসে পৌঁছায়নি, যখন মানুষ নির্ভর করত কেবলমাত্র প্রাণী শিকার ও বনের গাছপালার উপর, তখন কী করে এমন জটিল ধরনের একটা স্থাপত্য নির্মাণ সম্ভব হল সে প্রশ্নটাই ধাঁধাঁয় ফেলে দিচ্ছে বিজ্ঞানীদের। সভ্যতার যে ইতিহাস এখন পর্যন্ত আমরা জানি তা বদলেও যেতে পারে, যদি এই প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনার খুঁটিনাটি তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
দুনিয়া কাঁপানো ৫ দুধর্ষ নারী মাফিয়া
নারী- মমতাময়ী, আবেগপ্রবণ। একটি সমাজ সুশৃঙ্খল ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার পিছনে নারীর ভূমিকার কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এজন্যই তো নেপোলিয়নের মুখে উচ্চারিত হয়- “তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের সভ্য শিক্ষিত জাতি দেব”। কিন্তু সব নারীই যে আদর্শের প্রতিরূপ হবেন তা কিন্তু নয়। এই পৃথিবীতে এমন অনেক নারী রয়েছে যাদের নৃশংসতার কথা শুনলে আপনি শিউরে উঠতে পারেন। মাদক, চোরাচালান, খুন, রাহাজানি, মানি লন্ডারিং কোথায় জড়িত নেই এই তারা! দুনিয়া কাঁপানো এমনি ৫জন দুধর্ষ নারী মাফিয়ার গল্প বলব আজ।
রোসেটা কুটোলো
ইতালির কুখ্যাত মাফিয়া রাফায়েল কুটোলোর বোন। ১৯৩৭ সালে জন্ম এই রোসেটা কুটোলোকে মাফিয়া সাম্রাজ্যের ‘সিস্টার অফ রাফায়েল’ নামেও ডাকা হত। জীবনের শুরুতে এই ধুসর চুলের নারী খুবই ধার্মিক ছিলেন। মায়ের সাথে একাকী ইতালির নেপলসের একটি গ্রামে বসবাস করতেন। গোলাপের চাষ করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি হয়ে উঠেন ভয়ঙ্কর মাফিয়া।
তার ভাই মাদক সম্রাট রাফায়েল জীবনের অধিকাংশ সময় জেলেই বন্দি ছিলেন। জেলবন্দি থাকা অবস্থায় মাদক চোরাচালান ব্যবসার দায়িত্ব নেয় রোসেটা। জেল থেকে রাফায়েল যে নির্দেশ এবং পরামর্শ দিতেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন রোসেটা। পনের বছরের অধিক সময় ধরে গোলাপ চাষের আড়ালে ভাইয়ের মাদক সম্রাজ্যে ভাইয়েরই নির্দেশে নিভৃতে কাজ করে গেছেন এই নারী।
ভাইয়ের এই সংগঠনের দায়-দায়িত্ব নিষ্ঠাভরে পালন করার কারণে জেলে থেকেও রাফায়েল তার মাদক সাম্রাজ্যকে অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুলিশের সন্দেহ, রোসেটা সেসময় থেকেই এই সংগঠনকে শক্ত হাতে ধরতে না পারলে এই সংগঠন ভেঙ্গে পড়তো। রোসেটা একটি দূর্গ কিনেছিলেন। সেখানেই আড়ালে চলতো চোরাচালান ব্যবসা। সর্বশেষ, ১৯৯৩ সালে পুলিশের কাছে ধরা দেন রোসেটা কুটোলো।
সান্ড্রা আভিলা বেলট্রান
১১ অক্টোবর ১৯৬০ সালে জন্ম সান্ড্রা আভিলা বেলট্রানের। চোখে মুখে সবসময়ে লেগে থাকতো দুষ্টুমির ইঙ্গিত। তার মুচকি হাসি সকলকে মোহিত করে রাখতো। যখনই ফটোশুট করাতেন তখনই আরও মোহনীয় রূপ বেরিয়ে আসতো তার। কিন্তু তার এই হাসির পিছনে লুকিয়ে থাকতো এক হিংস্র ইমেজ। তাকে কেন্দ্র করে মেক্সিকোতে গড়ে উঠে এক বিশাল মাদক জগত। দেশের সবচেয়ে বড় ড্রাগ ডিলার ও গ্যাংস্টার হয়ে উঠেন সান্ড্রা আভিলা বেলট্রান।
৫৬ বছরের সান্ড্রা একসময় হয়ে উঠে মেক্সিকো সহ পুরো আমেরিকা ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় ড্রাগ মাফিয়া। বেশ ধনী মহিলা সান্ড্রা বলতে গেলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের মালিক। মাদক সাম্রাজ্যে তাকে ‘দ্যা কুইন অফ দ্যা প্যাসিফিক’ অনেকে ডেকে থাকেন।
তার দু’চোখের সম্মোহনী সুধা যেকোনো পুরুষকেই কাছে টেনে নেয়ার মতই। এমন যাদু মাখানো তার দু’চোখ যে খোদ পুলিশ কর্তারা পর্যন্ত তার প্রেমে হাবুডুবু খেতেন। গুলির লড়াই নয়, চোখের ইশারায় মেক্সিকোর দুই পুলিশ কর্তাকেই পকেটে পুরেছিলেন সান্ড্রা। দু’বার দুই পুলিশকে বিয়ে করেন বেলট্রান। পরবর্তীকালে দুই স্বামীকে ড্রাগ ব্যবসার কাজে নামিয়ে ছিলেন তিনি। পরে সুযোগ বুঝে দু’জনকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে সান্ড্রাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মাদক, চোরাচালানের সঙ্গে বেআইনি অস্ত্র চোরাচালান এবং মানি লন্ডারিং ইত্যাদি অনেকগুলো অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। তবে পুলিশকে বেলট্রান জানিয়েছিলেন, কাপড় বেচে সংসার চালাতে হয় তাকে।
মেলিসা ক্যালডেরন
১২ আগস্ট ১৯৮৪ সাল। মেক্সিকোতে জন্ম এই মেলিসা ক্যালডেরনের। এত অল্প বয়সেই গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল মাদক সাম্রাজ্য। সেই সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী মেলিসা মারগারিতা ক্যালডেরন ওজেদা। মাদক সম্রাট পেড্রো-র সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন তিনি। অপহরণ করে বাড়িতে ফোন করে মুক্তিপণ চাওয়া, মুক্তিপণ না মিললে অপহৃতের বাড়ির সামনেই তার লাশ ফেলে আসার মত দুর্ধর্ষ ঘটনা ঘটানোই হল এই নারী মাফিয়া মেলিসার বাম হাতের কাজ। সবসময় তার সাথে থাকে দুটি মেশিনগান।
মেলিসা অন্ধকার জগতে ‘La China’ নামে অধিক পরিচিত। যে কোনও জঙ্গি সংগঠন তাকে লুফে নিতে সর্বদা তৈরি। তবে ড্রাগ দুনিয়ার বাইরে তার আর কিছুতেই বিশ্বাস নেই। সান্ড্রা পরবর্তী মেক্সিকোর সব চেয়ে নৃশংস নারী গ্যাংস্টার মেলিসা। দুনিয়ার সব থেকে ভয়ানক নামগুলির তালিকায় তার নাম এসেছে।
মেক্সিকো পুলিশের দেয়া তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, মেলিসার বায়োগ্রাফি বেশ আকর্ষণীয়। ২০০৫ সালে অসৎসঙ্গে পড়ে এই ব্যবসায় তার হাতেখড়ি হয়। আরেক মাদক সম্রাট এল চ্যাপো গুজম্যানের হাত ধরে তার উত্থান ঘটে। মাত্র তিন বছরের মাথায় ২০০৮ সালেই দিব্যি বনে যান মাফিয়া কুইন নামেই। মেজাজি মাথা ও সুন্দর চেহারার জন্য এ সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হতে তার বিশেষ দেরি হয়নি।
পুলিশের আরেকটি রিপোর্ট অনুযায়ী, মেলিসা ক্যালডেরন কম করে হলেও ১০৫ জনকে গুলি করে খুন করেছে। ৩২ বছরের মেলিসার অধীনে ৩০০ জন কুখ্যাত খুনি ও গুণ্ডা অপরাধমূলক কাজ করে থাকে। আপাতত বন্দি মেলিসা। তাকে ধরার জন্য টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয় তারই সহযোগী পেদ্রোকে। অথচ এই পেদ্রোকে একসময় গভীরভাবে ভালবাসেন মেলিসা। সেই প্রেমিক পেদ্রোই শেষমেশ তার প্রেয়সীকে ধরিয়ে দিয়েছিল পুলিশের হাতে।
তবে পুলিশ মেলিসাকে ধরতে পেদ্রোকে ব্যবহার করেছে বেশ সুকৌশলে। পেদ্রোর ওপর থেকে সব অপরাধের চার্জ তুলে নেয়া হবে এমন টোপেই এতোদিনের ভালোবাসার সম্পর্ক বিসর্জন দিয়ে পুলিশের কাছে মেলিসার গোপন ডেরার খোঁজ দেয় পেদ্রো। পুলিশও সুযোগ বুঝে মেলিসাকে গ্রেপ্তার করে। তবে তাই বলে মেলিসার মাদক সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়নি। পুলিশের অনুমান, জেল থেকেই এই সাম্রাজ্য চালাচ্ছে ডন মেলিসা।
এনিডিনা আরিলানো ফেলিক্স
তিনি মারিও পুজোর লেখা ‘গডফাদার’ চরিত্র না হলেও অপরাধ দুনিয়ায় বিশেষভাবেই পরিচিত ‘গডমাদার’ নামে। অনেকে আবার ‘দ্য বস’ নামেও ডাকে। ১২ এপ্রিল ১৯৬১ সালে জন্ম এই গড মাদার মেক্সিকোর সব থেকে বড় ড্রাগ চক্র Tijuana Cartel-এর মালিক। এর আগে এই গ্রুপ তার পাঁচ ভাইয়ের অধীনে ছিল।
এনিডিনা তাদেরকে মানি লন্ডারিং এবং প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করতো। কিন্তু ২০০০ সালে তাদের প্রধান পরিকল্পনাকারীর পতন ঘটে। তখন থেকে এই গ্রুপের কর্তৃত্ব চলে আসে এনিডিনার হাতে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এনিডিনা বিশ্বের প্রথম ড্রাগ ব্যবসায়ী যে চক্রের সাথে সরাসরি যুক্ত না থেকে প্রথমে দলের আর্থিক দেখভাল করতো। পরবর্তীসময়ে তার ভাইদের গ্রেফতার আর কয়েকজন দলের কয়েজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের খুন হওয়ার মধ্য দিয়ে এই মাফিয়ার ড্রাগ সাম্রাজ্যে প্রবেশ ঘটে। বর্তমানে তিনি একমাত্র নারী ডন যার হাতে রয়েছে সবচেয়ে বড় ড্রাগ কারবারের কর্তৃত্ব।
মারিয়া লিওন
ইনি স্প্যানিশ অভিনেত্রি মারিয়া লিওন নন। অপরাধ জগতের কুখ্যাত ডন মারিও লিওন। ১৩ সন্তানের জননী এই মারিও লিওন লস এঞ্জেলসের মাফিয়া জগতের মাথা। মাদক চোরাচালান থেকে সুপার কিলিং, হিউম্যান ট্রাফিকিং- সব জায়গায় তার নাম নানাভাবে জড়িয়ে আছে।
২০০৮ সালে লস এঞ্জেলসে পুলিশের গুলিতে মারিয়ার ছেলে ড্যানি মারা যায়। ফলে লস এঞ্জেলসে থাকা মারিয়ার কাছে আর নিরাপদ মনে হয়নি। গা-ঢাকা দেওয়ার জন্য চলে আসে মেক্সিকোতে। মৃত ছেলের শেষকৃত্যে সামিল হতে গিয়ে ধরা পড়ে। পরবর্তী সময়ে মারিয়াসহ এই গ্রুপের অনেক সদস্যই ধরা পড়ে। আদালতে মারিয়ার ৮ বছরের সাজা হয়।
রহস্যময়তায় ঘেরা পেরুর নাজকা রেখা
সাল ১৯২৭। সেসময় পেরুর এক আর্কিওলজিস্ট তোরিবিও মেহিয়া কেসপ ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন দক্ষিণ পেরুর এক শুষ্ক মালভূমি অঞ্চলে। অঞ্চলটি নাজকা মরুভূমি নামেই অধিক পরিচিত। হঠাৎ-ই তার চোখে পড়ে দূরে অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চলে কিছু অদ্ভুত রেখা। কেউ যেন রেখাগুলো দিয়ে কিছু অতিকায় জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছে মরুভূমির বুক চিরে। এর প্রায় বছর তিনেক বাদে এক পাইলট ওই শুষ্ক অঞ্চলের উপর দিয়ে যেতে যেতে তারও চোখে পড়ে মরুভূমির বুকে ওই জটিল নকশাগুলো। যেন কোন শিল্পী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পাথুরে বুকে এঁকে রেখেছে কোনো এক প্রাচীন সংকেত।
এরপর কেটে গেল অনেক বছর। তখন ১৯৩৯ সাল। পেরুর রাজধানী লিমা শহরে এক আর্কিওলজিক্যাল কনফারেন্সে তোরিবিও ওই রহস্যময় রেখাগুলোর কথা আবার উল্লেখ করেন। সকলের মনে এবার তীব্র কৌতূহল জাগে। সেই সময় একজন আমেরিকান ঐতিহাসিক পল কসক কাজ করেছিলেন পেরুতেই। তার গবেষণার বিষয় ছিল পেরুসহ বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার সেচ-প্রণালী ব্যবস্থা। নাজকা রেখা সম্পর্কে জানতে পেরে তারও বেশ দারুণ কৌতূহল জাগে। তিনি একটা প্লেন ভাড়া করে নিজের চোখে দেখতে গেলেন ওই রহস্যময় নকশা।ঐ অদ্ভুত নকশা দেখেই তিনি চুপ মেরে থাকলেন না, এই রেখার রহস্য উদঘাটনে উঠে পড়ে লাগলেন। এই সময় তার সঙ্গে যোগ দেন জার্মান গণিতজ্ঞ ও আর্কিওলজিস্ট মারিয়া রাইখ। এই দুজন শুরু করেন নাজকা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা।
নাজকা লাইন আসলে কী? লিমা শহর থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণের উষর মরুভূমি জুড়ে রয়েছে এই নাজকা লাইন। এই মরুভূমিতে বালির অস্তিত্ব নেই, আছে বাদামি রঙের অসংখ্য আলগা পাথর। আর সেই পাথরের বুক চিরে রয়েছে এই প্রাচীন রহস্য। এই মরুভূমির প্রায় ৫০০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে ১০ হাজারেরও বেশি অতিকায় রেখা রয়েছে।
এই রেখা দিয়ে কোথাও তৈরি হয়েছে বিরাট বিরাট জ্যামিতিক নকশা, কোথাও বা তৈরি হয়েছে ফুল, গাছ, বিভিন্ন প্রাণী, এমনকি মানুষের প্রতিকৃতিও। এই চিত্রগুলো এতই বড় যে সামনে থেকে দেখলে এগুলোকে রেখা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। ভূমি থেকে অনেকটা উপরে উঠলে আস্তে আস্তে চোখে পড়ে ওই রেখাগুলো একে- অপরের সাথে জুড়ে গড়ে তুলেছে নানা রকম নকশা এবং আদল। বিশেষজ্ঞদের মতে এগুলো তৈরি করা হয়েছে প্রায় আজ থেকে তিন হাজারেরও বেশি বছর আগে। যা কিনা প্রাচীন নাজকা ও প্যারাকাস সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহণ করে।
নাজকা রেখা দিয়ে তৈরি চিত্র বা নকশাগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। জিওগ্লিফস এবং বায়োমরফস। বায়োমরফস বলতে বুঝায় জীবজগৎ অর্থাৎ পশু- পাখি বা গাছপালার ছবি। যেমন: হামিংবার্ড, মাকড়শা, হনুমান এবং মানুষের ছবি। আর জিওগ্লিফস অর্থ জ্যামিতিক আকৃতি। নাজকার উপর প্রায় শতাধিক এমন জ্যামিতিক নকশা চোখে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে এই চিত্রগুলো আকারে বেশ বড়। কোন কোন চিত্র প্রায় ২০০ মিটার অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠেছে।
কিভাবে তৈরি হল নাজকা রেখা? নাজকা মরুভূমিতে অবস্থিত হওয়ায় এটি আয়রন অক্সাইড পাথরে আবৃত। এর নিচে রয়েছে চীনাপাথরের মাটি। নাজকা লাইন তৈরি হয়েছে এই পাথুরে জমি খুঁড়ে। রেখাগুলো প্রায় চার থেকে ছয় ইঞ্চি গভীর। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাচীন হট এয়ার বেলুন থেকে বা পাহাড়ের উপর থেকে সার্ভের মাধ্যমে আঁকা হয় নাজকা লাইনস। এই যুক্তি অনেকেই মানতে নারাজ।
কারা আকঁল এই রেখা? প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। অনেকের মতে ইনকা সভ্যতার শুরু এই এলাকা থেকে। ইনকা সভ্যতার মানুষের মেধা, শ্রম এবং সময় ব্যয় করে এই রেখাগুলো তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আরেকদল গবেষকদের মতে, জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে উন্নত এলিয়েনরা সেই প্রাচীন সময়ে এইসব রেখাচিত্র অঙ্কন করে গেছে পেরুতে।
আরো একটি বিষয় ব্যাপক বিস্ময় জাগায় । এত বছর আগে তৈরি এই লাইন আজও একইভাবে রয়েছে কীভাবে? এর উত্তর প্রকৃতি। বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক শক্তি যেমন নদী, বায়ু, হিমবাহ ইত্যাদি তাদের নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ভূমি রূপের নানা পরিবর্তন ঘটায়। নাজকা মরূভূমি অঞ্চল এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এই অঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক। সারাবছরই এ অঞ্চলের তাপমাত্রা থাকে ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বৃষ্টি নেই বললেই চলে। ফলে হাজার হাজার বছর ধরে নাজকা রেখা গুলো একই রকম থেকে আজ ও মানুষের মনে বিস্ময় জাগিয়ে রেখেছে।
তবে কী উদ্দেশ্যে মাইলের পর মাইল এই রেখা খনন করা হয়েছে? তা নিয়েও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে নানা মত। প্রথমেই আসা যাক পল কসকের কথায়। তার মতে নাজকা লাইনের সঙ্গে জ্যোতির্বিদ্যার এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নাজকা নাকি বিরাট এক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। তিনি মনে করতেন নাজকা রেখাগুলো নাকি তারা মন্ডলের প্রতিরূপ। আবার অনেক গবেষকই মনে করেন, এগুলোর তৈরির পিছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধর্মীয় কারণ জড়িত। মনে করা হয় এই রেখাগুলো হয়ত কোনো ধর্মীয় উপাচারের অঙ্গ। হয়তো আকাশ থেকে ঈশ্বরের দৃষ্টি আকর্ষণ করানোর জন্যেই প্রাচীন পেরু বাসিন্দারা এমন অতিকায় বিচিত্র নকশা বানিয়েছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন, পানির সন্ধানে পাওয়া যেতে পারে সেরকম স্থান গুলোকে সংযুক্ত করতেই রেখাগুলো আঁকা হয়। এর সপক্ষে জোরালো যুক্তি পাওয়া না গেলেও প্রাচীন রুক্ষ, শুষ্ক পেরু অঞ্চলের কথা ভাবলে এরকম সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আবার অনেকে মনে করেন, নাজকা লাইনের সাথে প্রাচীন টেক্সটাইল শিল্পের যোগসূত্র আছে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন ওই বিশাল লম্বা রেখাগুলো প্রাচীন মানুষেরা লুম হিসেবে ব্যবহার করত। এই সুতো দিয়েই নাকি প্যারাকাস সংস্কৃতিতে নাকি মমি আবৃত করা হত।
এসবের মধ্যে সুইস লেখক এরিক ফন দানিকেনের তত্ত্বটি বেশ জনপ্রিয়। ১৯৬৪ সালে তার লেখা বই ‘চ্যারিয়টস অফ গড’-এ তিনি জানান যে, প্রাচীনকালে ভিন গ্রহের প্রাণীরা নাকি পৃথিবীতে আসতো। এই লাইনগুলো ছিল তাদের স্পেসশিপের রানওয়ে। ভবিষ্যতে যাতে তারা পথ চিনে ফিরে আসতে পারে সেই কারণে নাকি প্রাচীন পেরুর বাসিন্দারা আরও বিভিন্ন নকশা অংকন করেন। বর্তমান সময়ের রানওয়ে এবং নাজকা লাইনের মধ্যে যে সাদৃশ্য রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে দানিকেনের তত্ত্বকে একেবারে উপেক্ষা করার কোন জো নেই।
এতো বিশাল এলাকা জুড়ে পাথর কেটে এমন নিখুঁত রেখা টানা সহজ কাজ নয়। যদিও এর নির্মাণে কত সময় ব্যয় হয়েছে তা পরিস্কার নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতো বিশাল এলাকায় শ্রমসাধ্য কাজ অল্প দিনে হয়নি। প্রজম্মের পর প্রজম্ম ধরে বিশালাকার রেখাগুলো তৈরি করা হয়েছে।
নাজকা রেখা নিয়ে বিভিন্ন গবেষকদের গবেষণা এখনও শেষ হয়নি। যদিও সঠিক উত্তর এখনো আমাদের অজানা। আর অজানা বলেই তো এত রহস্য, এত প্রশ্ন। সবারই আশা, এর উত্তর একদিন মিলবেই। ততদিন কল্পনায় নানা সম্ভাবনার কথা ভেবে দেখতে ক্ষতি কি!
নিউইয়র্কের হাইডসভিল: আধুনিক প্রেতচর্চার আঁতুড়ঘর
ভুতুড়ে বাড়ির কখনো দেখা পেয়েছেন? এই পৃথিবীর অনেক দেশেই দেখা মিলবে অদ্ভুত যতসব ভুতুড়ে বাড়ির। তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় ভুতুড়ে বাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া যাবে ইংল্যান্ড ও আমেরিকাতেই। আরো বেশি আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এসব বাড়ির অনেকগুলাই পরবর্তীতে ব্যবহৃত হয়েছে আধ্যাত্মিকতা ও প্রেতচর্চার কেন্দ্র হিসেবে। এমনি এক ভুতুড়ে বাড়ি নিউইয়র্কের হাইডসভিল কটেজ। কিন্তু এ বাড়িতে ভুতের অস্তিত্ব আসলেই ছিল কিনা তা জানতে হলে আমাদেরকে একটু ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরাতে হবে।
আনুমানিক ১৮১৫ সালে ড. হাইড নামে একজন ব্যক্তি হাইডসভিল কটেজ নির্মাণ করেন। পরে তার সন্তান এর উত্তরাধিকারী হন। বেশ কয়েকবার এ বাড়ির মালিকানা বদল হয়ে সবশেষে জন ফক্স এই বাড়ির মালিকানা লাভ করেন। বর্তমানে ফক্স হাউস নামেই এটি অধিক পরিচিত।
১৮৪৭ সালের ১১ ডিসেম্বর জন ফক্স তার পরিবার সমেত এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। জন ফক্স ছিলেন একজন কামার ব্যবসায়ী। তিনি তার ব্যবসায় প্রভুত উন্নতি করেন। কিন্তু তার একটা বদঅভ্যাস ছিল। তিনি প্রায় সময় এলকোহলে আসক্ত থাকতেন। ফলে ব্যবসায় লস করতে থাকেন। এক সময় পরিবারকে নিয়ে থিতু হওয়ার আশায় খুব কম মূল্যেই হাইডসভিল কটেজটি কিনে নেন। জন ফক্স, তার স্ত্রী মার্গারেট আর তাদের দুই মেয়ে ম্যাগী ও কেটিকে নিয়ে এ বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। তখন মার্গারেটের বয়স ১৫ আর কেটির বয়স ১১।
বাড়িটি কেনার সময়ই এলাকার আশেপাশের অনেক লোকই জনকে বাড়িটি কিনতে নিষেধ করেন। কেননা প্রায় রাতেই নাকি বাড়িটি থেকে অদ্ভুত নানা আওয়াজ শোনা যায়। জন ব্যাপারটিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তিনি ‘ভুতের বাড়ি’ ব্যাপারটা গুজব বলে উড়িয়ে দেন। সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে সন্ধান করতে লাগলেন ভুতের কোন ‘গন্ধ’ বা ‘অস্তিত্ব’ অনুভব করা যায় কিনা। কিন্তু বাড়িতে তিনি তেমন কিছু পাননি। বাড়িতে ঢোকার পর বেশ কিছুদিন ভালই কাটছিল ফক্স পরিবারের।
কিন্তু ঠিক তিন মাস পরেই ওই বাড়িতে ঘটতে লাগল ভৌতিক সব ঘটনা। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের এক রাতে ঘটেছিল অদ্ভুত এক ঘটনা। রাতে শোনা যেতে লাগল নানারকম শব্দ। সিঁড়িতে, বেসমেন্টে কারো পায়ের শব্দ। দেয়ালে, ছাদে কেউ যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে এধরনের শব্দ হতে লাগল। এমনি অদ্ভুত সেই আওয়াজ যে, কেটি ভয়ে পাশের ঘরে না শুয়ে রাতে বাবা-মায়ের সাথে ঘুমাতে আরম্ভ করল।
প্রতিদিন রাত হলেই দরজায়, জানালায় আর টেবিলে ঠকঠক আওয়াজ। মিসেস ফক্স বাচ্চাদেরকে সাহস দেয়ার জন্য নানাভাবে চিৎকার চেঁচামেচি করে সে আওয়াজ দূর করতে চাইতেন। কিন্তু হল তা হিতে বিপরীত। ভুতুড়ে শব্দের তীব্রতা ব্যপকভাবে বৃদ্ধি পেতে লাগল। সাথে যুক্ত হতে লাগল নতুন উপদ্রব। বাড়ির ফার্নিচারগুলো স্থানান্তরিত হওয়া, হঠাৎ কারো শীতল স্পর্শ অনুভুত হওয়া বা সিড়িতে বা হলরুমে কারো পায়ের ছাপ পুরো ব্যাপারটিকে আরো ভয়ঙ্কর করে তুলল। শেষে মিসেস ফক্স স্বীকারই করে নেন, বাড়িটি পোড়ো। এখানে অসুখী কোন আত্মা উপস্থিত। ঐ আত্মাকে শান্ত করতে না পারলে এ বাড়িতে থাকা অসম্ভব।
তারপর এক নিশুতি রাতে যখন এই আওয়াজ তীব্র হতে শুরু করে তখন মিসেস ফক্স তার সন্তানদের নিয়ে মোমবাতির আলোয় সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খোঁজ করতে শুরু করেন, কারো দেখা পান কিনা? কিন্তু তাদের এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। উল্টো তাদের এই খোঁজাখুঁজি অশরীরী মনে হয় বিরক্তিই বোধ করে, ফলে অদ্ভুত সেই আওয়াজের তীব্রতা দিন কে দিন বাড়তেই লাগে।
এই রকম পরিস্থিতি বেশ কিছুদিন চলার পরেই ৩১ মার্চের রাতে সেসব ভৌতিক আওয়াজের উত্তর দেয়া শুরু করল কেটি ফক্স। ওই দিন রাতে সেই ভীতিকর শব্দ শুরু হতেই অন্ধকার ঘরে কেটি সেই অশরীরীকে ‘স্প্লিটফুট’ হিসেবে সম্বোধন করে তার উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “মি. স্প্লিটফুট, আপনি যদি আমার কথা শুনতে পান তবে আমি যা করবো আপনিও তাই করবেন”। বলে কেটি শূন্যে হাততালি দিল বেশ কয়েকবার। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল ঠিক ওইরকম হাততালির আওয়াজ। যেন প্রতিধ্বনি হতে লাগল। বোনের সাহস দেখে এবার এগিয়ে এল ম্যাগী। বলল, “না, ওরকম নয়। আমি যেরকম করব, আপনি ঠিক সেরকমই করবেন, মি. স্প্লিটফুট। গোনো এক, দুই তিন, চার।” ম্যাগী ঠিক চারবার হাততালি দিল। উত্তরও পাওয়া গেল সাথে সাথে। অদৃশ্য মি. স্প্লিটফুট বারবার আওয়াজ করে এর প্রত্যুত্তর দিলেন।
মিসেস ফক্স এবার ওই অদৃশ্য শক্তিকে লক্ষ করে জানতে চাইলেন তার দুই মেয়ের বয়স। এই প্রশ্নের তৎক্ষণাৎ আওয়াজ করে মি. স্পিল্টফুট জানালেন ম্যাগী আর কেটির সঠিক বয়স। যার যত বয়স ঠিক তত আওয়াজ করলেন তিনি। এরপর কিছুক্ষণ চুপচাপ, আর তারপরই হলো এমন এক অদ্ভুত ব্যপার যা মিসেস ফক্স আশা করেননি। অদৃশ্য শক্তি আবার শুরু করলেন আওয়াজ। পরপর তিনবার। এই আওয়াজে মিসেস ফক্সের মনে পড়ে গেলো তার ছোট মেয়ের কথা, যে মাত্র তিন বছর বয়সে মারা গিয়েছিল। মি. স্পিল্টফুট জানিয়ে দিলেন সেই ছোট বাচ্চাটিরও বয়স।
এবার মিসেস ফক্স যেন আরো সাহসী হয়ে ওঠলেন। জানতে চাইলেন, “আমার প্রশ্নের যিনি সঠিক উত্তর দিচ্ছেন, তিনি কি কোন মানুষ?” এবার আর কোন উত্তর পাওয়া গেল না।
মিসেস ফক্স আবার প্রশ্ন ছুড়লেন,“আপনি যদি কোন প্রেতাত্মা হন তাহলে দুবার আওয়াজ করুন।” বলামাত্র পরপর ঠিক দুটো আওয়াজ হল।
তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, “কারো আঘাতে কি আপনার মৃত্যু হয়েছে?” এবারও উত্তর এলো হ্যাঁ সূচক।
“যিনি আপনাকে হত্যা করেছেন সে কি এখনও জীবিত?” এবারও অশরীরী আত্মা জানান দিল যে, হত্যাকারী বেঁচে আছে। এইভাবেই চলতে লাগলো প্রেতাত্মার সাথে মানুষের কথোপকোথন।
এই ঘটনার পরে ফক্স ফ্যামিলি আশে পাশের বাসিন্দাদের থেকে জানতে চান এ বাড়ি সম্পর্কে। তারা জানতে পারেন যে, তারা ওই বাড়িতে আসার বছর পাঁচেক আগে ওখানে খুন হয়েছিলেন এক হকার। ঘটনাটি ঘটেছিল কোন এক মঙ্গলবার রাতে। সেই হকারের লাশ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে হকারের সেই আত্মাকে তার হত্যার কারণ জানতে চাইলে, তিনি জানান তার ৫০০ ডলার ধার ছিল এক জনের কাছে। সেই অর্থ তিনি দিতে পারেন নি বলে ঐ ব্যক্তি তাকে খুন করে। এসব ঘটনার ঠিক ৫০ বছর পর ওই বাড়ির মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছিল একজন মানুষের কঙ্কাল।
মিসেস ফক্স আর তার সন্তানদের ভুতের সাথে এই কথোপকোথন সেসময় শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয় সারা পৃথিবীতে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল। কারণ মৃত আত্মার সাথে মানুষের এই সংযোগ এবং মৃত কোন ব্যক্তির আত্মা জীবিত কারো মধ্য দিয়ে সংযোগ স্থাপন করার এই জ্ঞান সেই প্রথম সকলের সামনে উন্মুক্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ বিদেশে।
মিসেস ফক্স ও তার সন্তানদের এই প্রেতচর্চা পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও এ কথা নি:সন্দেহে বলা যেতেই পারে আধুনিক প্রেতচর্চা বা ভুতের সাথে মানুষের যোগাযোগের আঁতুড়ঘর নিউইয়র্কের হাইডসভিলের এই বাড়ি।
ইতিহাসের বিখ্যাত পাঁচটি তরবারি
মানুষের ইতিহাসে তরবারির ব্যবহার শুরু হয় ব্রোঞ্জ যুগে। সর্বপ্রাচীন তরবারির যে নমুনাটি পাওয়া যায় সেটি খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ সালে তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। একসময়কার খাবার সংগ্রহ ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনীতা থেকে মানুষ অস্ত্র নির্মাণ করলেও সময়ের সাথে সাথে অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে দাঁড়ায় মানুষের কী ভালো কী মন্দ, কী ন্যয় কী অন্যায়- যাবতীয় চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবহৃত অন্যতম উপায়। আগ্নেয়াস্ত্র আবিস্কারের আগ পর্যন্ত তরবারিই ছিল মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত হাতিয়ার। এই লেখায় তুলে ধরা হল পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যবহৃত পাঁচটি তরবারির কথা যেগুলো বিখ্যাত হয়েছিল এদের তরবারিসুলভ গুণ ও একই সাথে এদের ব্যবহারকারীর খ্যাতির কারণে।
জুলফিকার
জুলফিকার ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এর ব্যবহৃত তরবারি। উহুদ এর যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ (সা) তার চাচাতো ভাই আলী-কে এই তরবারি দিয়েছিলেন।
ইসলামিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, উহুদের যুদ্ধে মক্কার সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধার ঢাল ও শিরস্ত্রাণ এক আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করেন আলী (রা)। এই আঘাতে তার তরবারিটিও ভেঙে যায়। এই ঘটনার পর হযরত মুহাম্মাদ (সা) তার নিজ তরবারি জুলফিকার আলীকে দেন। শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী, মুসলমানদের বারোতম ইমাম মুহাম্মাদ আল মাহদী’র নিকট সংরক্ষিত ইসলামের ঐতিহাসিক জ্ঞান ও হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর যুদ্ধাস্ত্রের এক গোপন সংগ্রহ যা ‘আল জাফর’ নামে পরিচিত সেখানে এই তরবারিটি রাখা আছে।
মূল জুলফিকার তরবারিটির প্রকৃত অবয়ব জানা যায় না। তবে ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনায় এটিকে চিত্রায়িত করা হয়েছে দুইটি দীর্ঘ ব্লেড জোড়া লাগানো অবস্থায়, যার অগ্রভাগ অনেকটা কাঁচির মত দ্বিখণ্ডিত। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় একে দুটো দীর্ঘ ব্লেড V আকৃতিতে জোড়া লাগানো অবস্থায় চিত্রায়িত করা হয়।
মধ্য প্রাচ্যীয় যুদ্ধাস্ত্রের বর্ণনায় জুলফিকার-এর এর কথা অবধারিতভাবেই আসে। এর আকৃতির অনুকরণে এক সময় প্রাচ্যের অঞ্চলগুলোতে তরবারি তৈরির সময় অগ্রভাগ দ্বিখণ্ডিত রাখা হত।
অটোমান সাম্রাজ্যের পতাকায় জুলফিকার এর বহুল চিত্রায়ন দেখা যায়। বিশেষত ষোল ও সতের শতকের অশ্বারোহী বাহিনী ‘জেনিসারি’র পতাকায় এর ছবি অঙ্কিত হত। এমনকি জুলফিকার এর নাম সম্বলিত কবচের ব্যবহারও ছিল যা এখনও বিদ্যমান। কবচে খোদাই করা লেখাগুলোর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত দুটো লাইন ছিল- “আলী অদ্বিতীয়, জুলফিকার তরবারি অদ্বিতীয়।”
ইতিহাসের বিভিন্ন সময় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ দল, যুদ্ধে ব্যবহৃত জাহাজ এমনকি একটি ট্যাঙ্ক এর নামও জুলফিকারের নাম অনুসারে রাখা হয়েছে। বসনিয়ার যুদ্ধের সময় বসনিয়ান সৈন্যদের একটি বিশেষ ইউনিটের নাম ছিল জুলফিকার।
ওয়ালেস সোর্ড
ওয়ালেস সোর্ড ছিল স্কটিশ স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা উইলিয়াম ওয়ালেস এর তরবারি। স্কটিশদের স্বাধীনতার দাবিতে ১২৯৭ সালের স্টার্লিং এর যুদ্ধ ও ১২৯৮ সালের ফলক্রিক এর যুদ্ধে ওয়ালেস এই তরবারিটি ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়।
ওয়ালেস তরবারিটি সবচেয়ে বিখ্যাত এর বিশাল আকার ও ওজনের জন্য। ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি দীর্ঘ ব্লেড সহ পুরো তরবারির দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি! এর ব্লেডের প্রস্থ ২.২৫ ইঞ্চি আর অগ্রভাগে ০.৭৫ ইঞ্চি। বিশালাকার এই তরবারির ওজন প্রায় ৩ কেজি!
স্কটল্যান্ডের স্টার্লিং এর ওয়ালেস মনুমেন্ট এ সংরক্ষিত এই তরবারিটির আকার ও এর গঠনপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে এটি সত্যিকারের উলিয়াম ওয়ালেস এর ব্যবহৃত তরবারি কিনা তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেন, সংরক্ষিত তরবারিটি তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি তরবারির ভিন্ন ভিন্ন অংশ একসাথে করে। সংরক্ষিত তরবারিটি দুই হাতে ধরে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে তৈরি করা। আর গবেষকদের মতে, এটি ব্যবহারের জন্য উইলিয়াম ওয়ালেস এর উচ্চতা হতে হত অন্তত ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি! অথচ ১৩ শতকের স্কটল্যান্ডের মানুষের গড় উচ্চতা ছিল ৫ ফুট। তাই কথা উঠে, হয় ওয়ালেস সে সময়ের তুলনায় একজন দানবাকৃতির মানুষ ছিলেন নতুবা সংরক্ষিত এই তরবারিটি তার ব্যবহৃত নয়।
জানা যায়, ফলক্রিক এর যুদ্ধে আটককৃত ওয়ালেসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর ১৩০৫ সালে ডুম্বার্টন ক্যাসল এর গভর্নরের নিকট এই তরবারিটি ছিল। যদিও এর কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় নি। দু’শো বছর পর ১৫০৫ সালে জানা যায়, স্কটল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জেমস এর নির্দেশে তরবারিটির খাপ, হাতল ও বেল্ট পরিবর্তন করা হয়, কেননা তখন জনশ্রুতি ছিল ওয়ালেস এর তরবারিতে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল স্টার্লিং এর যুদ্ধের ইংরেজ কমান্ডার হিউ ক্রেসিংহাম এর চামড়া থেকে। ১৮৮৮ সালে ওয়ালেস মনুমেন্টে সংরক্ষণের জন্য তরবারিটি দেয়া হয়।
হনজো মাসামুনে
হনজো মাসামুনে সর্বকালের সেরা তরবারিগুলোর একটি হিসেবে খ্যাত যার নির্মাতা ছিলেন মাসামুনে। মাসামুনে ছিলেন একজন জাপানি তরবারি নির্মাতা যাকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধাতুবিদ্যাবিশারদ বলা হয়। আনুমানিক ১২৮৮ সাল থেকে ১৩২৮ সাল পর্যন্ত তার কাজের পরিধি সম্পর্কে জানা যায়। সুক্ষতম ধার ও সৌন্দর্যের কারণে মাসামুনের নির্মিত তরবারিগুলোর মান কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিল।
ধারণা করা হয় হনজো মাসামুনে নামটি এসেছে হনজো শিগেনাগা নামক এক জাপানি যোদ্ধার নাম থেকে। হনজো শিগেনাগা ছিলেন ১৬ শতকের উয়েসুগি ক্ল্যান এর একজন জেনারেল। উমানোসুকে নামক একজন বিখ্যাত যোদ্ধার আক্রমণে শিগেনাগার শিরস্ত্রাণ টুকরো হয়ে যায়। কিন্তু তিনি বেঁচে যান সেই লড়াইয়ে এবং পুরস্কার হিসেবে তাকে যে তরবারি দিয়ে আঘাত করা হয় সেটি রেখে দেন। তরবারিটি এর আগে অনেক বিখ্যাত যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে অর্থাভাবের কারণে তয়োতমি ক্ল্যান এর নিকট তরবারিটি বিক্রি করে দেন শিগেনাগা।
তয়োতমি ক্ল্যান এর পতনের পর তরবারিটি জাপানের তকুগাওয়া পরিবারের নিকট আসে। জাপানের ‘শগুন’ শাসনামলের অন্যতম শাসক ছিল তকুগাওয়া পরিবার। এই তরবারিটি পরিবারের এক শাসকের পর আরেকজনের নিকট শাসনের প্রতীক হিসেবে দেয়া হত। তকুগাওয়া পরিবারের শাসনামল শেষ হবার পরেও তারা তরবারিটি রেখে দেয়। ১৯৩৯ সালে হনজো মাসামুনেকে জাপানের জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে এর সর্বশেষ মালিকানা ছিল তকুগাওয়া লেমাসা’র নিকট। যুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পনের পর ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে হনজো মাসামুনে সহ আরও ১৪টি তরবারি জাপানের মেজিরো পুলিশ স্টেশনে জমা দেন তকুগাওয়া লেমাসা। ১৯৪৬ সালে পুলিশ এই তরবারিগুলো সার্জেন্ট কোল্ডি বাইমোর নামক একজনের কাছে দেয় বলে জানা যায়। সেই থেকে এই তরবারিটির আর কোনো হদিশ পাওয়া যায় নি। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে সার্জেন্ট কোল্ডি বাইমোর নামক কোনো ব্যক্তি তরবারিগুলো গ্রহণ করেছেন এমন তথ্যের কোনো রেকর্ড জাপানের কোথাও নেই। জাপানের এমন হারিয়ে যাওয়া অনেকগুলো বিখ্যাত তরবারির মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল হনজো মাসামুনে।
জোয়ায়ুস
শার্লেম্যান, যিনি চার্লস দ্য গ্রেট নামেও পরিচিত, তার ব্যবহৃত তরবারির নাম জোয়ায়ুস। শার্লেম্যান মধ্যযুগের শুরুতে ইউরোপের একটি বড় অংশের নেতৃত্ব দেন যার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে আজকের ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো। ৭৭৪ সালে তিনি ছিলেন ইতালির রাজা। ৮০০ সালে তিনি রোমান সম্রাট হয়েছিলেন। এর তিন শতক আগে পশ্চিম ইউরোপ সাম্রাজ্যের পতনের পর তিনিই ছিলেন প্রথম স্বীকৃত সম্রাট।
কথিত আছে, ক্রুশবিদ্ধ যিশু মৃত কিনা তা যাচাইয়ের জন্য যে বর্শা ব্যবহৃত হয়েছিল সে ‘পবিত্র বর্শা’ থেকে নেয়া উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে জোয়ায়ুস এর হাতলে। ১৮৬৭ সালে বিখ্যাত ‘বুলফিঞ্চ’স মিথোলজি’ বইয়ে দেখানো হয় শার্লেম্যান জোয়ায়ুস দিয়ে কোর্সাবল নামক একজন আরব সেনানায়কের শিরশ্ছেদ করছেন এবং আরেক বিখ্যাত যোদ্ধা ওজিয়েরের কাঁধে এটি ছুঁয়ে নাইট উপাধি প্রদান করছেন।
১২৭০ থেকে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের সম্রাটদের অভিষেক অনুষ্ঠানে জোয়ায়ুস তরবারিটি প্রদর্শিত হত। ১৭৯৩ সালে এটিকে ল্যুভর মিউজিয়ামে নিয়ে আসা হয়।
প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে এসব অভিষেক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য জোয়ায়ুসের গঠনে পরিবর্তন এসেছে অনেকবার। কোনো গবেষক বলছেন এর ব্লেডটিই কেবল মূল জোয়ায়ুসের ব্লেড, কেউ বলেন ১০ শতকে এর ব্লেড পরিবর্তন করা হয়েছে, কেউ বলেন ১৩ শতকে। আবার কারো মতে, ১০ শতকে পরিবর্তিত ব্লেডটিও ১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অভিষেক অনুষ্ঠানের সময় পাল্টে ফেলা হয়েছিল। ল্যুভরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বর্তমানে প্রদর্শিত জোয়ায়ুস এর হাতলের মাথাটি তৈরি হয়েছে ১০-১১ শতকে, হাতল ও ব্লেডের সংযোগস্থল ক্রসগার্ডটি তৈরি হয়েছে ১২ শতকে এবং তরবারির খাপ তৈরি হয়েছে ১৩ শতকে।
নেপোলিয়নের তরবারি
মানব ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এবং একই সাথে বিতর্কিত যোদ্ধা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অমর তার অসামান্য যুদ্ধ পরিকল্পনার জন্য। ফরাসী বিপ্লবের ধারক এবং ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়নের জীবনাবসান ঘটে আটলান্টিক মহাসাগরের সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হয়ে।
নেপোলিয়নের ব্যবহৃত তরবারিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত তার স্বর্ণখচিত তরবারি যেটি ২০০৭ সালে ফ্রান্সের একটি নিলামে সাড়ে ৬ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ১৮০০ সালে নেপোলিয়ন ইতালির আলেসান্দ্রিয়াতে মারেঙ্গোর যুদ্ধে এই তরবারিটি শেষবারের মত ব্যবহার করেছিলেন অস্ট্রিয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। অস্ট্রিয় বাহিনীর অপ্রস্তুত অবস্থায় হঠাৎ আক্রমণ করে এই যুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলেন নেপোলিয়ন।
তরবারির প্রায় ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি দীর্ঘ ও সামান্য বাঁকানো ব্লেডটিতে স্বর্ণের কারুকাজ করা আছে। ধারণা করা হয়, এটিই নেপোলিয়নের সর্বশেষ তরবারি যেটি সাধারণ মানুষের মালিকানায় আছে।
তরবারিটির ডিজাইনের পেছনে আছে নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের সময়কার অভিজ্ঞতা। তিনি দেখেন সেখানকার ব্যবহৃত তরবারিগুলো সামান্য বাঁকানো থাকায় এগুলো ব্যবহারে সুবিধাজনক। এরপর তিনি নিজের জন্য এই ডিজাইনের তরবারি তৈরি করেন।
মারেঙ্গোর যুদ্ধের পর তার ছোট ভাই জেরোমি বোনাপার্টের বিয়েতে তরবারিটি উপহার দেন নেপোলিয়ন। এরপর থেকে বংশপরম্পরায় তরবারিটি তাদের কাছে ছিল।
১৯৭৮ সালে তরবারিটিকে ফ্রান্সের জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা হয়। নিয়ম করা হয় ফরাসী নাগরিক নন এমন কেউ এটি কিনলে তার অবশ্যই ফ্রান্সে একটি ঠিকানা থাকতে হবে যেখানে তরবারিটি বছরের অন্তত ৬ মাস রাখতে হবে।
এতক্ষণ পৃথিবীর বিখ্যাত পাঁচটি তরবারি সম্পর্কে জানলেন। এই তরবারিগুলোর কোনোটি ব্যবহৃত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে, কোনোটি মতাদর্শ প্রচারে, কোনোটি সাম্রাজ্য বিস্তারে। তবে তরবারির মূল কাজ কিন্তু একটাই, মানুষের উপর ব্যবহৃত হওয়া। ‘ফাদার অব ইউরোপ’ খ্যাত শার্লেম্যান এর তরবারি জোয়ায়ুস এর শাব্দিক অর্থ হল উৎফুল্ল! ভাবা যায়, একটা তরবারির নাম উৎফুল্ল! আজকের যুগে তরবারি কেবল সৈন্যদের সাইডআর্ম কিংবা ক্রীড়া সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হলেও একটা সময় এটাই ছিল মানুষের বিধ্বংসী কাজের প্রতীক, কারও কারও কাছে যা ছিল কেবলই উৎফুল্ল হবার নিয়ামক।
টাই বা গলাবন্ধনীর উৎপত্তি – নেপথ্যের ইতিহাস
গলাবন্ধনী বা টাই আজকাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস। ফরমাল পোশাক আর ফ্যাশনের নামে গলাবন্ধনী ব্যবহার না করলে যেন হবেই না ব্যাপারটা এমন। শব্দটাও খুবই গুরুগম্ভীর। ছোটবেলায় একবার বাবা বলেছিলেন, একজন গ্র্যাজুয়েটের নিদর্শন হল এই গলাবন্ধনী। কারো গলায় যদি দেখতে পাও গলাবন্ধনী আটা রয়েছে, ধরে নিতে হবে সে একজন গ্র্যাজুয়েট, স্নাতক সম্পন্ন করেছে। তুমিও যেদিন স্নাতক সম্পন্ন করবে, সেদিন থেকে গলাবন্ধনী পড়া শুরু করতে পারবে।
সেই চিন্তা মাথায় নিয়েই বড় হয়েছি, স্নাতক এখনো শেষ হয়নি, মেডিক্যালের ছাত্র হিসেবে আরো পাঁচ বছর অপেক্ষা করা চাই আমার। (যদিও মাঝে মাঝে পড়ে ফেলি) গুরুগম্ভীর এক শব্দ বারবার উচ্চারণ করছি, ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু ও উচ্চারণকটু। এবার থেকে “টাই” উল্লেখ করব বাকি লেখায়।
যা বলছিলাম, ফ্যাশনের নামে টাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারো কি কখনো মনে হয়েছে, কীভাবে আমরা এই টাই এর সাথে পরিচিত হলাম। একটুকরো একটা কাপড়, গলায় বেঁধে গলা আটকে দিলেই হয়ে গেল, অনেক উপকারীও বটে, সবথেকে বড় কথা হল, দেখতেও খারাপ লাগছে না, স্ট্যান্ডার্ড মনে হচ্ছে। দেখতে খুবই স্ট্যান্ডার্ড মনে হওয়াটাই ছিল টাই এর উৎপত্তিস্থল। এভাবেই আসলে কালের পরিক্রমায় টাই চলে আসে আমাদের সামনে।
সপ্তদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের মাটিতে ৩০ বছর ধরে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (১৬১৮-১৬৪৮) চলছিল, তখন হঠাৎ করেই শোভা পেতে দেখা যায় সৈনিকদের গলায় এক টুকরো কাপড়। টাইগুলোর উৎপত্তি সম্পর্কে গবেষকদের তাই ধারণা। তখনকার সময়ে একদেশ অন্যদেশ থেকে সৈনিক ভাড়া করে নিতো, তাদের হয়ে যুদ্ধ লড়ে দেয়ার জন্য। রাজা ত্রয়োদশ লুই ও তার পক্ষের সৈনিক সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, ক্রোয়েশিয়ান কিছু সৈনিক ভাড়া করে নিয়ে আসে। ক্রোয়েশিয়ান সেই যোদ্ধাদের সকলের গলায় এক টুকরো করে কাপড় শোভা পেতে দেখা যায়। তাদের সৈনিক সাজ পোশাকে জ্যাকেট পরতে হতো, সেই জ্যাকেটকে গলা পর্যন্ত আটকিয়ে রাখতেই তারা কাপড়ের টুকরো গলায় বেঁধে রাখতো, দেখতেও ভাল লাগতো।
রাজা ত্রয়োদশ লুই সৈনিকদের গলায় এমন টুকরো কাপড় দেখে মোহিত হয়ে যান। তার কাছে এতটাই ভাল লেগে যায় যে, রাজকীয় সভাগুলোয় সকল সভাসদদের জন্য গলায় টুকরো কাপড় বেঁধে আসার আইন জারি করেন। আর যেহেতু, ক্রোয়েশিয়ানদের থেকে এমনটা শুরু হয়েছে, তাদের সম্মানে এর নাম দেন “La Cravate”।
গলাবন্ধনীর আরো পুরনো এক গল্প পাওয়া যায় চৈনিক সভ্যতায়। ২১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে চীনের সম্রাট ছিলেন শিহ্ হুয়াং তি। সম্রাট শিহ্ হুয়াং তি এর সময়কালীন যে সকল সৈনিকের টেরাকোটা শিল্প বর্তমানে পাওয়া গেছে, তা থেকে জানা যায় যে, প্রত্যেক সৈনিকের গলায় সিল্কের তৈরি এক টুকরো কাপড় পেঁচানো থাকতো।
খ্রিষ্টপূর্ব ১১৩ এ রোমান সাম্রাজ্যেও পাওয়া যায় এক নিদর্শন। রোমান সাম্রাজ্যে, চাকর আলাদা করে চিহ্নিত করে রাখার কাজে তাদের গলায় একটুকরো কাপড় পেঁচিয়ে বেঁধে রাখা হতো, মালিকেরা নিজের নিজের চাকরকে আলাদা করতে পারতেন তখন এই পেঁচানো কাপড় দেখে। কোন রোমান সৈন্যকে যদি টাইম ট্র্যাভেল করে বর্তমানে নিয়ে এসে, বলা হয় টাই পড়তে, তাহলে সে নিশ্চয় যারপরনাই অপমানিত বোধ করবে। কারণ তৎকালীন সময়ে সেটাই ছিল রীতি। তবে এখনও এ ধরণের টাই রয়েছে কিন্তু, একে বলা হয় Bolo Tie, মাঝে মাঝে জনি ডেপকে এমন টাই পড়তে দেখা যায়। টেক্সাসের আরিজোনায় এ টাই অফিসিয়াল পোশাকের সাথে পড়ার নিয়ম রয়েছে।
যতগল্পই থাকুক না কেন, টাই এর ফ্যাশন আমাদের সাথে পরিচিত করিয়ে দিয়েছিল ক্রোয়েশিয়ান সৈনিকেরাই, তারাই এই টাই পরিধানকে ফ্যাশনে পরিণত করেছিল তাদের ইউনিফর্মের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে।
গত দু’শ বছরে টাই পরিধানে পরিবর্তন এসেছে অনেকবার। ক্রোয়েশিয়ান সৈনিকেরা যে টাই পরিধান করতো, তার সামান্যই বর্তমানে রয়েছে, টাই পরিধানের আইডিয়া টা ছাড়া পুরো ফ্যাশনেই চলে এসেছে আমূল পরিবর্তন। সবথেকে বড় পরিবর্তনটি এসেছে ১৯২০ এর দশকে। টাই ই মনে হয় একমাত্র ফ্যাশনের বস্তু, যেটা গত দু’শ বছর ধরে টিকে রয়েছে। অন্য যতসব ফ্যাশন পোষাকজগতে এসেছে, সবই প্রতি দশকে পরিবর্তিত হয়ে পুরনো হয়ে গেছে। বর্তমানে আমরা যে টাই ব্যবহার করি, সেটি মূলত গত শতাব্দীতেই উৎপত্তি ঘটে।
গত শতাব্দীতে এই টাই পুরুষদের সাজপোষাকের প্রধান বস্তুতে পরিণত হয়। ১৯২০ সালের দিকে এই টাইয়ের বিবর্তনে চলে আসে আমূল পরিবর্তন, তাও আবার ভুলক্রমে। ইতিহাসে অনেকগুলো মজার ভুল রয়েছে, যেগুলো আমাদের জন্য বিপদের পরিবর্তে নিয়ে এসেছে বিপ্লব। নিউইয়র্কে একজন টাই মেকার ছিলেন, নাম হল জেসি ল্যাংসডর্ফ। তিনি একদিন একটা টাই তৈরির কাজ করছিলেন। ভুল করে টাই এর কাপড়টি মাঝখান দিয়ে তিনি কেঁটে ফেলেন। তিনি দেখেন যে, প্রতিবার এইভাবে যদি কেঁটে রেখে দেন, তাহলে টাই পড়ে আবার সেটা খুলে ফেলা যায়। আগেকালের টাইগুলো ছিল ফিক্সড, একবার বানিয়ে ফেললে শুধু ঐ একই স্টাইলে বারবার পড়তে হতো, আবার খুলে রেখে দিতে হতো। কিন্তু বর্তমানে আমরা যে টাই ব্যবহার করি সেটাই তৈরি হয় জেসি ল্যাংসডর্ফ এর হাত ধরে। পরা শেষে, গিঁট খুলে ফেলা যায়, পছন্দানুযায়ী গিঁট পরিবর্তন করা যায়। গিঁট যখন নিজের ইচ্ছামতো দেয়া যাচ্ছে, তখুনি মানুষের কাছে চলে এলো অবাধ স্বাধীনতা। ফলে আস্তে আস্তে নতুন নতুন অনেক গিঁট তৈরি হতে শুরু করলো।
গত শতাব্দীর পুরো সময় জুড়েই টাই এর বিবর্তন হয়েছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টুকু ছাড়া। যুদ্ধের দশকে মানুষ জীবন নিয়ে শঙ্কিত ছিল, তাই টাই এর উল্লেখযোগ্য কোনরকম পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে অনেক ধরণের টাই পাওয়া যায়। দৈর্ঘ্যভেদে, কাপড়ের নমনীয়তা, আকার-আকৃতি ইত্যাদি ভেদে। পুরুষদের নিজস্ব স্টাইলকে প্রকাশ করার জন্যই এত ব্যতিক্রমী টাই পাওয়া যায় আজকাল। তবে স্ট্যান্ডার্ড টাই এর প্রস্থ হবে ৩.২৫-৩.৫ ইঞ্চি। তবে গত কয়েকবছরে আমাদের চোখের সামনেই টাইয়ের ফ্যাশনে একটা পরিবর্তন এসেছে, হয়তো সবার কাছে আগের বড় প্রস্থের টাইগুলো বর্তমানে দৃষ্টিকটু লাগতে পারে। আজকাল সবাই অল্প প্রস্থের (২.৭৫-৩ ইঞ্চি) টাই ই পরিধান করে থাকে।
টাই পরিধানের পেছনে হাজার বছরের পুরনো আরো একটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। গলায় এক টুকরো কাপড় বেঁধে দেয়াকেই যদি, টাই বলে মানা হয়, তাহলে সেই গল্পটিও সমর্থযোগ্য। ঠান্ডা-সর্দিতে বাঁচতে, গলায় এক টুকরো কাপড় পেঁচিয়ে রাখাটা হাজারো বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে। কিন্তু ফ্যাশন হিসেবে আসে সেই ৩০বছরের ফরাসী যুদ্ধ থেকেই।
Ascot Tie বর্তমানের আধুনিক টাই থেকে খানিকটা ব্যতিক্রম। দেখতে খুবই সুন্দর লাগে, পড়তেও বেশ আরামদায়ক, আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। এই টাইগুলো উনিশ শতকেই প্রচলন হয়, ইংল্যান্ডে। তৎকালীন সময়ে বিখ্যাত ঘোড়দৌড় হতো, নাম ছিল “The Royal Asoct”; সেখান থেকেই এই টাইয়ের নামের উৎপত্তি। Tailcoat Jacket এর সাথে বেশি মানায় এই Ascot Tie গুলো। আজকাল অতবেশি একটা দেখা না গেলেও, বিয়ের রিসেপশনগুলোতে হরহামেশাই দেখা যায়।
টাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ এক সাজপোশাক আমাদের জন্য। কোন ফর্মাল পোশাকে, পুরুষ হিসেবে আমরা হয়তো রঙিন কিছু পরিধান করিনা, সেটা শোভা দেয় না আমাদের। সবসময় কালো কিংবা প্রুশিয়ান ব্লু ব্যবহার করে থাকি, সাদা শার্টের সাথে কাল স্যুট, আমাদের সার্বজননীন সাজ। কাল জুতো, কাল প্যান্ট। এতকিছু সঙ্গে রঙ বয়ে নিয়ে আসার একমাত্র উপায় হল এই আমাদের টাই। আমাদের একমাত্র সুযোগ। তবে কেউ কেউ মনে করেন, টাই আমাদের শার্টের বোতামকে ঢেকে রাখছে। তবে টাই প্রধানত আমাদের গলায় শার্টকে এঁটে রাখে, গলাকে উষ্ণ রাখে।
প্রতি বছরের ১৮ই অক্টোবর ক্রোয়েশিয়ায়, টোকিও, সিডনী, ডাবলিনের মত বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য শহরে আন্তর্জাতিক টাই উৎসব পালিত হয়।
ইতিহাসে আলোচিত কুখ্যাত হত্যাকান্ডগুলো
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে, সম্পদ-সাম্রাজ্যের লোভে, প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে কিংবা মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে হত্যাকান্ডগুলো আদিকাল থেকে চলে আসছে। হঠাৎ অতর্কিত হামলায়, নয়তো দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে। গুপ্তঘাতক দ্বারা নয়তো কাছের মানুষ হয়ে এই হত্যাকান্ড গুলো সংগঠিত করা হয়েছিলো। হত্যাকান্ডগুলো থেকে বাদ যান নি পৃথিবীর সবচাইতে ক্ষমতাধর মানুষ থেকে শুরু করে জনপ্রিয় রথী মহারথীরাও। ইতিহাসে সাড়া জাগানো এমন কয়েকটি কুখ্যাত হত্যাকান্ডগুলো নিয়েই আজ লেখা।
রোমান সেনাপতি জুলিয়াস সিজার হত্যাকান্ড
রোমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী খিষ্টপূর্ব ৪৪ অব্দের ১৫ মার্চ ছিল এই রোমান সেনাপতির শেষ দিন। ছুরির পঁয়ত্রিশটি আঘাতে তাকে হত্যা করা হয়। এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন ৬০ জন রোমান সিনেটর, যারা ছিলেন সিনেটের একাংশ। নিজেদের লিবারেটর হিসেবে পরিচয় দেয়া এই হত্যাকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন সিজারের ঘনিষ্ট বন্ধু মার্কোস জুনিয়াস ব্রোটাস এবং গেইয়াস ক্যাসিয়াস লঙ্গিয়াস।
জুলিয়াস সিজার ছিলেন রোমান প্রজাতন্ত্রের এক নায়ক। তার পূর্ববর্তী সাফল্যের জন্য তাকে দশ বছরের জন্য ডিকটেটর হিসেবে মনোনীত করা হয়। এ একনায়কতন্ত্র চলাকালেই সিনেট তাকে ডিকটেটর অফ পারপিরিউটি বা অবিরাম স্বৈরশাসক হিসেবে ঘোষণা দেয়। আর এই ঘোষণাই সিনেটের কিছু সদস্যের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা মনে করেন যে, সিজারকে দেয়া এ ক্ষমতা সিনেটের জন্য সর্বনাশের কারণ হতে পারে।
এই প্রেক্ষিতেই ব্রোটাস তার বন্ধু এবং আত্মীয় লঙ্গিয়াসসহ আরো কয়েকজন সিজার বিরোধী সিনেটরদের নিয়ে হত্যার পরিকল্পনায় বসে। তারা নিজেদের বাসা-বাড়িতে গোপনে এই হত্যার জন্য বিভিন্ন ধরনের সহজ এবং কার্যকরী উপায়ের ব্যাপারে আলোচনা করে। কারো পরিকল্পনা ছিল নির্বাচনের সময় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য সিজার যখন ক্যাম্পাস মার্টিয়াসে ব্রিজ পার হয়ে যাবে তখন তাকে হত্যা করা হবে। কেউ আবার প্রস্তাব রেখেছিল গ্লাডিয়েটর শো এর দিন তাকে হত্যা করার কথা। কেননা সেদিন খোলাখুলিভাবে অস্ত্র রাখা যায়। তাই কেউ সন্দেহ করবে না। এছাড়াও আরো নানান উপায় নিয়ে তারা আলোচনা করে। কিন্তু বেশি সংখ্যক সিনেটরদের মত ছিল সিনেটেই তাকে হত্যা করা। কেননা সিনেটের অধিবেশন চলাকালীন সময়ে সিনেটররা ছাড়া অন্য কেউ সেখানে থাকেন না। তারা খুব সহজেই আলখেল্লার ভিতরে অস্ত্র রেখে ভেতরে ঢুকে যেতে পারবে।
হত্যাকান্ডের দিন সিজারের কিছু বন্ধু, ডাক্তার, এমনকি তার স্ত্রী ক্যালপুর্ণিয়া তাকে সিনেটে যেতে মানা করে। কিন্তু বন্ধু এবং ষড়যন্ত্রকারী ব্রোটাসের উস্কানিতে সেদিন সিজার সিনেটের অধিবেশনে যান। সিনেটে প্রবেশের পর সম্মানের সাথে সিনেটররা উঠে দাঁড়ান। হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রকারীরা ছিলেন সিজারের পাশেই। তার ডান পাশে ছিলেন টিলিয়াস কিম্বার। নির্বাসনে পাঠানো ভাইয়ের একটি পিটিশন নিয়ে কিম্বার সিজারের সাথে কথা বলেন। সে সময় ষড়যন্ত্রকারীরা কিম্বারে আশেপাশে আসেন তার সমর্থনে। তখনই কিম্বার সিজারের ঘার ধরে পরিধানরত আলখেল্লা খুলে ফেলে। সবাই নিজেদের ছুরি বের করে আক্রমনের জন্য প্রস্তুতি নেন। প্রথম আক্রমণ করেন সার্ভিলিয়াস কাসকা নামের একজন সিজারের বাম কাঁধে। কিন্তু তা লক্ষভ্রষ্ট হয়। এরপরই সবাই তার উপর হামলে পড়েন এবং পম্পেইয়ের থিয়েটার সংলগ্ন সিনেটেই গ্লাডিয়েটর শো মঞ্চস্থ হয়। প্রত্যেকেই সেদিন সিজারকে আঘাত করে খুনের অংশ নিয়েছিলেন।
আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম প্রেসিডেন্ট হত্যাকান্ড
১৪ এপ্রিল ১৮৬৫ সালের সন্ধ্যাটা আব্রাহাম লিংকনের জন্য কিছুটা অন্য রকমই ছিল। তাই তো স্ত্রী মেরি টডের সাথে কমেডি শো আওয়ার আমেরিকান কাজিন দেখতে এলেন ওয়াশিংটন ডিসি ফোর্ড থিয়েটারে। গৃহযুদ্ধ তখন শেষের দিকে। উত্তরের ইউনিয়ন তখন দক্ষিনের দাস প্রথা চালু রাখার ব্যাপারে সমর্থনকারী কনফেডারেটের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান প্রায় পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। আর সাম্প্রতি কনফেডারেট আর্মির বড় রেজিমেন্টগুলো আত্মসমর্পণ করেছে। টানা পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ছিল দাস প্রথা বাতিলের পরবর্তী আরেকটা জয়। নিজেদের দেশে আরেকটা শুভক্ষণ যখন এগিয়ে আসছে তখন তো শান্তিতে থাকারই কথা। কিন্তু অদৃষ্ট তার শান্তি মেনে নিতে পারে নি। আততায়ী জন উইকিস বুথের হাতে প্রাণ হারান আমেরিকার ১৬তম এবং সবচাইতে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট।
বুথ ছিলেন একজন অভিনেতা এবং দক্ষিণের কনফেডারেটর স্টেট অফ আমেরিকার একজন সহযোগী। দক্ষিণের সবার মত তিনিও কালোদের উপর সাদাদের প্রভুত্ব বহাল রাখার আন্দোলনের সাথে একমত ছিলেন। আব্রাহাম লিংকনের দাস প্রথা বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিল তার অবস্থান। গৃহযুদ্ধের শেষের দিকে কনফেডারেটের হাজার হাজার সৈন্য, নেতারা উত্তরের ইউনিয়নের কারাগারে। উইকিস বুথ প্রথমত লিংকনকে অপহরণ করে জিম্মি হিসেবে রিচমন্ডে রাখতে চেয়েছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিলো- যদি লিংকনকে জিম্মি হিসেবে ধরে রাখা যায়, তাহলে তার প্রাণের বিনিময়ে কনফেডারেটের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা কারাবন্দীদের ছাড়িয়ে আনা যাবে। কিন্তু তার এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
এরপর তিনি এবং তার সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন ছক আঁকেন। তার ধারণা ছিল যদি লিংকনসহ ভাইস প্রেসিডেন্ট এন্ড্রো জনসন, রাষ্ট্র সচিব উইলিয়াম সিউয়ার্ডকে হত্যা করা যায়, তাহলে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া গৃহযুদ্ধ আবার শুরু করা যাবে। কিন্তু পরিকল্পনা মতো তারা ভাইস প্রেসিডেন্ট উপর হামলা সম্পন্ন করতে পারেন নি। এমনকি সিউয়ার্ডের উপর আক্রমনও সফল হয় নি। যদিও আক্রমণে রাষ্ট্র সচিব এবং তার ছেলে আহত হয়েছিলেন।
ফোর্ড’স থিয়েটারে বুথের প্রবেশের কোনো বাধা ছিল না। কেননা ভালো অভিনেতা হিসেবে তার নাম ডাক ছিল। এমনকি এই থিয়েটারেই বুথ আগে অভিনয় করে গেছেন। স্বয়ং আব্রাহাম লিংকন ছিল তার অভিনয়ের ভক্ত। আর সে যে কনফেডারেটের গুপ্তচর তাও কেউ জানতো না। তাই থিয়েটারে প্রবেশ নিয়ে কোনো ঝামেলা পড়তে হয় নি বুথের। যখন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন মনোযোগ সহকারে নাটক দেখছিলেন, তখনই বুথ পিছন থেকে তার মাথার বাম পাশে গুলি করেন। খুব কাছে থেকে গুলি করায় তা চোখ দিয়ে বের হয়ে যায়। এর পরদিন অর্থাৎ পনেরো তারিখ সকাল ৭টা ২২ মিনিটে প্রেসিডেন্টের মৃত্যু হয়। এটাই ছিল আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম প্রেসিডেন্ট হত্যাকান্ড।
হত্যাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পান নি স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীও
পৃথিবীর সবচাইতে আলোচিত হত্যাকান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম হত্যাকান্ডটি হচ্ছে ভারতের জাতির জনক হিসেবে খ্যাত রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর হত্যাকান্ড, যাকে পুরো পৃথিবী মহাত্মা গান্ধী হিসেবেই জানে। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারিতে নয়া দিল্লীর বিরলা ভবনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সে সময় তিনি তার পরিবার এবং অনুসারীদের সাথে সন্ধ্যাকালীন পথসভা করছিলেন। সভা চলাকালীন সময়ে নাথুরাম গডসে নামের একজন হিন্দু মৌলবাদী বেরেটা এম১৯৩৪ দিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে। এর কয়েক ঘন্টা পরেই সত্যাগ্রহ আন্দোলনের এ প্রতিষ্ঠাতা মৃত্যু বরণ করেন।
এর আগেও ১৯৩৪ সাল গান্ধীকে অনেকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। শুধুমাত্র নাথুরাম গডসেই ১৯৪৬ সালের সেপ্টেমবরে প্রথমবার এবং ১৯৪৮ সালের ২০ জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার গান্ধীকে হত্যার চেষ্টা করেন। পূর্বের ব্যর্থ চেষ্টাগুলোর পর অন্য একজন সহযোগী নারায়ন আপতেসহ নাথুরাম গডসে মুম্বাই হয়ে পুনেতে আসেন। সেখান থেকে গঙ্গাধর নামের একজনের সহযোগীতায় বেরেটা এম১৯৩৪ সেমি অটোমেটিক পিস্তল ক্রয় করেন এবং দিল্লি রেল স্টেশনের ছয় নাম্বার কক্ষে হত্যাকান্ডের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন। এই তিনজন ছাড়াও হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনায় আরো চারজন অভিযুক্ত ছিল।
এই হত্যাকান্ডের জন্য নাথুরাম গডসের কোনো অনুশোচনা ছিল না। তিনি ব্রিটিশদের সহিংস কাজের বিরুদ্ধে গান্ধীর অহিংস বাণী এবং সত্যাগ্রহের বিপক্ষে ছিলেন। তাছাড়া তিনি মনে করতেন গান্ধী পাকিস্তানকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। গান্ধী আর তার দলের প্রশ্রয়ের কারণে পাকিস্তান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। স্বাধীন রাষ্ট্রে হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। যদি তা হয়, তাহলে পাকিস্তান ভারতের জন্য বিপদজনক হিসেবে দেখা দিবে। গডসে আদালতে গান্ধী হত্যাকান্ডের কারণ বিশদভাবে বর্ণনা করে।
১৯৪৯ সালের ১৫ নভেম্বর মহাত্মা গান্ধীর এ হত্যাকারীকে আমবালা জেলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন