সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

সুলটানা: বাড়ি ফেরার স্বপ্নগুলো তলিয়ে গেল মিসিসিপির জলে
১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা বন্ধের ইশতেহার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দাসপ্রথা বন্ধ হয়ে গেলে তুলাভিত্তিক অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে, এমন চিন্তা থেকে এই অমানবিক প্রথা টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে দাসনির্ভর ১১টি অঙ্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে যাবার ঘোষণা দিয়ে ১৮৬১ সালে গঠন করে ‘কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা’, যেটি পরিচিত হয়েছিল ‘কনফেডারেসি’ হিসেবে। আর লিংকনের নেতৃত্বকে স্বীকার করে নেয়া দাসপ্রথা নিষিদ্ধকারী ২৩টি ও দাসনির্ভর ৫টি অঙ্গরাজ্য মিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচিত হয়েছিল ‘ইউনিয়ন’ হিসেবে। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ এই চার বছর ধরে ইউনিয়ন ও কনফেডারেসির মধ্যে চলে ‘আমেরিকান সিভিল ওয়ার’। যুদ্ধে নিহত হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ লক্ষ মানুষ। সিভিল ওয়ার শেষ হয় কনফেডারেসির পরাজয় ও বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে।
union vs confমুখোমুখি ইউনিয়ন আর কনফেডারেসির সৈন্যরা
এই ভয়ঙ্কর প্রাণহানির যুদ্ধের একেবারে শেষ সময়ে আওতায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। সেই সময়, লিংকনের মৃত্যু, তার আততায়ীর ধরা পড়ার পর মৃত্যু আর কনফেডারেসি বাহিনীর প্রধানের আত্মসমর্পণ- পরপর এমন সব ঘটনার উত্তেজনার মাঝে, মানুষের অনেকটা অজান্তেই অসম্ভব হৃদয়বিদারক এক সমাধি রচিত হয়েছিল মিসিসিপি নদীর বুকে। সুলটানা নামের একটি জাহাজে করে কনফেডারেসির বন্দিশিবির থেকে বাড়ি ফিরছিল সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত যুদ্ধবন্দীরা। মুক্তির আনন্দে পরিপূর্ণ হৃদয় নিয়ে যখন তারা স্বপ্ন দেখছিল ভবিষ্যতের, তখন নিষ্ঠুর অর্থলোভ আর ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রাসাদের কূটকৌশলের বলি হয়ে এক হাজার আটশোটি স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছিল মিসিসিপির জলে। আজ থেকে দেড়শ বছর আগের সেই করুণ স্বপ্নসমাধি নিয়ে আজকের লেখা।
সুলটানা ছিল একটি বাষ্পচালিত ছোট জাহাজ যেগুলো স্টিমবোট নামেও পরিচিত। কাঠের তৈরি এই জাহাজটি নির্মিত হয়েছিল ১৮৬৩ সালে। প্রথমে এর মালিক ছিল ক্যাপ্টেন প্রেস লোডউইক, পরবর্তীতে একটি কনসোর্টিয়াম জাহাজটি কিনে নেয়, ক্যাপ্টেন জন ক্যাস ম্যাসন ছিল অংশীদারদের একজন। দুই বছর ধরে এটি নিয়মিত সেন্ট লুইস বন্দর থেকে লুইজিয়ানার নিউ অরলিন্স রুটে চলাচল করত, সে সময় যুদ্ধ চলার কারণে কখনো কখনো বহন করত সৈন্যদের।
sultana1জণাকীর্ণ সুলটানা, শিল্পীর কল্পনায়
এমনই এক দিন, ১৮৬৫ সালের ১৩ এপ্রিল, নিউ অরলিন্স এর উদ্দেশ্যে সেন্ট লুইস ছেড়ে যায় সুলটানা। সে সময় জাহাজের দায়িত্বে ছিল ক্যাপ্টেন জন ম্যাসন। ১৫ এপ্রিল ফোর্ড’স থিয়েটারে আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। জাহাজ তখন ইলনয়ের কাছাকাছি। কেয়ারো শহরে পৌঁছে লিংকনের মৃত্যুসংবাদ শুনে জাহাজ সেখানেই নোঙর করল ক্যাপ্টেন ম্যাসন। জাহাজ যেদিকে যাচ্ছে, সেদিকে দক্ষিণের স্টেটগুলোতে টেলিগ্রাফিক যোগাযোগ বন্ধ সিভিল ওয়ারের কারণে। তাই লিংকনের মৃত্যুর খবর ওদিকে যেতে সময় লাগবে। ম্যাসন একগাদা সংবাদপত্র কিনে নিল সেজন্য, যাতে দক্ষিণের দিকে যেতে যেতে খবরটা সবখানে পৌঁছে দিতে পারে।
মিসিসিপির ভিকসবার্গে পৌঁছানোর পর ম্যাসনের সাথে দেখা হল লেফট্যানেন্ট কর্নেল রুবেন হ্যাচের সাথে। হ্যাচ তখন ভিকসবার্গের চিফ কোয়ার্টারমাস্টার। ম্যাসন কথার এক ফাঁকে তাকে বলল, কিছুটা অর্থসংকটে আছে সে। হ্যাচ তখন ম্যাসনকে জানাল, একটা কাজ করতে পারলে বড় রকমের টাকা আয়ের সুযোগ আছে। কনফেডারেসি সম্প্রতি কয়েক হাজার যুদ্ধবন্দিকে ছেড়ে দিয়েছে। আলবামা আর জর্জিয়ার বন্দি শিবির থেকে মুক্তি দেয়া ইউনিয়নের এই অধিবাসীদের এনে রাখা হয়েছে ভিকসবার্গের কাছেই একটা প্যারোল ক্যাম্পে। সেখানে তারা অপেক্ষা করছে নিজেদের এলাকায় ফেরার জন্য। যে কোনো জাহাজ একদল বন্দিকে উত্তরে ফিরিয়ে নিলেই সেটার ক্যাপ্টেনকে প্রতিজন বন্দির বিনিময়ে ৫ ডলার আর প্রতি অফিসারের বিনিময়ে ১০ ডলার করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন সরকার। এখন হ্যাচ প্যারোল ক্যাম্প থেকে ১,৪০০ বন্দিকে ম্যাসনের জাহাজে করে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দেবে। বিনিময়ে প্রতিজনের জন্য ম্যাসন তাকে দেবে দেড় ডলার। দুজনেরই পকেট ভারি হবে। এমনিই অর্থসংকট, সেখানে নিজের কাছে গোটা একটা জাহাজ থাকতে এত বড় দাঁও মারার সুযোগ ছাড়বে কেন ম্যাসন, সে রাজি হয়ে গেল হ্যাচের প্রস্তাবে।
johncassmasonkapitany
ক্যাপ্টেন জন ক্যাস ম্যাসন
জাহাজের মূল গন্তব্য ছিল নিউ অরলিন্স। তাই আগে ভিকসবার্গ থেকে জাহাজ নিয়ে সেদিকে গেল ম্যাসন। নিউ অরলিন্স থেকে প্রায় শ’খানেক যাত্রী তুলে নিল জাহাজে, সাথে নিল কিছু খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস। এবার ভিকসবার্গের দিকে রওনা হল সুলটানা। সেখানে পৌঁছাতে তখনও ঘণ্টাখানেক বাকি, এমন সময় জাহাজের চারটা বয়লারের একটাতে লিক ধরা পড়ল, খানিকটা ফাটল ধরেছে সেই বয়লারটিতে। জাহাজের গতি কমিয়ে দিল ম্যাসন যাতে বয়লারে বাষ্পের চাপ কম পড়ে, ধীরে ধীরে পৌঁছে গেল ভিকসবার্গে। এখান থেকেই বয়লার সারানো হবে আর জাহাজে তোলা হবে মুক্তিপ্রাপ্ত যুদ্ধবন্দিদের।
জাহাজ ভিড়ল ভিকসবার্গে। বন্দিদের নিয়ে আসা হল সেখানে। তাদের গন্তব্য উত্তরের বিভিন্ন স্টেট, তবে বেশিরভাগের বাড়ি ছিল ওহাইও, মিশিগান, ইন্ডিয়ানা, কিংবা ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া। একজন মেকানিক নিয়ে আসা হল বয়লারের ছিদ্র সারানোর জন্য। সেই মেকানিক চাইছিল বয়লারের ফেটে যাওয়া অংশটা পুরো খুলে নিয়ে নতুন অংশ জোড়া লাগিয়ে দিতে। কিন্তু ম্যাসন ভাবল, সেটা করতে গেলে কয়েকদিন সময় লেগে যাবে। আর এর মধ্যে অন্য জাহাজ এসে নিয়ে যাবে বন্দিদের। এভাবে বয়লার সারাতে গেলে হাতছাড়া হয়ে যাবে বিশাল অঙ্কের টাকা। তাই ম্যাসন আর তার জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার নাথান উইনট্রিঙ্গার মিলে মেকানিককে বোঝালো, বয়লারের সেই অংশটা পাল্টানোর দরকার নেই, কেবল ফেটে গিয়ে বের হয়ে থাকা জায়গাটা হাতুড়ি দিয়ে সমান করে এরপর সেখানে হালকা একটা পাত লাগিয়ে দিলেই কাজ হয়ে যাবে। তাদের কথামতই সারানো হল বয়লার। কাজ শেষ হয়ে গেল এক দিনের মধ্যেই। আর এই ফাঁকে বন্দিদের জাহাজে ওঠানোর কাজ সেরে ফেলল ম্যাসন।
mississippi-river-08মিসিসিপি নদীর বর্তমান গতিপথ, লাল তারকা চিহ্নিত স্থানে সেন্ট লুইস, মেমফিস ও নিউ অরলিন্স
এদিকে হ্যাচ আর ম্যাসনের প্রাথমিক পরিকল্পনায় ১,৪০০ জনকে নেয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হ্যাচ ঐ প্যারোল ক্যাম্পে থাকা সকল বন্দিকে তুলে দিল জাহাজে। সুলটানার ধারণ ক্ষমতা ছিল ৩৭৬। এর মধ্যে নিউ অরলিন্স থেকে তোলা হয়েছে কিছু যাত্রী। আর প্যারোল ক্যাম্প থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দি উঠল ২,১০০ জনেরও বেশি। জাহাজের এক কণা জায়গাও অবশিষ্ট রইল না, লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল সুলটানা। এদিকে দীর্ঘ দিন বন্দি থেকে তাদের অবস্থা তখন ভয়াবহ দুর্বল, অনেকেই ছিল অসুস্থ। জাহাজের প্রতিটি অংশ মানুষ দিয়ে ভরে আছে কানায় কানায়। এর সাথে আছে ১২০ টন ওজনের চিনির বস্তা যেগুলো নামানো হবে টেনেসি পৌঁছানোর পর। এদিকে প্রচণ্ড ওজন সইতে না পেরে জাহাজের ডেকের কোনো কোনো জায়গায় ফাটল ধরে ভেঙে পড়ে যাওয়ার দশা হল, কাঠের বিম দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা হল সেগুলো। ১৮৬৫ সালের ২৪ এপ্রিল ভিকসবার্গ থেকে রওনা হল সুলটানা।
sultana2টি ডব্লিউ ব্যাঙ্কসের তোলা সুলটানার ছবি
তখন বন্যা চলছে। মিসিসিপির সমসাময়িক ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম বন্যা। কোথাও কোথাও কূল ছাপিয়ে তিন মাইল ছড়িয়ে পড়েছে নদীর পানি। ডুবে আছে সব, কূলের বড় বড় গাছের মাথাগুলো শুধু দেখা যাচ্ছে, বাকিটা পানির নিচে। ভয়ঙ্কর স্রোতের মধ্যে দিয়ে চলছে সুলটানা, দুই দিন ধরে চলতে হয়েছে স্রোতের প্রতিকূলে। ২৬ এপ্রিল জাহাজ পৌঁছাল আরকানসাসের হেলেনায়। সেখানে টি ডব্লিউ ব্যাঙ্কস নামের একজন ফটোগ্রাফার তুলে রাখলেন অতিরিক্ত যাত্রী দিয়ে পরিপূর্ণ জাহাজটির ছবি। সন্ধ্যা ৭ টার দিকে টেনেসির মেমফিসে ভিড়ল সুলটানা। জাহাজের ক্রুরা সেখানে নামিয়ে দিল ১২০ টন চিনি। মধ্যরাতে মেমফিস ছেড়ে আবার রওনা হয়ে কিছু দূর গিয়ে একটা জায়গা থেকে কয়লা তোলা হল জাহাজে। এরপর উত্তরের দিকে শুরু হল মূল যাত্রা। যাত্রাপথ স্রোতের প্রতিকূলে।
জাহাজ চলছে। ২৬ পেরিয়ে ২৭ এপ্রিল দিবাগত রাত তখন। খরস্রোতা মিসিসিপির ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজ দুলে দুলে উঠছে খানিক পর পর। নদীর স্রোতের প্রচণ্ড গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বারবার হেলে পড়ছে এপাশ-ওপাশ। আর স্রোতের শক্তিও তো কম নয়, সেটা মোকাবেলা করার জন্য বয়লারে বাষ্পের চাপ বাড়িয়ে দিতে হয়েছে অনেকখানি। এমন করে এগুতে এগুতে জাহাজ তখন মেমফিস থেকে ৭ মাইল উত্তরে প্রমত্ত নদীর বুকে। রাত বাজে ২টা। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ হল বিস্ফোরণের। ফেটে গেল জাহাজের একটা বয়লার, সেকেন্ডের মধ্যে ফাটল আরও দুটো। সেই বিস্ফোরণ ডেক থেকে কিছু যাত্রীকে উড়িয়ে নিয়ে ফেলল নদীতে। জাহাজের একপাশ ভেঙে পড়ল। জাহাজের সামনের অংশে নিচে আছে ফার্নেস বক্স। সেদিকের ডেক ভেঙে পড়ল সেই বাক্সগুলোর উপর। আগুন ধরে গেল সেখানে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল আগুন। পানির উপরে সুলটানার গোটা কাঠামোটা পরিণত হল ভয়ঙ্কর এক অগ্নিকুণ্ডে। বয়লার বিস্ফোরণের শব্দ আর আগুনের গরম হলকায় যাত্রীরা দিশেহারা হয়ে গেল, ছুটোছুটি শুরু করল পাগলের মত। সবাই ঝাঁপ দিতে থাকল নদীতে। খরস্রোতা নদীর বুকে তখন হাজারও মানুষ, অনেকেই সাঁতার জানে না, ডুবে যেতে লাগল তখনই। বাকিরা সাঁতরাচ্ছে প্রাণপনে। একে তো দুর্বল শরীর, তার উপর মৃত্যুভয়, একটু সাঁতরেই দ্রুত শক্তি ফুরিয়ে এল সবার। মাথায় তখন তাদের কেবল একটু কিছু আঁকড়ে ধরে বাঁচার তাগিদ। সেই মরণসাগরে আর কী আছে তখন, কেবল মানুষের শরীর ছাড়া, জাপটে ধরতে লাগল একজন আরেকজনকে। প্রবল স্রোতের গভীরে তলিয়ে যেতে লাগল শত শত মানুষ।
sultanaদিশেহারা যাত্রীরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে নদীতে, কম্পিউটারে আঁকা ছবি
এদিকে ‘বোস্টনা টু’ নামের দক্ষিণের একটি জাহাজ তখন ছিল নদীতে। সেবারই প্রথম নদীতে নেমেছিল জাহাজটি, যাত্রা শেষে ফিরে আসছিল সেটি। বয়লার বিস্ফোরণের প্রায় এক ঘণ্টা পর রাত ৩টার দিকে সেটি পৌঁছাল জ্বলন্ত সুলটানার কাছে। বোস্টনা টু থেকে উদ্ধার করা হল তখনও বেঁচে থাকা কিছু মানুষকে। জাহাজের ভাঙা টুকরো ধরে ভাসছিল যারা, তারা স্রোতের সাথে এগিয়ে গেল মেমফিস সংলগ্ন কূলের দিকে। সেখানে নোঙর করা ছিল কতগুলো স্টিমবোট আর যুদ্ধজাহাজ। প্রাণে বাঁচতে চিৎকার করতে লাগল পানিতে ভাসতে থাকা মানুষগুলো। এক সময় তীরে থাকা জাহাজের ক্রুদের কানে গেল চিৎকারের শব্দ। প্রায় ডুবতে থাকা মানুষগুলোকে উদ্ধার করল তারা। এদিকে সুলটানার পুড়ে যাওয়া কাঠামোটা ভাসতে ভাসতে গেল আরও ছয় মাইল পশ্চিমে, বিস্ফোরণের সাত ঘণ্টা পর রাত প্রায় ৯টার দিকে ডুবে গেল গোটা জাহাজ। বেশ কয়েকটি জাহাজ, স্টিমবোট, নৌ বাহিনীর গানবোট নদীতে নেমে গেল উদ্ধারকাজে।
SultanaHarpersআগুন ধরে গেছে সুলটানায়, যাত্রীরা পানিতে। শিল্পীর কল্পনায়, হারপারস ম্যাগাজিন থেকে
অনেক মানুষ জাহাজ থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয়ার আগেই মারা গিয়েছিল অগ্নিদগ্ধ হয়ে, অনেকে মারা গিয়েছিল মিসিসিপির রক্ত হিম করা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পানিতে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে, আর অনেকে স্রোতে তলিয়ে গিয়ে। অনেকেই শরীরে আগুন লাগার পরেও ঝাঁপ দিয়েছিল পানিতে। আরকানসাসের উপকূলে ডুবে থাকা গাছগুলোর মাথায় আটকে বেঁচে গিয়েছিল কেউ কেউ, সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় তাদের। সব মিলিয়ে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল প্রায় ৭০০ জন মানুষকে। দ্রুত তাদের পাঠানো হয় মেমফিসের হাসপাতালগুলোতে। তাদের মধ্যেও আরও দুইশ জন মারা যায় নদীতে পড়ার আগেই শরীরের অনেক অংশ আগুনে ঝলসে গিয়েছিল বলে। একটানা কয়েক মাস ধরে নদীতীরে ভেসে এসেছিল লাশ। অনেকের লাশও পাওয়া যায় নি আর। সুলটানার অফিসারেরা, যাদের মধ্যে ছিল ক্যাপ্টেন ম্যাসনও, সবাই তলিয়ে গিয়েছিল মিসিসিপির স্রোতের মধ্যে।
যদিও কদিন আগে এই যুদ্ধবন্দীরা ছিল শত্রুপক্ষের লোক, তবুও মেমফিসের মানুষ এই ভয়াবহ ঘটনায় শোকাহত হয়েছিল। বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোকে সেখানে নিয়ে আসার পর তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিল তারা, এমনটাই লিখেছে সে সময়ের পত্রিকাগুলো। শিকাগো অপেরা ট্রুপ নামের একটা গানের দল আয়োজন করেছিল চ্যারিটি শো’র, যেখানে সে সময় উত্তোলন করা হয় ১,০০০ ডলার।
sultana_model
যাদুঘরে সংরক্ষিত সুলটানার একটি মডেল
এই মর্মান্তিক ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে পরবর্তীতে জানা যায় কেন বিস্ফোরিত হয়েছিল বয়লারগুলো। মূল কারণ ছিল দুটি। বয়লারের মধ্যকার পানির উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আর ধারণক্ষমতার চেয়েও মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বহন করা। বিশাল সংখ্যক যাত্রী থাকায় জাহাজের উপরের অংশ খুব ভারি হয়ে গিয়েছিল। সে কারণে নদীর বাঁক ও ঢেউয়ের ধাক্কা এ দুয়ের ফলেই জাহাজ বারবার যে কোনো এক দিকে হেলে পড়ছিল। জাহাজের কাঠামোর মধ্যে পাশাপাশি বসানো চারটা বয়লার ছিল ভেতর দিয়ে সংযুক্ত। বয়লাগুলোর ভেতরের পানির উচ্চতা খুব বেশি ছিল না। যখন জাহাজ কোনো এক পাশে ঝুঁকে পড়ছিল বয়লারের পানিও সাথে সাথে সেদিকে হেলে পড়ছিল। ফলে বয়লারগুলোর একপাশ খালি হয়ে যাচ্ছিল। এদিকে আগুন তো জ্বলছেই বয়লারের ভেতর। পানি ছাড়াই খালি বয়লারের একপাশ তাই উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। এমন সময় যখন জাহাজ আবার অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ল, হুট করে পানি এসে পড়ল বয়লারের খালি অংশে। সেটা তখন প্রচণ্ড উত্তপ্ত থাকায় অনেক পরিমাণ পানি বয়লারের গা স্পর্শ করার সাথে বাষ্পীভূত হয়ে গেল। হঠাৎ অমন করে বাষ্প তৈরি হওয়ায় চাপ পড়ল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
1a১- জাহাজের লাল চিহ্নিত অংশে বয়লার,২- জাহাজ ডান দিকে হেলে পড়ছে, ৩- জাহাজ বাম দিকে হেলে পড়ছে, ৪- বয়লারের খালি অংশ উত্তপ্ত হচ্ছে, ৫- উত্তপ্ত অংশে পানি স্পর্শ করছে, ৬- পানি বাস্পীভূত হচ্ছে হঠাৎ করেই, ৭- (পাশ থেকে ছবি) বয়লারের মধ্যে বাষ্পের চাপ বেড়ে গেছে অনেক, ৮- বিস্ফোরিত হল বয়লার, ৯- বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ছে। (সব গুলো ছবি ভিডিওচিত্র থেকে নেয়া)
এভাবেই বারবার জাহাজটি এদিক ওদিক কাত হচ্ছিল আর বয়লারগুলোর ভেতর একই ঘটনা ঘটছিল। এক সময় গিয়ে প্রচণ্ড চাপের কারণে বিস্ফোরিত হয় সেগুলো। আর দুদিন আগে একটা বয়লারের ফাটল ঠিক করতে গিয়ে তো ভালো মত কাজই করা হয় নি। যদি বয়লারের ভেতরে পানির উচ্চতা বেশি রাখা যেত সব সময়, তাহলে কাত হলেও পানি কোনো এক পাশে সরে গিয়ে অন্য পাশকে অতিরিক্ত উত্তপ্ত করে দিত না, হয়ত তখন রক্ষা পাওয়া যেত এই বিস্ফোরণ থেকে।
সে রাতের প্রলয়ঙ্করী ঘটনায় মারা গিয়েছিল ১,৭০০’রও বেশি মানুষ, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গণনা অনুসারে ১৮০০ জন। উত্তর আটলান্টিকে এর ৪৭ বছর পর টাইটানিক ডুবে মারা গিয়েছিল ১,৫১২ জন। আর সে রাতে প্রবল লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিল সাড়ে পাঁচশো মানুষ।
Sultanaphotosআরকানসাসের সুলটানা মিউজিয়ামে রাখা নিহতদের কিছু ছবি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যুদ্ধ ব্যতীত নদীপথে প্রাণহানির ঘটনাগুলোর মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। অথচ সে সময়কার সংবাদপত্রগুলো এই খবরটিকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে নি। একদিকে যুদ্ধ শেষ হচ্ছিল, অন্যদিকে খুন হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট লিংকন। লিংকনের আততায়ী জন উইকস বুথ ধরা পড়ার পর মারা গিয়েছিল এক ইউনিয়ন সৈন্যের গুলিতে, আত্মসমর্পন করেছিল কনফেডারেসির জেনারেল রবার্ট এডোয়ার্ড লি। এমন যখন পরিস্থিতি, তখন “প্রেসিডেন্ট খুন!” কিংবা “লি’র আত্মসমর্পণ!” অথবা “বুথ নিহত!” এই ধরনের শিরোনামের ভীড়ে সুলটানার করুণ পরিণতির কথা আর ঠাঁই পায় নি পত্রিকার কাটতির বাজারে।
The Sultana Tragedy: America’s Greatest Maritime Disaster বইয়ের লেখক জেরি পটার লিখেন, “এই ঘটনাটি খুব একটা প্রেস কাভারেজ পায় নি, কারণ, যে স্থানে এবং যখন এটি ঘটেছিল এবং যারা এর শিকার হয়েছিল- এসবের কোনোটিই জানার আগ্রহ সৃষ্টির মত ছিল না। যারা মারা গিয়েছিল তারা কেবল কিছু তালিকাভুক্ত মানুষই ছিল, তাদের কোনো কীর্তি ছিল না ইতিহাসের পাতায়।” তিনি আরও লিখেন, গোটা জাতি তখন কেবল একটা দীর্ঘ চার বছরের রক্তাক্ত যুদ্ধ শেষ করেছে। সে যুদ্ধে মারা গেছে ছয় লাখের বেশি মানুষ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল মৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে, গেটিসবার্গ, এন্টিয়েটাম, চিকামোগা আর শিলোর ভয়াবহ যুদ্ধগুলোর কথা পড়তে পড়তে। মনে হয় মৃত্যু তাদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল।”
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার দায়ে বিচার হয় নি কারোরই। ক্যাপ্টেন ফ্রেডেরিক স্পিড নামের একজন ইউনিয়ন অফিসার, যে একুশশো বন্দিকে প্যারোল ক্যাম্প থেকে ভিকসবার্গে পাঠিয়েছিল, তাকে সুলটানার অতিরিক্ত যাত্রীবহনের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে সামরিক আদালতে রায় দেয়া হয়। কিন্তু সে রায় খারিজ করে দেন সেই আদালতের অ্যাডভোকেট জেনারেল হিসেবে দায়িত্বরত একজন বিচারক। প্যারোল ক্যাম্প থেকে মুক্তিপ্রাপ্তদের ভিকসবার্গে পাঠালেও ক্যাপ্টেন স্পিড সারা দিন ক্যাম্পেই ছিল এবং একজনকেও সে নিজে জাহাজে তুলে দেয় নি, এ কারণেই নির্দোষ খালাস পায় সে। ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস, যে সরাসরি তাদেরকে জাহাজে তুলে দিয়েছিল, সে ছিল সেনাবাহিনীর অফিসার। এ কারণে নিজেদের লোক হিসেবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তুলতে আগ্রহী হয় নি সেনাবাহিনী। এদিকে লেফট্যানেন্ট কর্নেল হ্যাচ, যে ছিল ঘটনার অন্যতম মূল হোতা, ক্যাপ্টেন ম্যাসনের সাথে যে ঘুষের বিনিময়ে বন্দিবহনের চুক্তি করেছিল, সে ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে। ফলে তাকে আর সামরিক আদালতের মুখোমুখি করা যায় নি। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটি দাঁড়িয়েছিল এই যে, ইতিহাসের এই করুণতম মৃত্যুগুলোর জন্য দায়ী ছিল না কেউই।
survivorsবেঁচে যাওয়া কিছু যাত্রী, প্রত্যেকের নাম লেখা আছে ছবিতে
১৮৮৯ সাল থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো একসাথে ‘ন্যাশনাল সুলটানা সারভাইভারস এসোসিয়েশন’ সংগঠনের সদস্য হিসেবে নিয়মিত একত্রিত হতেন। ১৯২০ এর দশকের শেষ দিকে তাদের প্রায় কেউই আর বেঁচে ছিলেন না। ১৯৩৬ সালে সুলটানার ডুবে যাওয়ার ৭১ বছর পর মারা যান জাহাজের যাত্রী হিসেবে বেঁচে থাকা শেষ ব্যক্তি অ্যালবার্ট নরিস, ৯৪ বছর বয়সে।
সুলটানা ডুবে যাবার দেড়শ বছর পর, ২০১৪ সালে হিস্ট্রি ডিটেকটিভস নামের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের অনুসন্ধানে বের হয়েছে সুলটানার দুর্ঘটনার পেছনে দায়ীদের ভয়ঙ্কর সব প্রাসাদ রাজনীতির তথ্য। ১৮৬২ সালে রুবেন হ্যাচ কোয়ার্টারমাস্টার থাকাকালীন তাকে চাকরিচ্যুত করে তার বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে অভিযোগ আনা হয়েছিল দুর্নীতি ও অযোগ্যতার কারণে। তার বড় ভাই ওজিয়াস হ্যাচ সে সময় ছিল ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সেক্রেটারি অব স্টেট, একই সাথে প্রেসিডেন্ট লিংকনের ঘনিষ্ট বন্ধু ও উপদেষ্টা। ওজিয়াস হ্যাচ লিংকনের নির্বাচনের সময় অর্থ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেই সূত্রে ওজিয়াস তার ছোট ভাইয়ের জন্য লিংকনের কাছ থেকে একটা চিঠি লিখিয়ে নেয় যাতে লেখা ছিল, রুবেন হ্যাচের বিচারকাজ বন্ধ করে তাকে যেন আবার দায়িত্বে ফিরিয়ে নেয়া হয় এবং তাকে লেফট্যানেন্ট কর্নেলের পদে উন্নীত করা হয়। রুবেন হ্যাচকে সরাসরি না চিনলেও রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত রাখতে সেই চিঠি লিখে দিয়েছিলেন লিংকন। একই রকম আরও দুটি চিঠি লিখিয়ে নেয়া হয় তৎকালীন মার্কিন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল ইউলিসেস এস গ্রান্ট ও সামরিক সচিব এডউইন স্ট্যানটনের কাছ থেকে। সুলটানার দুর্ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে লিংকনের কাছ থেকে আরেকটি চিঠি লিখিয়ে নেয়া হয়েছিল রুবেন হ্যাচকে কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি দেয়ার জন্য।
rhলেফট্যানেন্ট কর্নেল রুবেন হ্যাচ
তখনকার মার্কিন সেনাবাহিনীর কোয়ার্টারমাস্টারদের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মন্টেগোমারি মেইজ রুবেন হ্যাচকে দায়িত্বে ফিরিয়ে নেবার বিরুদ্ধে থাকলেও প্রেসিডেন্ট, সেনাপ্রধান ও সামরিক সচিবের এই তিন চিঠির বদৌলতে হ্যাচকে কোয়ার্টারমাস্টারের দায়িত্বে বহাল রাখা হয়। ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে চিঠিগুলো। সামরিক আদালতে তিনবার তলব করা হলেও সে আসে নি কেবল এই ক্ষমতার জোরে, তাছাড়া তখনও তো জানা যায় নি হ্যাচের অর্থলোভই ছিল এই প্রাণহানির অন্যতম কারণ।
ভিকসবার্গের কাছে স্থাপিত প্যারোল ক্যাম্প থেকে মুক্তিপ্রাপ্তদের জাহাজে করে ফেরত পাঠানোর তদারকিতে ছিল রুবেন হ্যাচ। সে সময় সুলটানার মত আরও দুটো স্টিমবোট সেখানে এসেছিল তাদের নিয়ে যেতে। কিন্তু নিজের পকেট ভারি করার জন্য হ্যাচ সবাইকে তুলে দেয় ক্যাপ্টেন ম্যাসনের জাহাজ সুলটানায়। এমনকি সুলটানার এই অবস্থা দেখে সহকারি কোয়ার্টার মাস্টার উইলিয়াম কার্নস তাকে বলেছিল ছয় থেকে আটশ যাত্রী অন্য জাহাজে তুলে দিতে, কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত করে নি হ্যাচ।
আব্রাহাম লিংকন ইতিহাসের প্রশংসিত এক প্রশাসক ছিলেন, হয়ত এমন কোনো দুর্ঘটনার কথা তার চিন্তায় আসে নি। কিন্তু এই প্রাণহানির দায় বর্তায় তার উপরেও, কেননা অযোগ্য আর দুর্নীতিবাজ এক সৈন্যের অবস্থান পাকাপোক্ত হয়েছিল তারই অনুমোদনে। হ্যাচের টাকার লোভ আর মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনীতি এই দুইয়ে মিলে শেষ করে দিয়েছিল এক হাজার আটশো মানুষের প্রাণ। লিংকন নিহত হয়েছিলেন আততায়ীর হাতে, হ্যাচের কিছুই হয় নি, ১৮৭১ সালে তার মৃত্যু হয় স্বাভাবিক ভাবেই। লিংকনের মৃত্যুর চার বছর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন সেনাপ্রধান ইউলিসেস এস গ্রান্ট। তার মানে, দুজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিঠিতে চারিত্রিক সততার স্বীকৃতি নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল সুলটানার সলিলসমাধির অন্যতম কারিগর রুবেন হ্যাচ।
Memorial2মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে আছে সুলটানার নিহত যাত্রীদের স্মরণে স্তম্ভ। তেমনই একটি স্মৃতিস্তম্ভ।
ওহাইওর এক ইউনিয়ন সৈন্য ছিল জন ক্লার্ক এলাই। বন্দিশিবিরে ডায়রি লিখত সে। ক্ষুধার্ত, নোংরা আর অসুস্থ হয়ে দিন কাটাতে কাটাতে সে ডায়রিতে লিখেছিল, “বন্ধু আর ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে আর একটা ক্রিস্টমাসও কি পাব না?” মুক্তির বার্তা পাবার পর যখন সে উঠল সুলটানায়, জাহাজ ছাড়বার আগে ডায়রিতে লিখেছিল, “ওহ! আজকে আমার আমার জীবনে মনে রাখবার মত উজ্জ্বলতম দিন।” সেই ডায়রিটি পাওয়া যায় মিসিসিপির জলে ডুবে এলাইয়ের মৃত্যুর পর। তার উজ্জ্বলতম দিনের স্মৃতি আর আনন্দময় আরেক ক্রিস্টমাসের স্বপ্ন এক নিমিষেই শেষ করে দিয়েছিল অর্থলোভ আর ক্ষমতার কূটকৌশল।




ডিন কর্লঃ দ্যা ক্যান্ডিম্যান খ্যাত সিরিয়াল কিলারের কাহিনী
বাস্তব যখন সিনেমাকেও হার মানায়
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসের ৭ তারিখ, সন্ধ্যাবেলায় রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে সতের বছর বয়সী এক তরুণ, নাম তার এলমার ওয়েইন হেনলি জুনিয়র। হেনলির মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজ্যের যত চিন্তা। যে কোনো উপায়েই তাকে আবারো দুশো ডলার যোগাড় করতে হবে, দূর করতে হবে পরিবারের আর্থিক অনটন। এই দুর্দশা দূর করতে গিয়ে যদি কাছের কোনো মানুষের জীবন সংশয়ের মাঝেও পড়ে যায় তাতেও তার কিছু যায় আসে না। এসব ভাবতে ভাবতে যখন সে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলো, তখনই তার দেখা হয়ে যায় টিমোথি কর্ডেল কার্লির (১৯) সাথে। সাথে সাথেই হেনলির মাথায় অন্য চিন্তা এসে ভর করে। সে তাকে ডিন কর্লের বাসায় এক পার্টিতে আমন্ত্রণ জানায়। কার্লি সানন্দে সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়। তারপর দুজনে কর্লের বাসায় এসে ডুবে যায় অ্যালকোহলের জগতে।
এভাবে চলে প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত। মাঝরাতে ক্ষুধা লাগায় স্যান্ডউইচ কিনতে বের হয় তারা। গাড়িতে করে দু’জনে আসে হিউস্টন হাইটসে। সেখানে হেনলির বাড়ির কাছে গাড়ি থামায় কার্লি। গাড়ি থেকে নেমে হেনলি সামনেই তার বান্ধবী রোন্ডা উইলিয়ামস (১৫) এর বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। সেদিন সন্ধ্যায় মদ্যপ অবস্থায় রোন্ডার বাবা তাকে মারধর করেছিলো। তাই বাবার মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার আগপর্যন্ত সাময়িকভাবে বাসা থেকে দূরে অন্য কোথাও থাকার সিদ্ধান্ত নেয় সে। হেনলি রোন্ডাকে কর্লের বাসায় পার্টিতে আমন্ত্রণ জানালে রোন্ডা প্রস্তাবটি লুফে নেয়। তারপর গাড়িতে করে তিনজনই কর্লের বাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
রাত প্রায় তিনটার দিকে (৮ই আগস্ট) তারা তিনজন কর্লের বাসায় এসে পৌঁছায়। রোন্ডাকে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে যান ডিন কর্ল। হেনলিকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেন, “তুমি আমার সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিয়েছো”। হেনলি কর্লকে সব বুঝিয়ে বললে তিনি ঠান্ডা হন। এরপর তিনি তাদের তিনজনকে বিয়ার এবং মারিজুয়ানা পরিবেশন করেন। আবার শুরু হয় তাদের পার্টি। প্রায় দু’ঘন্টা পর তিনজনই অজ্ঞান হয়ে যায়। তখনই শুরু হয় কর্লের খেলা…
বেশ কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পায় হেনলি। টের পায় তাকে উপুড় করে শুইয়ে দু’হাতে হাতকড়া পড়িয়ে রাখা হয়েছে। তার মুখে স্কচটেপ লাগানো ছিলো এবং দু’পা ছিলো বাঁধা। কার্লি আর রোন্ডাকেও একই অবস্থায় রাখা হয়েছিলো। তবে তাদের জ্ঞান তখনও ফিরে আসেনি। হেনলি প্রতিবাদ করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কর্ল, জানান হেনলি সাথে করে একটি মেয়ে নিয়ে আসায় তিনি খুবই রেগে গেছেন। তাই কার্লিকে নির্যাতন করার পর তাদের তিনজনকেই আজ তিনি খুন করবেন। তারপর হেনলিকে টেনেহিঁচড়ে রান্নাঘরে নিয়ে যান তিনি। তার বুকের দিকে .২২ ক্যালিবারের পিস্তলটি তাক করে খুন করার ভয় দেখান। হেনলি তখন একেবারেই চুপ হয়ে যায়। শুধু ঠান্ডা মাথায় সে কর্লের কাছে প্রতিশ্রুতি দেয় যে কর্ল যদি তাকে ছেড়ে দেয় তাহলে এই নির্যাতন আর খুনের কাজে সে নিজেও অংশ নেবে। এই কথা শুনে এতদিনের সঙ্গীর প্রতি বুঝি দয়া হলো কর্লের। তাই তাকে ছেড়ে দিলো সে। দু’জনে মিলে কার্লি আর রোন্ডার অচেতন দেহ টেনে নিলো কর্লের শোবার ঘরে। সেখানে দু’জনকেই টর্চার বোর্ডের সাথে বাঁধা হলো- কার্লিকে উপুড় করে আর রোন্ডাকে চিত করে।
এবার কর্ল হেনলির হাতে একটি ছুরি দিয়ে রোন্ডার জামা কাটতে বললেন। এরপর তিনি কার্লির সাথে মিলিত হতে উদ্যত হলেন এবং হেনলিকেও রোন্ডার সাথে একই কাজ করতে নির্দেশ দিলেন। হেনলি রোন্ডার জামা কাটতে আরম্ভ করলো, কর্ল নিজের জামা খুলে ফেললেন এবং কার্লিকে নির্যাতন করতে শুরু করলেন। এতক্ষণে কার্লি এবং রোন্ডা দুজনই জ্ঞান ফিরে পেয়েছিলো। রোন্ডা যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। সে কোনোমতে মাথা তুলে হেনলিকে জিজ্ঞেস করলো, “এটা কি আসলেই ঘটছে?” হেনলি সম্মতিসূচক উত্তর দিলো। কার্লিও যন্ত্রণায় আর্তনাদ শুরু করে দিয়েছিলো।
হেনলি রোন্ডাকে অন্য রুমে নিয়ে যেতে কর্লের কাছে অনুমতি চাইলো। কিন্তু কর্ল তার কথাকে পাত্তা না দিয়ে নিজের কুকীর্তিতে ডুবে রইলো। হঠাৎ করে হেনলি কর্লের পিস্তলটি কেড়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠলো, “তুমি অনেক বেড়ে গিয়েছো ডিন”। কর্ল তার জায়গা থেকে উঠে ধীরে ধীরে হেনলির দিকে এগোতে থাকলে হেনলি আবার পিস্তল উঁচিয়ে বলে উঠলো, “আমি আর এসবের সাথে থাকতে পারবো না। আমার আর কোনো বন্ধুকেই আমি তোমার হাতে খুন হতে দেবো না”। “আমাকে খুন করো ওয়েইন”, বলে ঠান্ডা মাথায় হেনলির দিকে এগোতে থাকলেন ডিন কর্ল। হেনলি নিজেও বুঝতে পারছিলো না কীভাবে সে এই মানুষরুপী দানবের মোকাবেলা করবে। তাই সে কিছুটা পিছু হটলো। এটা দেখে কর্ল চিৎকার উঠলো, “তুমি এটা করতে পারবে না”। কিন্তু কর্লের অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে হেনলি ঠিকই গুলি চালিয়ে বসলো, গুলিটি গিয়ে বিঁধলো কর্লের কপালে। টলে উঠলেন ডিন কর্ল, তারপরও কোনোমতে এগোতে থাকলেন তারই এককালীন সহকর্মীর দিকে। হেনলি থামলো না, সে আবারো পরপর দু’রাউন্ড গুলি ছুঁড়লো। দুটো গুলিই কর্লের বাম কাঁধে আঘাত হানলো। এবার আর তিনি পারলেন না। মাথা ঘুরে রুমের বাইরে গিয়ে পড়লেন। কর্লের মৃত্যু নিশ্চিত করতে হেনলি তার কাঁধে এবং কোমরের নিচে আরো তিন রাউন্ড গুলি খরচ করলো। রুমের বাইরের হলওয়েতে পড়ে রইলো ডিন কর্লের নিথর দেহ, নগ্ন এবং দেয়ালের দিকে মুখ ঘোরানো অবস্থায়…
বন্ধুদের হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিলো হেনলি। সবাই ঠিকমতো কাপড়চোপড় পড়ে নিলো। সকাল আটটা বেজে চব্বিশ মিনিটে পাসাডেনা পুলিশ অফিসে ফোন দিলো করলো হেনলি। ফোনটি ধরলেন ভেলমা লাইন্স নামে একজন। হেনলি কাঁপা কাঁপা গলায় বোকার মতো বলে বসলো, “আপনারা তাড়াতাড়ি এখানে চলে আসুন। আমি এইমাত্র একজনকে খুন করেছি।” তারপর পুলিশকে বাসার ঠিকানা দিয়ে বারান্দায় অপেক্ষা করতে লাগলো তিনজন।
বেশ কয়েক মিনিট পর ২০২০ লামার ড্রাইভে এসে থামলো পুলিশের গাড়ি। তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে কর্লের মৃতদেহ দেখতে পেলো। সেই সাথে উদ্ধার করলো হত্যাযজ্ঞে ব্যবহার করা পিস্তলটি। হেনলি নিজের পরিচয় দিয়ে জানালো যে, কলটি সে-ই করেছিলো। একইসাথে নিজের এবং বন্ধুদের জীবন বাঁচাতে সে যে ছয় রাউন্ড গুলি চালিয়েছে এই কথাটিও সে স্বীকার করে নিলো।
এরপর পুলিশের কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলো হেনলি। সে পুলিশকে জানালো যে সে এবং ডেভিড ওয়েন ব্রুকস নামের আরেকটি ছেলে কর্লের সহকারী হিসেবে কাজ করতো। তারা শিকারের সন্ধানে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো। যখন উপযুক্ত কারো সন্ধান পেতো তখন তাকে কর্লের বাসায় পার্টির দাওয়াত দিতো। অপরপক্ষ রাজি হলে গাড়িতে করে তাকে কর্লের বাসায় নিয়ে যেতো তারা। সেখানে গিয়ে মারিজুয়ানা আর বিয়ারের আসর জমিয়ে তুলতো তারা। একসময় শিকার অজ্ঞান হয়ে পড়তো। তখন কাজ শেষ হয়ে যেতো হেনলি আর ব্রুকসের। তারা পেয়ে যেতো তাদের শিকারের জন্য ২০০ ডলার মজুরি (মাথাপিছু)। বেশ কিছুক্ষণ পর যখন শিকার জ্ঞান ফিরে পেতো, তখন সে নিজেকে কাঠের বোর্ডের সাথে আটকানো অবস্থায় দেখতে পেতো। তার হাত-পা বাঁধা থাকতো, মুখে লাগানো থাকতো স্কচটেপ অথবা ঢোকানো থাকতো কোনো কাপড়ের টুকরা যাতে কোনো শব্দ বের হতে না পারে। কর্ল উচ্চশব্দে তার রেডিওটা চালিয়ে দিতেন যাতে বন্দীর চিৎকারের কোনো শব্দ বাইরে যেতে না পারে। এরপরই শুরু হয়ে যেতো তার পাশবিক নির্যাতন। বন্দীর শারীরিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিলো কর্লের। তাই বোর্ডের নিচে একটা প্লাস্টিকের শিট বিছিয়ে রাখতেন তিনি যাতে বন্দীর বমি, বর্জ্যপদার্থ এবং রক্ত সেই শিটের উপরে গিয়ে পড়ে। অন্যদিকে চলতে থাকতো কর্লের পাশবিক আনন্দ। নির্যাতনের পালা শেষ হলে গলা টিপে অথবা সরাসরি গুলি করে কর্ল তার শিকারদের খুন করতেন।
এতক্ষণ ধরে হেনলির কাহিনী শোনার পর পুলিশ জানতে চাইলো কর্লের প্রকৃত শিকারের সংখ্যা কত সেই সম্পর্কে। ‘ত্রিশ’ কেবল এই শব্দটুকুই উচ্চারণ করেছিলো হেনলি। এতেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেখানে অবস্থিত পুলিশ সদস্যগণ।
এরপর হেনলি আর ব্রুকসকে নিয়ে চলতে থাকে পুলিশের মৃতদেহ উদ্ধারের অভিযান। ব্রুকস আর হেনলি তাদের শিকারকে একটি Ford Econoline অথবা Plymouth GTX গাড়িতে করে কর্লের বাড়িতে নিয়ে আসতো। আর খুন করার পর কর্ল দেহগুলোকে প্লাস্টিকের ব্যাগে ঢুকিয়ে একটি ভাড়া নেওয়া নৌকা রাখার জায়গা, বলিভার পেনিনসুলার একটি সৈকত, স্যাম রেবার্ন লেকের কাছাকাছি একটি বনভূমি অথবা জেফারসন কাউন্টির একটি সৈকতে পুঁতে রাখতেন। খনন কার্য শুরু হলো। একে একে বেরিয়ে আসতে লাগলো মানুষের হাড়গোড়, হাত, পা ইত্যাদি নানা অঙ্গ। দুর্গন্ধে সেখানে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছিলো। যারা খনন করছিলো তাদের মাঝে একজন আর মানসিক চাপ সইতে না পেরে ডুকরে কান্না শুরু করে দেন। আরেকজন অনবরত বমি করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ সাতাশটি মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এদের সবাই ছিলো ছেলে, যাদের বয়স ছিলো ১৩-২০ বছরের মাঝে। সবাইকেই যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করেছিলেন সমকামী সিরিয়াল কিলার ডিন কর্ল।
বন্দী করা হয় হেনলি আর ব্রুকসকে। হেনলিকে সর্বমোট ৫৯৪ বছর কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়! ব্রুকসকেও আজীবন কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়।
coverমিলিটারি পোষাকে ডিন কর্ল। হত্যাযজ্ঞে জড়ানোর আগে বেশ কয়েক মাস সেখানে চাকরি করেন তিনি 10403350_786526671401618_824955351832259019_n
হাসিখুশি এই মানুষটিকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই যে তিনিই সাতাশ থেকে আটাশটি খুন করেছিলেন 10806288_786526701401615_8657428644882924156_nএলমার ওয়েইন হেনলি, ২০০৮ সালে এক ইন্টারভিউয়ের সময় ডেভিড ওয়েন ব্রুকসডেভিড ওয়েন ব্রুকস কর্লের বাংলো, এখানেই খুন হন তিনিকর্লের বাংলো, এখানেই খুন হন তিনি ব্রুকস (ডানে) এবং হেনলি (বামে)। মৃতদেহের খননকার্য চলার সময়কার ছবিব্রুকস (ডানে) এবং হেনলি (বামে)। মৃতদেহের খননকার্য চলার সময়কার ছবি চলছে মৃতদেহের সন্ধানে খোঁড়াখুঁড়িচলছে মৃতদেহের সন্ধানে খোঁড়াখুঁড়ি একটি কবর দেখিয়ে দিচ্ছেন হেনলিএকটি কবর দেখিয়ে দিচ্ছেন হেনলি ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ আগস্টে হিউস্টন ক্রনিকল পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ আগস্টে হিউস্টন ক্রনিকল পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা
এখানেই বেঁধে রাখা হয়েছিলো রোন্ডা ও কার্লিকেএখানেই বেঁধে রাখা হয়েছিলো রোন্ডা ও কার্লিকে রোন্ডা উইলিয়ামস রোন্ডা উইলিয়ামস
ডিন কর্লের হাতে নিহতদের তালিকা
১৯৭০– জেফরি কোনেন, জেমস গ্লাস, ড্যানি ইয়েট্‌স।
১৯৭১– ডোনাল্ড ওয়ালড্রপ, জেরি ওয়ালড্রপ, র‍্যান্ডেল হার্ভি, ডেভিড হিলিগিয়েস্ট, গ্রেগরি ম্যালি উইঙ্ক্‌ল, রুবেন ওয়াট্‌সন হ্যানে।
১৯৭২– উইলার্ড ব্রাঞ্চ জুনিয়র, ফ্রাঙ্ক অ্যাগুইরে, মার্ক স্কট, জনি ডেলোম, বিলি বাউলচ জুনিয়র, স্টিভেন সিকম্যান, রয় বান্টন, ওয়ালি জে সিমোনাক্স, রিচার্ড হেমব্রি, রিচার্ড কেপ্‌নার।
১৯৭৩– জোসেফ লাইলস, উইলিয়াম রে লরেন্স, রেমন্ড ব্ল্যাকবার্ন, হোমার গার্সিয়া, জন সেলার, মাইকেল বাউলচ, মার্টি জোন্স, চার্লস ক্যারি কোবল, জেমস স্ট্যান্টন।
পরিশিষ্ট
মজার ব্যাপার হলো- খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ার আগে ডিন কর্ল কিন্তু তার এলাকায় ছোটদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন একটি গুণের কারণে। কর্লের পরিবারের ছিলো চকলেটের ব্যবসা। কর্ল স্থানীয় শিশুদের, বিশেষত কিশোরদের মাঝেমাঝেই বিনামূল্যে চকলেট খেতে দিতেন। এজন্য তারা তাকে ডাকতো The Candy Man এবং The Pied Piper নামে। আর এই জনপ্রিয় মানুষটিই শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়লেন এমন ঘৃণ্য কাজে যা তাকে আমেরিকার অন্যতম কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার হিসেবে সবার কাছে পরিচিত করে তুলেছে।




ব্রান ক্যাসেল – ক্রাউন্ট ড্রাকুলার সেই বিখ্যাত দুর্গ
দুর্গ নাম শুনলেই এক ধরনের রহস্যময় আর গা ছমছমে অনুভূতি আমাদের সবার মধ্যেই হয়। মানুষের হাতে তৈরি এসব দুর্গ কোন রূপকথা বা কল্পনার বিষয়বস্তু নয়। জাঁকজমকপূর্ণ সৌন্দর্যের নিদর্শন ও ঐতিহ্য বহন করে দুর্গগুলো। সাধারণত, এসব দুর্গ হয় শহর থেকে অনেক দূরে। নজরকাড়া সবুজের সমারোহ দুর্গগুলোকে মানুষের কাছে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়! সৌন্দর্যের অপর পিঠে থাকে রহস্যময়তা। এই পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কত শত দুর্গ। তাদের ঘিরে কত কল্প-কাহিনী, কত ইতিহাস আর কত রহস্যময়তা!
রোমানিয়ার ট্রান্সসিলভানিয়ার ব্রান দুর্গ রোমানিয়ার ট্রান্সসিলভানিয়ার ব্রান দুর্গ
ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসটি পড়েননি এমন ব্যক্তি বোধহয় খুব কমই আছে। যারা পড়েননি তাদের জন্য গল্পটির সার সংক্ষেপ এরকম: মৃত কাউন্ট ড্রাকুলা দিনের আলোতে কফিনের ভেতর নিথর হয়ে থাকতেন। সূর্য ডোবার সাথে সাথে জেগে উঠতেন তিনি। তারপর বের হতেন শিকারের খোঁজে। অবশেষে শিকার করা মানুষের গলায় তীক্ষ্ণ দুটি দাঁত বসিয়ে রক্ত চুষে খেতেন। এই হল গল্পটির সারকথা। এর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে রোমানিয়ার ট্রান্সসিলভানিয়ার ব্রান দুর্গ এমনই এক দুর্গ যার সাথে জড়িয়ে আছে ড্রাকুলার গল্প।
ব্রান হচ্ছে ব্রাসভের একটা উপশহরের মত ছোট্ট জনপদ, যেখানে প্রবেশের পরপরই পাহাড় চূড়োয় সবুজ বন ঘেরা লাল ছাদের প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন মধ্যযুগীয় সুদৃশ্য দুর্গটি চোখে পড়ে।
ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’
ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’
লোকে বলে, রোমানিয়ার কার্পাতিয়ান পর্বতমালার এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিসের যেন মন খারাপ করা হু হু বাতাস বয়ে যায় মেঘ করে এলেই। সন্ধ্যে নামার সময় কার যেন চাপা, অস্পষ্ট কান্না ভেসে বেড়ায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কেউ শোনেনি, আবার শুনেছে সবাই। কেননা ট্রানসিলভানিয়া এবং ওয়ালাশিয়ার সীমানায় এক পাহাড়ের চূড়ায় পরিত্যক্ত ব্রান প্রাসাদটিকে ঘিরে ঘুরপাক খায় নানা গল্প, উপকথা, স্থানীয় বিশ্বাস। এমন দুর্গ মধ্য ইউরোপে বিরল কিছু নয়, কিন্তু সেই যে পরিবেশের প্রভাব, একে তো দুর্গম ট্রানসিলভানিয়া তার উপর আবার খোদ ড্রাকুলার আস্তানা বলে কথা, দেখামাত্রই মনে হল জানালা দিয়ে কেউ উড়ে বের হল কিনা ডানা ঝাপটে! বেশ লম্বা লাইন সেই সাত সকালেই দুর্গের সামনে।
এর দুর্গটি ড্রাকুলার দুর্গ হয়ে উঠার পিছনে রয়েছে এক ইতিহাস। ১৪৪৮ সালে ওয়ালিসিয়ার যুবরাজ হিসেবে জন্ম নেন তৃতীয় ভ্লাদ টেপাস। কথিত আছে, তিনি এক অত্যাচারী শাসক ছিলেন। তবে রোমানিয়া বা পূর্ব-ইউরোপের চেয়ে বরং পাশ্চাত্যই ভ্লাদকে এক অতিমাত্রায় নিষ্ঠুর, রক্তপিপাসু শাসক হিসেবে চেনে। বলা হয়ে থাকে অটোম্যান সম্রাট দ্বিতীয় মেহমুদ ভ্লাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় ভ্লাদের রাজধানীর কাছে এক অঞ্চলে শূলে চরানো ২০,০০০ মৃতদেহ দেখেন, আর এই নিষ্ঠুরতা চাক্ষুষ করেই তিনি অসুস্থ বোধ করেছিলেন।
ভ্লাদ টেপাস
ভ্লাদ টেপাস
কিন্তু রোমানিয়ায় ভ্লাদ টেপাসকে একজন দেশপ্রেমী রাজা হিসেবেই দেখা হয়। তুর্কি হানাদার এবং অন্যদের থেকে মাতৃভূমি রক্ষা করতেই যে সারা জীবন যুদ্ধ করে গেছে। তবে তার মৃত্যুর কারণ এখনও রহস্যে ঘেরা। তার কবরটি যেখানে পাওয়া যায় সেখানে কোন মৃতদেহ ছিল না। হয়ত সে থেকেই অমর ভ্লাদের গল্প ডানা মেলা শুরু করে।
কোন ঐতিহাসিক সত্যতা নেই যে এখানে ড্রাকুলাদের আবাস ছিল। আর ড্রাকুলার খ্যাতিমান স্রষ্ট্রা ব্রাম স্টোকার কিন্তু জানতেনও না সেখানের পাহাড়ে ড্রাকুলারা কোনদিন থেকেছে কিনা। তবে কীভাবে যেন জনশ্রুতি রটে গেছে। সেই বিশ্বাসের জন্যই লোকে দূরদূরান্ত থেকে ঘুরতে যায় সেখানে। তাদের নাকি একটা হাড় হিম করা অনুভূতিও হয়। হয়তো এর পিছনে এই গুজবও দায়ী।
তবে ব্রান প্রাসাদ তৈরির পিছনে এক ইতিহাস রয়েছে যা বেশ ঘটনাবহুল। ৫৭টি রুম এবং ১৬টি বেডরুম, সাথে ইউনিক এন্টিক ফার্নিচার দিয়ে সাজানো এই দুর্গ। ১২১২ সালে টিউটোনিক নাইটরা এটি তৈরি করেছিল। কিন্তু ১২৪৮ সালে মোঙ্গল দস্যুরা এটি প্রায় ধ্বংস করে দেয়। চতুর্দশ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের উত্থানের সময়ে এটি রোমানিয়ার মানুষদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। মাঝখানের সময়টাও অনেক হাতবদল হয়েছে এর মালিকানা।
রানি মেরিরানি মেরি
তবে ১৯২০ সালে ট্রানসিলভানিয়া বৃহত্তর রোমানিয়ার অঙ্গ হয়ে যায়। সে সময় শহরের মেয়র প্রস্তাব করেন এটি রোমানিয়ার রাজপ্রাসাদ হওয়া উচিত। তখন রাণী মেরির নামডাক ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশ জুড়ে। প্রথা মেনে এটি হস্তান্তর করা হয় রাজপরিবারের কাছে। আর তখন থেকে রাজপরিবারের সদস্যরা থাকতে শুরু করেন এখানে। রাণী মেরির খুব পছন্দের জায়গা ছিল এটি।
রাজকুমারি ইলিয়ানা রাজকুমারি ইলিয়ানা
এরপর শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। রানী মেরির ছিল এক সুন্দর রূপবতী মেয়ে। নাম তার ইলিয়ানা। রাজকুমারী ইলিয়ানা তখন বড় হচ্ছেন। রাজকুমারী মানেই যে অহংকারী, তা কিন্তু সব সময় সঠিক নয়। এই রাজপ্রাসাদে তিনি আর্ত, অসুস্থ, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত মানুষের সেবার জন্য হাসপাতাল খুলেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে রাজপরিবারকে সরিয়ে কমিউনিস্টরা প্রাসাদটি দখল করে নেয়।
বর্তমানে এই প্রাসাদকে ঘিরে একটি জাদুঘর আছে। এখানে শুধুমাত্র কুইন মেরির সংগ্রহ করা রাজকীয় আসবাবপত্র এবং রোমানীয় শিল্পকে তুলে ধরা হয়েছে। যে কেউ চাইলে সম্মানির বিনিময়ে তা দেখতে পারেন।
এখানেই শেষ নয়। রাণী মেরির মৃত্যুর পর শুরু হয় আরেক রহস্যময় কাহিনী। ব্রান প্রাসাদকে ঘিরে রোমাঞ্চ ছড়ানোর কারণও আছে। পাহাড়ের নীচে উপত্যকায় ছোট্ট একটি চ্যাপেল বা গ্রোটো রয়েছে। এখানে আছে ভারি অদ্ভুত এক জিনিস। রাণী মেরি মারা যাওয়ার সময় বলে যান, তার হৃদপিণ্ডটি যেন একটি সোনার কাসকেটে ভরে কৃষ্ণ সাগরের তীরে ব্যালচিক প্রাসাদের চ্যাপেলে রাখা হয়।
পরে ১৯৪০ সাল নাগাদ রাণীর প্রিয় ব্রান ক্যাসেলের এই গ্রোটোতে আনা হয় মেরির হৃদপিণ্ড। সেখানেই এই কাসকেটটি রোমানিয়ার জাতীয় পতাকায় মুড়ে একটি শ্বেতপাথরের সারকোফেগাসে রাখা আছে।
রোমাঞ্চকরই বটে, তাই না?
ব্রান প্রাসাদের জাদুঘরে দর্শকদের ভিড়ব্রান প্রাসাদের জাদুঘরে দর্শকদের ভিড়
রোমানিয়ার সরকার বর্তমানে এই প্রাসাদটিকে জাদুঘর হিসেবে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। যদি ড্রাকুলার সত্যিকারের কোন নিদর্শন দেখার জন্য যেতে ইচ্ছুক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি হতাশ হতে পারেন। তবুও প্রতি বছর প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ পর্যটক এই দুর্গের আধো অন্ধকার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ানোর গা শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতা নিতে যান৷ দুর্গের উপর থেকে দেখবেন সেই উঠান, যেখানে নাকি ঘুরে বেড়াত কাউন্টের অনুগত নেকড়ের পাল৷ আর ব্রান ক্যাসেলের ব্যালকনি থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাবেন চারপাশের প্রকৃতি।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, ট্রানসিলভানিয়ার অধিকাংশ হোটেলেই শুকনো রসুনের মালা রাখা হয়, বিশেষ করে ভিনদেশী শিশুদের জন্য, যাতে তারা রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারদের ভয় থেকে সামান্য হলেও মুক্ত থাকতে পারে। বলা হয়ে থাকে, রসুন, ক্রুশ এবং ধুনই পারে ঐ আঁধারের জীবদের দূরে রাখতে। ক্রুশ দেখেই উপরের জানালার দিকে তাকিয়ে আপনি পরখ করে নিতে পারেন কেউ আপনাকে অনুসরণ করছে কিনা। অজানা রোমাঞ্চকর মুহূর্তের আমেজ নিতে কে না চায় বলুন?



কার্ল সালমিস্তারঃ নেপোলিয়নের দুর্ধর্ষ এক গুপ্তচর
নেপোলিয়নের শাসনামলে ফ্রান্সের এক দুর্ধর্ষ গুপ্তচরের নাম হল কার্ল সালমিস্তার। এই সালমিস্তারের গল্পগুলো বলার মত। যেমন ছিল তার তীক্ষ্ন বুদ্ধি, তেমনি ছিল ব্যক্তিত্ব আর অভিনয় করার প্রচন্ড দক্ষতা। Force-2 মুভিটা দেখছিলাম, গুপ্তচরদের সাথে কীরকম আচরণ করা হয় তাদের মৃত্যুর পর, সেটা নিয়েই নির্মিত। তখুনি মাথায় এলো, কার্ল সালমিস্তারের ব্যাপারেও মানুষের জানা উচিত। বিজেতা হিসেবে নেপোলিয়নের যে সুনামটুকু, তার সাথে যে সালমিস্তার নামক ছোটখাটো মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে সেটা খুব কম মানুষেরই জানা আছে।
ka1চিত্র: নেপোলিয়ন বাহিনীর যুদ্ধজয়;
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ডান হাত ছিল এই সালমিস্তার। এই সালমিস্তার তার জীবনে সমস্ত মানুষকে ঠকিয়েছে, শুধু ঠকায়নি তার প্রভু নেপোলিয়নকে।
১৭৭০ সালে ফরাসী সীমান্তে জন্ম হয় সালমিস্তারের। স্কুলে থাকাকালীন সময়েই হয়ে উঠে দক্ষ চোরা-চালানী। উনিশ-বিশ বছর বয়সের পূর্বেই বেআইনী আমদানি-রপ্তানি তে হাত পাকিয়ে ফেলেছে।
চিত্র: কার্ল সালমিস্তার; উৎস: https://en.wikipedia.org/wiki/Karl_Schulmeisterচিত্র: কার্ল সালমিস্তার; উৎস
যে সময়ের কথা বলছি, নেপোলিয়ন সবেমাত্র ফ্রান্সের দখল নিয়েছে, পুরো ইউরোপ দখলের উন্মত্ততা তাকে ছেঁয়ে আছে। ছোটখাটো এক সৈনিক থেকে ফ্রান্সের কর্ণধার। সারা ইউরোপ দখল করার স্বপ্ন চোখে নিয়ে দপদপিয়ে বেড়াচ্ছিল সে সময়ে। তা দেখে, নেপোলিয়নের প্রতি সালমিস্তারের মনে ছিল অনেক ভক্তি।
একদিন হঠাৎ করেই সালমিস্তারের কাছে সুযোগ এসে গেল, নেপোলিয়নের জন্য কিছু করার। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ঠেকাতে, তিনি চাইছিলেন চরম একটা উদাহরণ তৈরি করে দিতে, যেন আর কেউ কখনো ষড়যন্ত্রের সাহস না করে। নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীতে স্যাভারি নামক এক সেনাপতি ছিল। স্যাভারি বেশ ভালমতোই সালমিস্তারকে চিনতো। স্যাভারির হঠাৎই মনে হল, সালমিস্তার নেপোলিয়নের কাজটি করে দিতে পারবে, সেই দক্ষতা সালমিস্তারের রয়েছে। স্যাভারি তাই নেপোলিয়নের প্রস্তাব নিয়ে সালমিস্তারের কানে তুললো।
সালমিস্তার সেই সুযোগ লুফে নিল বলা চলে। এই কাজের জন্য নিয়োগ পেল সালমিস্তার। বুঁড়বো বংশীয় ডিউকরা সে সময়ে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পায়তারা করছিল। সালমিস্তার ভাবলো কোনো এক ডিউককে যদি সীমান্ত পার করে নিয়ে আসা যায়, তাহলেই তাকে ধরিয়ে দেয়া যাবে নেপোলিয়নের কাছে।
বলির পাঠা হওয়ার জন্য যেন, ডিউক এনঘিন তৈরি হয়েই ছিলেন। তিনি সেই সময়ে অবস্থান করছিলেন জার্মানীর বডেন শহরে। আসছে সপ্তাহে স্ট্রাসবুর্গের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর মেয়ের সাথে বিয়ে, বাগদান সম্পন্ন হয়েই আছে।
সালমিস্তার প্রথমেই মিথ্যা এক অজুহাতে সেই মেয়েকে এনে বন্দী করে রাখলেন ফরাসী সীমান্তে। তারপর ডিউককে লিখলেন মস্ত এক চিঠি। বাগদত্তার হাতের লেখা এমন ভাবে নকল করলেন যে, আর বোঝার উপায় রইলো না, এটা সালমিস্তারের লেখা ছিল। চিঠির মূল কথাগুলো ছিল এমন, “আমাকে এরা বন্দী করে রেখেছে, কী কারণে সেটা বলছে না। তুমি আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে না গেলে উপায় নেই বাঁচার”।
ডিউক চিঠি পড়ে একটুও সন্দেহ করলেন না। উদ্ধার করার উদ্দেশ্য একাই রওনা হয়ে গেলেন। তিনি ভেবেছিলেন, অর্থলালসাকে উপজীব্য করেই এই অপহরণ করা হয়েছিল। কিন্তু বুঝতে পারেননি হিসেবে যে সামান্য ভুল ছিল। ফরাসী সীমান্তে প্রবেশের আগেই তাকে গ্রেপ্তার করে হাজির করা হল নেপোলিয়নের সামনে। ষড়যন্ত্রকারীদের কীভাবে খুঁজে বের করা হবে, সেই উদাহরণ তৈরি করলেন নেপোলিয়ন। শাস্তিস্বরূপ রায় দিলেন ফাঁসির।
আর সালমিস্তারের দক্ষতায় নেপোলিয়ন হলেন মুগ্ধ, এরপর থেকে গোপন বৈঠকগুলোয় ডাক পড়তে লাগলো সালমিস্তারের।
একে একে কাজের ভার দিতে শুরু করলেন সালমিস্তারের উপর। আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড; গুপ্তচরবৃত্তিতে সবগুলোতেই সফল হল সালমিস্তার। নেপোলিয়ন তখন অনেকটাই ভরসা করে বসে আছেন সালমিস্তারের উপর। এবার দিলেন সবথেকে বিপজ্জনক কাজের ভার, অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনীর সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে আনা চাই।
সুন্দর এক গল্প সাজালো সালমিস্তার। অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল ম্যাক এর কাছে গিয়ে বলল, নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাকে ফ্রান্স থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অনেক গালিগালাজও করতে ছাড়লো না নেপোলিয়নকে। ম্যাক এ সমস্ত শুনে অনেক মজা পেল। ম্যাকের মতে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী অনেক শক্তিশালী। সহজে ধরাশায়ী করা যাবে না।
সালমিস্তার যেন ম্যাকের মুখের কথা কেড়ে নিল। বলল, যতটা আপনারা মনে করেন ততটা শক্তিশালী বাহিনী তার নেই। সাথে এও যোগ করল যে, ফ্রান্সের বহু লোক নেপোলিয়নের থেকে মুক্তির জন্য যেকোন সময়ে অস্ট্রিয়ার পক্ষে যোগদান করতে ইচ্ছুক।
অস্ট্রিয়ানরা আগে একবার নেপোলিয়নের কাছে হেরেছে। সুতরাং তাদের মনে নেপোলিয়নের প্রতি একটা ভয় কাজ করছিল, কখন না জানি আক্রমণ করে বসে লোকটা। সালমিস্তারের কথাবার্তায় মার্শাল ম্যাকের মনে হল, বহুদিনের লালিত স্বপ্ন এবার বুঝি সত্যি হয়।
ম্যাক সালমিস্তারকে নিয়োগ দিল অস্ট্রিয়ার পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য। সে চাইছিল, সালমিস্তার ফ্রান্সে ফিরে গিয়ে সকল খবরাখবর সংগ্রহ করে আনুক, কিন্তু পাছে আবার ধরা পড়ে যায় নেপোলিয়নের হাতে। তাই ম্যাক সাহেবের রায় হল, সালমিস্তার যেন, তার পরিচিত মানুষজনকে চিঠি লিখে খবর আনায়।
ধীরে ধীরে ফ্রান্সের খবর সরবরাহ শুরু করল সালমিস্তার, সবই ছিল বানোয়াট, নেপোলিয়ন এসমস্ত কথাই জানতো। নেপোলিয়নের আদেশে পৃথকভাবে ছাপানো খবরের কাগজ যেতো সালমিস্তারের নামে। তাতে থাকতো নেপোলিয়নের বিরোধীদলের কার্যকলাপের মিথ্যা গল্প। ম্যাকের মন থেকে ধীরে ধীরে নেপোলিয়নের ভয় উবে যেতে শুরু করেছিল সেই সময়টায়।
এক সময় অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীতে উচ্চপদস্থ এবং অনেক সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন সালমিস্তার। অনেক ধনী হয়ে উঠলো সালমিস্তার। নেপোলিয়ন সংবাদ পাঠাল যে, তিনি এবার অস্ট্রিয়া আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। সময় বুঝে, ফিল্ড মার্শালকে লেলিয়ে দিলেন পুরো সেনাবাহিনী নিয়ে ফ্রান্সকে আক্রমণ করতে, সেই ছিল সময়। ম্যাকের মন ছিল অনেক ফুরফুরে, তিনি অবশেষে ফ্রান্স জয় করতে যাচ্ছেন, বাছাইকৃত ত্রিশ হাজার সৈন্য পাঠাল, ফ্রান্স জয় করে নেপোলিয়নকে পাকড়াও করে আনতে। সৈন্যদল কিছুদূর এগোতেই, ফরাসীদের শত শত কামান গর্জে উঠল, আকাশ ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল।
দুর্দান্ত এই লড়াই চলল তিনদিন পর্যন্ত। টানা তিনদিন লড়াই শেষে, সৈন্যদের শরীর যেন আর চলছে না। একে একে ঢলে পড়ল মৃত্যুর কবলে। শেষপর্যন্ত মার্শাল আত্মসমর্পণ করতেই বাধ্য হল। কোনরকমে ফিরে এল ভিয়েনাতে। সালমিস্তার আগে থেকেই প্রস্তুত। অস্ট্রিয়ার সম্রাটকে বেশ ভাল মতোই বুঝাল যে, মার্শাল ম্যাকের জন্যই এই পরাজয়। ম্যাকের উপর বিচার শুরু হল, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন। এইদিকে নেপোলিয়নের বাহিনী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল ভিয়েনার দিকে।
আবারো সালমিস্তারের ফাঁদে পড়লো অস্ট্রিয়ার সেনাবাহিনী। আর নেপোলিয়ন তো প্রথম থেকেই প্রস্তুত ছিল। অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনী আক্রমণ শুরু করা মাত্রই, তাদের হারিয়ে দিয়ে দখল করে নিল পুরো অস্ট্রিয়া। এই ছিল সেই বিখ্যাত অস্টারলিটজ যুদ্ধ।
চিত্র: অস্টারলিটজের যুদ্ধের একাংশ; উৎস: https://commons.wikimedia.org/wiki/File:Willewalde_-_Czar's_Guard_capture_4th_line_regiment's_standard_at_Austerlitz.jpgচিত্র: অস্টারলিটজের যুদ্ধের একাংশ;
নেপোলিয়ন ভিয়েনা তে প্রবেশ করার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত সালমিস্তার অস্ট্রিয়ানদের মনে এই বিশ্বাস অটুট রেখেছিল যে, সে তাদের বন্ধু এবং তাদের জন্যই সংগ্রাম করে যাবে আজীবন।
নেপোলিয়নের জন্য সালমিস্তার কী যে করেনি তার খোঁজ পাওয়া যায় না। অস্ট্রিয়ার বিপুল সেনাবাহিনীকে ঠেলে দিয়েছে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে। নেপোলিয়নও বরাবরই তার কার্যদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে সালমিস্তারকে পুরষ্কৃত করেছেন। কিন্তু তাও শেষ পর্যন্ত সালমিস্তারের একটি অনুরোধ তিনি রক্ষা করেননি। সালমিস্তার নেপোলিয়নের কাছে চেয়েছিল ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ সম্মানসূচক উপাধি। নেপোলিয়ন যদিও সালমিস্তারের সকল মনোবাসনা পূর্ণ করায় দৃঢ়কল্প ছিলেন, কিন্তু একজন গুপ্তচরকে শ্রেষ্ঠ সম্মানের ভূষণে ভূষিত করার পক্ষপাতী ছিলেন না।
গুপ্তচরবৃত্তির গল্প শেষ, French Secret Service এর পরিচালক নির্বাচিত হয়েছিল যদিও, সালমিস্তারের শেষ জীবন কেটেছে, তামাক ব্যবসায়ী হিসেবে। ইংরেজরা নেপোলিয়নকে পরাজিত করে সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়, আর সালমিস্তারের হয় কয়েক মাসের জেল। জেল থেকে এসেই শুরু করে তামাকের ব্যবসা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওটাই ছিল সালমিস্তারের কাজ।




নেপোলিয়নের হারানো সম্পদ…
ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের নাম শোনে নি, এমন মানুষ বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৭৬৯ সালের ১৫ আগস্ট ফ্রান্সের কর্সিকা দ্বীপে জন্ম নেয়া শিশুটিই এককালে হয়ে উঠেছিলো একটি দেশের সম্রাট। ১৮০৪ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত দশ বছর প্রথম মেয়াদে সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে আবার ১৮১৫ সালে কিছুদিনের জন্য সম্রাট হন নেপোলিয়ন।
নেপোলিয়ন বোনাপার্টনেপোলিয়ন বোনাপার্ট
নেপোলিয়ন কী করেছেন বা তিনি কে ছিলেন, এটা যদি কেউ না জানে, তবুও তার নানা উক্তি আমাদের ঠিকই পড়া লেগেছে বাংলা ও ইংরেজী দ্বিতীয় পত্রের নানা রচনা আর অনুচ্ছেদের কারণে। স্কুল-কলেজ জীবন শেষ করেছি অনেক দিন হলো। এখনো মনে পড়ে বাংলা দ্বিতীয় পত্র পড়ার সময় রচনার জন্য বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির বাণী খুঁজতাম। এগুলোর মাঝে নেপোলিয়নের বাণীগুলো বেশ প্রচলিত ছিলো। ‘শ্রমের মর্যাদা’ অথবা ‘অধ্যবসায়’ পড়ার সময় পড়তাম- ‘Impossible is a word to be found only in the dictionary of fools’। ‘সংবাদপত্র’ রচনায় এর ভয়াবহ দিক নিয়েও ছিলো তাঁর উক্তি- ‘Four hostile newspapers are more to be feared than a thousand bayonets’। এছাড়া বিভিন্ন সময়ই ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ছবির সাথে ক্যাপশন দেখেছি- ‘A picture is worth a thousand words’, যা আসলে নেপোলিয়নেরই উক্তি।
শিল্পীর তুলিতে তেইশ বছর বয়সী নেপোলিয়নশিল্পীর তুলিতে তেইশ বছর বয়সী নেপোলিয়ন
চমৎকার, উদ্দীপনামূলক এসব উক্তির জনক নেপোলিয়নের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে খুবই কষ্টের মাঝে। বন্দী করার পর তাকে আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। এখানেই এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ১৮২১ সালের ৫ মে মারা যান তিনি। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি ময়নাতদন্ত শেষে মৃত্যুর কারণ হিসেবে পাকস্থলীর ক্যান্সারের কথা জানান। পরবর্তীতে অবশ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয় যেখানে দাবি করা হয় যে, ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার পানীয়র সাথে আর্সেনিক প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে তাকে খুন করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০০৭-০৮ সালের দিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উড়িয়ে দিয়ে বলা হয় পেপটিক আলসার ও গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারই নেপোলিয়নের মৃত্যুর কারণ।
আমাদের আজকের কাহিনী শুরু হচ্ছে নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর থেকেই। সেই সাথে মনে রাখুন তার চিকিৎসকের নামটি- ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি।
ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চিফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি শিল্পীর তুলিতে মৃত্যুশয্যায় নেপোলিয়নশিল্পীর তুলিতে মৃত্যুশয্যায় নেপোলিয়ন নেপোলিয়নের ডেথ মাস্কনেপোলিয়নের ডেথ মাস্ক নেপোলিয়নের সমাধিস্তম্ভনেপোলিয়নের সমাধিস্তম্ভ
ডাক্তার ফ্রাঙ্কোইস কার্লো অ্যান্টোম্মার্চি ১৭৮০ সালের ৫ জুলাই ফ্রান্সের কর্সিকা দ্বীপের মর্সিগ্লিয়া কমিউনে জন্ম নেন। ১৮১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হওয়ার নিয়োগপত্র পান। এরপরই তিনি চলে যান সেখানে। নেপোলিয়নের মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি এ পদেই বহাল ছিলেন। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রে অ্যান্টোম্মার্চির দক্ষতায় খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না নেপোলিয়ন। ফলে বেশ কয়েকবারই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন তিনি। আচ্ছা, একবার চিন্তা করুন তো- আপনার অফিসের বস যদি আপনাকে বারবার বলে, “You are fired!”, কিন্তু তবুও দুর্ব্যবহার করে আপনাকে রেখেই দেয়, তাহলে তার প্রতি কি আপনার কোনো শ্রদ্ধাবোধ অবশিষ্ট থাকবে? শেষের এ কাল্পনিক অংশটুকুর কথা মাথায় রাখুন।
ময়নাতদন্তের টেবিলে পড়ে আছে নেপোলিয়নের নিথর দেহ। সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেপোলিয়নের বাড়িতেই সারা হয়েছিলো এ আনুষ্ঠানিকতা। সেদিন লাশটির চারদিকে ছিলেন মোট ১৭ জন মানুষ। এদের মাঝে ছিলেন কয়েকজন ব্রিটিশ ও ফরাসী কর্মকর্তা, ৭ জন ব্রিটিশ ডাক্তার, নেপোলিয়নের দুজন সহকারী, ফাদার আঞ্জে ভিগনালি এবং আলী নামক এক ভৃত্য। এদের সকলের সামনেই নেপোলিয়নের যকৃৎ, পাকস্থলী ও পুরুষাঙ্গ (!) কেটে ইথাইল অ্যালকোহল ভর্তি এক জারে রাখলেন অ্যান্টোম্মার্চি। অনেকেই অবশ্য ধারণা করেন যে, অ্যান্টোম্মার্চি ইচ্ছে করে পুরুষাঙ্গটি কাটেন নি। বরং দুর্ঘটনাবশতই ওটা কেটে যায়। আবার অনেকেই অ্যান্টোম্মার্চির প্রতি নেপোলিয়নের পুরনো বিদ্বেষের গন্ধও এখানে খুঁজে পান। আসল কারণ যা-ই হোক, যা যাওয়ার তা তো গেলোই!
নেপোলিয়নের জীবনী লেখক রবার্ট অ্যাসপ্রে অবশ্য দাবি করেছেন অন্য কথা। তার মতে, অ্যান্টোম্মার্চি আর ভিগনালি হয়তো লাশটি নিয়ে কিছু সময় আলাদা থাকতে পেরেছিলেন। তখনই এ ঘটনাটি ঘটতে পারে। ওদিকে ১৮৫২ সালে প্রকাশিত এক স্মৃতিকথায় আলী জানায় যে, সেদিন ময়নাতদন্তের এক ফাঁকেই সে এবং ভিগনালি নেপোলিয়নের শরীরের কিছু অংশ কেটে ফেলে। এ ‘কিছু অংশ’ কি নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গকেও বোঝাচ্ছে কিনা তা অবশ্য নিশ্চিত না। তবে অনেকের মতে এ সময়ই আসলে ওটা কাটা হয়ে গিয়েছিলো।
ওদিকে নেপোলিয়নের ময়নাতদন্তের কিছু সময় পরই প্যারিসে গুঁজব ছড়িয়ে পড়ে যে, ডাক্তারের সহকারীরা রক্তাক্ত বিছানার চাদর, দাঁত, নেইল ক্লিপিং, পাঁজরের কিছু টুকরা, চুলের গোছা এবং নাড়ী-ভুড়ি গোপনে সরিয়ে ফেলেছে। অ্যান্টোম্মার্চি নিজেও নেপোলিয়নের ডেথ মাস্ক ও অন্ত্রের দু’টুকরো নিয়ে সটকে পড়েন। তিনি এগুলো লন্ডনে তার বন্ধুদের কাছে রেখে যান।
আবার ফিরে আসা যাক ভিগনালির কাছে। নেপোলিয়নের শেষকৃত্যানুষ্ঠান তিনিই পরিচালনা করেছিলেন। উইল মারফত তিনি ১,০০,০০০ ফ্রাঙ্ক লাভ করেন। এছাড়া সম্রাটের ছুরি, কাটা চামচ, একটি রুপার কাপ এবং আরো কিছু ব্যক্তিগত জিনিসও তিনি পান। প্রায় দু’দশক পর ব্রিটিশ সরকার নেপোলিয়নের দেহটি (অথবা দেহাবশেষ) প্যারিসে নিয়ে আসার অনুমতি দেয়। আর তখনই এক অকাজ করে ভিগনালির আত্মীয়-স্বজনেরা। তারা নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গটি রেখে দেয় নিজেদের কাছে!
১৯১৬ সাল পর্যন্ত নেপোলিয়নের ব্যবহার্য বিভিন্ন দ্রব্যাদি ও শরীরের অংশবিশেষ ভিগনালির বংশধরদের কাছেই থাকে। ১৯১৬-তে তারা এগুলো নিলামে তোলে। সেখানে নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গের ক্যাটালগে লেখা ছিলো, ‘A mummified tendon taken from [Napoleon’s] body during postmortem’। এক ব্রিটিশ বইয়ের ফার্ম সেগুলো কিনে নেয়। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে তারা এগুলো ফিলাডেলফিয়ার এ.এস.ডব্লিউ. রোসেনবাকের কাছে ২,০০০ ডলারে বিক্রি করে দেয়। এর কয়েক বছর পর রোসেনবাক নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অফ ফ্রেঞ্চ আর্টে চমৎকার নীল রঙের মরক্কো চামড়া (ছাগলের ছাল থেকে তৈরি নরম, পাকা চামড়া) ও মখমলের চাদরে পুরুষাঙ্গটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। তৎকালীন এক পত্রিকা এ নিয়ে লিখেছিলো, ‘In a glass case [spectators] saw something looking like a maltreated strip of buckskin shoelace or shriveled eel’।
১৯৬৯ সালে সংগ্রহগুলো নিয়ে আসা হয় লন্ডনে। কিন্তু নেপোলিয়নের পুরুষাঙ্গটি তখন বিক্রি হয়নি। আট বছর পর প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক নিলাম থেকে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. জন কে. ল্যাটিমার প্রায় ২,৯০০ ডলারে পুরুষাঙ্গটি কিনে নেন। তিনি ছিলেন আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় একজন ইউরোলজিস্ট। কলাম্বিয়া প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতাল থেকে এক্স-রে করে তিনি নিশ্চিত হয়ে নেন যে, এটি আসলেই একটি পুরুষাঙ্গ। এরপর তিনি এটি নিয়ে চলে আসেন নিউ জার্সিতে তার বাসায়। সেখানে ২০০৭ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত এটি তার খাটের নিচে রাখা সুটকেসেই বন্দী ছিলো। পরবর্তীতে তার মেয়ে এটি বিক্রির জন্য ১,০০,০০০ ডলার দাবি করেন। এটি তিনি শুধু লেখক Tony Perrottet-কেই দেখিয়েছেন যিনি দেখার পর বলেছেন, ‘Certainly small, shrunken to the size of a baby’s finger, with white shriveled skin and desiccated beige flesh’।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ ভুলেও বিখ্যাত হতে যাবেন না! বিখ্যাত হয়েছেন, তো হারিয়েছেন! কী হারাবেন? সেটা তো নিলামকারীরাই জানাবে…




অটোম্যান সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়ঃ ওসমানের স্বপ্ন
তের শতকের শেষ ভাগে ওঘুজ তুর্কী গোত্র নেতা ওসমান গাজীর হাত ধরে আনাতোলিয়ার উত্তর-পশ্চিমাংশে যাত্রা শুরু করে অটোম্যান সাম্রাজ্য। ইতিহাস বিখ্যাত এ সাম্রাজ্য পৃথিবীর বুকে টিকে ছিলো প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে। চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তারা ইউরোপের দিকে অগ্রসর হয় এবং বলকান অঞ্চল জয়ের মাধ্যমে একটি আন্তঃমহাদেশীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পনের শতকের মাঝামাঝি সময়ে কনস্টান্টিনোপল জয়ের মাধ্যমে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতন ঘটান অটোম্যান সুলতান দ্বিতীয় মেহ্‌মেদ।
অটোম্যান সাম্রাজ্য তার ক্ষমতার সোনালী সময়টি পার করেছে অবশ্য ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের সময়কালটিতে। তখন তাদের নেতা হিসেবে সিংহাসনে আসীন ছিলেন সুলতান প্রথম সুলাইমান। তখন এটি একটি বহুজাতিক, বহুভাষিক সাম্র্যাজ্যে পরিণত হয়েছিলো। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ, মধ্য ইউরোপের কিছু অঞ্চল, পশ্চিম এশিয়া, ককেশাস অঞ্চল, উত্তর আফ্রিকা এবং হর্ন অফ আফ্রিকা বলে পরিচিত উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার উপদ্বীপের উপর ছিলো তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
সতের শতকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতিসতের শতকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি
আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে অবশ্য দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করে। প্রায় সাড়ে চারশ বছর বয়সী এ সাম্রাজ্যেটিও যেন তখন বয়সের ভারে ন্যুজ হওয়া শুরু করেছিলো। ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ রাশিয়ান সাম্রাজ্য ও হ্যাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের তুলনায় তাদের সামরিক শক্তি ততদিনে হ্রাস পাওয়া শুরু করেছিলো। এরই ফলস্বরুপ আঠারো শতকের শেষ এবং উনিশ শতকের শুরুর দিকে বেশ কিছু যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে হয় তাদের।
পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজেদের হারানো গৌরব ফিরে পাবার আশায় জার্মানীর সাথে বন্ধুত্বের হাত মেলায় তারা। অবশ্য ততদিনে অটোম্যান সাম্রাজ্যের ঘরের ভেতরেও আগুন লেগে গিয়েছিলো। বিশেষ করে অটোম্যানদের হাত থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া আরব বিদ্রোহ বেশ ভালোই ঝামেলা তৈরি করেছিলো সাম্রাজ্যটির অগ্রযাত্রার পথে। আর্মেনিয়ান, অ্যাসাইরিয়ান ও গ্রীকদের উপর চালানো গণহত্যার কথা এক্ষেত্রে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় অটোম্যান সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত হবার পথে চূড়ান্ত ভূমিকাটি পালন করলো। এরপর তাদের অধীনে থাকা বিভিন্ন অঞ্চলই হাতছাড়া হয়ে যেতে থাকে। প্রায় ছয়শ বিশ বছরের বৃদ্ধ অটোম্যান সাম্রাজ্যের জন্য শেষ পর্যন্ত কবর খুঁড়েছিলো তুর্কীদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তুর্কীদের বিজয়ই বিশ্বে অটোম্যান সুলতানী শাসন ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটিয়ে দেয়, পতন ঘটায় ইসলামিক খেলাফতের। সেই হিসেবে অটোম্যান রাজবংশের দ্বিতীয় আব্‌দ আল-মাজিদকেই বলা যায় এখন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের সর্বশেষ খলিফা।
দ্বিতীয় আব্‌দ আল-মাজিদদ্বিতীয় আব্‌দ আল-মাজিদ
দীর্ঘ এ সময়কালে নানা ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন, জয়-পরাজয়ের মাঝে দিয়ে গিয়েছে সাম্রাজ্যটি। ছয় শতাব্দী জুড়ে বিস্তৃত এ শাসনামলে মোট ছত্রিশজন সুলতান বসেছিলেন অটোম্যানদের নেতার আসনে। অভ্যুদয়, অরাজকতা, বিস্তৃতি, রুপান্তর, নিশ্চলাবস্থা ও পুনর্গঠন, আধুনিকীকরণ ও অবসান- এ সাত ভাগে ভাগ করা যায় ছত্রিশ সুলতানের শাসনামলকে।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়
অটোম্যান সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়ের সময়কে মোটামুটি ১২৯৯ সালে এর প্রতিষ্ঠা লাভ থেকে শুরু করে ১৪৫৩ সালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় পর্যন্ত বিস্তৃত বলে ধরে নেয়া যায়। এ সময়েই পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সুলতানের শাসনামলে বিকশিত হতে থাকে অটোম্যান সাম্রাজ্য। শুরুতে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রাজ্যের মতো অটোম্যান সাম্রাজ্যও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মূলত স্থানীয় নানা সেনাপতি ও সামন্ত রাজ্যের শাসনের উপর নির্ভরশীল ছিলো। ধীরে ধীরে সময় যেতে থাকে, পরিবর্তিত হতে থাকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের অবস্থাও। সামরিক-অর্থনৈতিক উন্নতি তাদের রাজ্য বিস্তারের পক্ষে আরো সহায়ক ভূমিকা পালন করতে থাকে।
এ সময়ে অটোম্যানদের সফলতার পেছনে একক কোনো কারণকে মূল নিয়ামক হিসেবে দাঁড়া করাতে নারাজ ঐতিহাসিকেরা। বরং তাদের মতে পরিবর্তিত নানা পরিবেশের সাথে দ্রুত নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারাই ছিলো নবগঠিত রাজ্যের সফলতার মূল কারণ। পনের শতকের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে তৎকালীন অটোম্যান সুলতান যেন প্রকৃত সুলতানির স্বাদ পেলেন। এতদিন ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্যের সুলতানের হাতে তখন কেন্দ্রের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব এসেছিলো। আর এর সুফল ভোগ করা প্রথম সুলতান হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন সুলতান দ্বিতীয় মেহ্‌মেদ।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়কালীন সুলতানদের মাঝে একে একে সিংহাসনে এসেছেন ওসমান গাজী, ওরহান গাজী, প্রথম মুরাদ ও প্রথম বায়েজিদ। আজকের মূলত ওসমান গাজীকে ঘিরেই সাজানো হয়েছে আমাদের পুরো লেখা।
ওসমান গাজী
অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওসমান গাজী। ১২৯৯ সালে তার হাত ধরে যাত্রা শুরু করা অটোম্যান সাম্রাজ্যের সূর্য ১৯২২ সালে সুলতানি শাসনের বিলোপ সাধনের মধ্য দিয়ে অস্ত যায়। কারো কারো মতে ১৯২৩ সালে রিপাবলিক অফ টার্কির অভ্যুদয়ের মাঝ দিয়ে, আবার কারো মতে ১৯২৪ সালে খেলাফতের পতনের মাঝ দিয়ে পতন ঘটে ওসমান গাজীর প্রতিষ্ঠিত অটোম্যান সাম্রাজ্যের।
arolsen_klebeband_01_449_2ওসমান গাজীর কাল্পনিক খোঁদাই করা প্রতিমূর্তি
দুঃখজনক ব্যাপার হলো- ওসমান গাজীর শাসনামল সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছে। তার মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পর ঐতিহাসিকেরা তার জীবনী রচনায় হাত দিয়েছিলেন। তাই ওসমান গাজীর জীবন সম্পর্কে প্রচলিত কথাগুলোর কোনটা বাস্তব আর কোনটা কাল্পনিক, সেগুলোর মাঝে পার্থক্য করা ঐতিহাসিকদের জন্য বেশ কঠিনই বটে।
ওসমান গাজী কবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই বিষয়েও রয়েছে বিতর্ক। ১২৫৪, ১২৫৫ কিংবা ১২৫৯- এ তিন বছরের যেকোনো একটিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। তার জন্মের সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটু কথা না বললেই নয়।
মোটামুটি ৩৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে যাত্রা শুরু করা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বয়স ততদিনে নয়শ বছর ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। তখন কনস্টান্টিনোপল ছিলো এর রাজধানী। স্বাভাবিকভাবেই অতীতের জৌলুশ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিলো সাম্রাজ্যটি। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে চতুর্থ ক্রুসেডের সময় ল্যাটিন নাইটদের হাতে কনস্টান্টিনোপলের পতন যেন বাইজান্টাইনদের দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পূর্ব পাশে ছিলো সেল্‌জুক সাম্রাজ্য। পূর্ব এশিয়া মাইনর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, আর্মেনিয়া, পারস্যের কিছু অংশ এবং পশ্চিম তুর্কিস্তান ছিলো এ সেল্‌জুক সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। তবে মোঙ্গল অধিপতি চেঙ্গিস খানের আক্রমণে এ সেল্‌জুকদের অবস্থাও হয়ে পড়েছিলো বেশ নাজুক। শেষ পর্যন্ত কোজাদাঘের যুদ্ধে মোঙ্গলদের কাছে চূড়ান্ত পরাজয়ে সেল্‌জুকরা তাদের বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে সেল্‌জুকদের শাসন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার আগ্রহ ছিলো না মোঙ্গলদের। তাই শুধুমাত্র তাদের কাছ থেকে বার্ষিক কর নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতো তারা। একদিকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, অন্যদিকে সেল্‌জুকদের পরাজয় বরণ এবং সবশেষে মোঙ্গলদেরও কোনো আরোপিত শাসন ব্যবস্থা না থাকায় এশিয়া মাইনরে কেমন যেন এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো।
এই সেল্‌জুক ও বাইজান্টাইনদের সীমান্তবর্তী এক এলাকায় অনেক জাতি-ধর্ম-বর্ণের লোকের বাস ছিলো। এখানে যেমন শহুরে সভ্য লোকেরা থাকতো, তেমনি সন্ধান মিলতো যাযাবরদেরও। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মোঙ্গলদের আক্রমণে পূর্বাঞ্চল থেকে সেখানে আসা লোকদের অনেকেই ছিলো তুর্কমান বংশীয়। কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ সেখানে ছিলো না বললেই চলে। পুরো এলাকাটি নানা ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে একেক অংশ একেক নেতা নিয়ন্ত্রণ করতো।
এমনই এক নেতার নাম ছিলো আর্তুগ্রুল। তিনিই ছিলেন ভবিষ্যৎ অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমান গাজীর বাবা। একদিন আর্তুগ্রুল তার ছোট দলটি নিয়ে এশিয়া মাইনরের পশ্চিম দিক বরাবর যেতে যেতে একদল মানুষকে যুদ্ধরত অবস্থায় দেখতে পান। সেখানে একটি দলে সৈন্যসংখ্যা ছিলো তুলনামূলক কম। এর্তোগ্রাল আগপিছ না ভেবে সেই ছোট দলের সাথে ভিড়ে গেলেন নিজের দলটি নিয়ে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে সেই ছোট দলটি জয়ীও হয়ে গেলো। এবার আসলো পরিচয়ের পালা। আর্তুগ্রুল জানতে পারলেন যে, ছোট দলটি আসলে ছিলো সেল্‌জুক সুলতান আলাউদ্দীনের। আর পরাজিত পক্ষটি ছিলো মোঙ্গল আক্রমণকারীদের। আর্তুগ্রুলের এমন কাজে আলাউদ্দীন খুবই খুশী হলেন। তাই তাকে বাইজান্টাইন সীমান্তবর্তী সগুত এলাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে গেলেন তিনি। বাইজান্টাইনদের হাত থেকে সীমান্তে সেল্‌জুক সাম্রাজ্যকে রক্ষা করাই ছিলো আর্তুগ্রুলের মূল দায়িত্ব। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে যান তিনি। ১২৮৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন আর্তুগ্রুল। তার মৃত্যুর পর গোষ্ঠীর দায়িত্ব এসে বর্তায় ওসমান গাজীর হাতে।
ওসমান গাজীর শাসক জীবন নিয়ে কিছু বলার আগে তার সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত যে কাহিনীটি আছে, যার সত্য বা মিথ্যা নির্ণয় সম্ভব হয় নি আজও, সেই সম্পর্কে একটু জেনে নেয়া যাক।
ওসমানের স্বপ্ন
তরুণ বয়স থেকেই সবার কাছে ধর্মভীরু হিসেবে পরিচিত ছিলেন ওসমান। একসময় তিনি শেখ এদেবালি নামক এক ধর্মগুরুর ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের গভীরতায় মুগ্ধ হয়ে নিয়মিত তার সাথে দেখা করতে যেতেন। এস্কিসেহির শহরের এক গ্রাম ইতবার্নুতে এদেবালির সাথে দেখা করতে যেতেন ওসমান। একদিন এদেবালির সাথে দেখা করতে গিয়ে তার মেয়ে মাল হাতুনের সাথে ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে যায় তার। মাল হাতুনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে ভালোবেসে ফেলেন ওসমান। ফলে এদেবালির বাড়িতে তার যাওয়া-আসার মাত্রাও বেড়ে যায়। একসময় তিনি এদেবালিকে তার মনের কথা খুলে বলেন। কিন্তু ওসমানের সাথে নিজের সামাজিক পদমর্যাদা কাছাকাছি না হওয়ায় এদেবালি এ বিয়েতে রাজি হন নি।
এমন প্রত্যাখ্যান সহজে মেনে নিতে পারেন নি তরুণ ওসমান গাজী। তাই প্রায়ই বন্ধুদের কাছে নিজের হতাশা ব্যক্ত করতেন তিনি। সমস্যা হলো- তার কাছে মাল হাতুনের রুপের বর্ণনা শুনতে শুনতে তার বন্ধুদের মাঝেও মেয়েটির প্রতি আকর্ষণ জন্মাতে শুরু করে। এদেরই একজন ছিলেন এস্কিসেহিরের এক তরুণ নেতা। তিনিও এদেবালির কাছে মাল হাতুনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তার ভাগ্যেও ওসমানের মতো প্রত্যাখ্যান জুটলো। কিন্তু একজন নেতাকে এভাবে ফিরিয়ে দিয়ে এদেবালি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন। তাই নিজের বাসা পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
ওদিকে এস্কিসেহিরের সেই নেতার মনে আস্তে আস্তে ওসমান সম্পর্কে বিরুপ মনোভাব জন্মাতে শুরু করে। একসময় তিনি তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখা শুরু করে দেন। একদিন ওসমান তার ভাই গোকাল্পকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী ইনয়ানীর জমিদারের দুর্গে ঘুরতে গিয়েছিলেন। তখনই সেই নেতা তার আরেক বন্ধু মাইকেলকে নিয়ে সেই দুর্গ ঘেরাও করে বসেন এবং জমিদারকে বলেন ওসমানকে তার হাতে তুলে দিতে। কিন্তু অতিথির এমন অমর্যাদা করতে রাজি হচ্ছিলেন না সেই জমিদার। তাই শত্রুরা দুর্গের বাইরে অবরোধ করে বসে। পরবর্তীতে ওসমান ও তার ভাইয়ের বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণে তাদের সেই প্রতিরোধ ভেঙে যায়। তরুণ নেতা কোনোমতে জান নিয়ে পালাতে সক্ষম হলেও ধরা পড়ে যান মাইকেল। পরবর্তীতে অবশ্য এ মাইকেলের সাথেই ওসমানের চমৎকার বন্ধুত্ব হয়েছিলো।
এভাবে যুদ্ধ জয়ের ফলে ওসমান একজন বন্ধু পেলেন ঠিকই, কিন্তু মনের মানুষটি তখনো ছিলো তার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এভাবেই কেটে যায় দুটি বছর। দুশ্চিন্তায় ওসমানের স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটে।
এতকিছুর পরেও এদেবালির সাথে ওসমানের যোগাযোগ ঠিকই ছিলো। এক রাতের কথা। এদেবালির বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ওসমান গাজী। মাল হাতুনকে নিয়ে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। ঘুমের মাঝেই তিনি এমন এক স্বপ্ন দেখেন ইতিহাসে বেশ বিখ্যাত হয়ে আছে।
“ওসমান এবং এদেবালি এক জায়গায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই এদেবালির বুকের ভেতর থেকে একটি পূর্ণ চাঁদ বের হয়ে তা আবার ধীরে ধীরে ওসমানের বুকের ভেতর হারিয়ে যায়।
এরপরই বেশ চমৎকার একটি গাছ ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করে। তার যেন আর থামার নাম নেই, বড় হচ্ছে তো হচ্ছেই। এভাবে গাছটির শাখা-প্রশাখা, ছায়া পৃথিবীর দিগন্তের প্রায় তিন ভাগকে ঢেকে ফেলার আগপর্যন্ত বড় হতেই থাকে। এ গাছের নিচে ছিলো চারটি পাহাড়- ককেশাস, অ্যাটলাস, টোরাস ও হীমাস। দেখে মনে হচ্ছিলো যে, এ পাহাড়গুলোর উপর ঠেস দিয়েই দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল সেই গাছ। গাছটির গোড়া থেকে বেরিয়ে এসেছিলো টাইগ্রিস, ইউফ্রেটিস, দানিয়ুব ও নীল নদ। বড়-ছোট পাল তোলা অনেক জাহাজই ঘুরে বেড়াচ্ছিলো সেসব জায়গায়।
মাঠগুলো ভরে গিয়েছিলো খাদ্যশস্যে, পাহাড়গুলোর আশেপাশেও ছিলো বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। পাহাড়গুলোর মধ্যবর্তী এলাকা জুড়ে ছিলো জাঁকজমকপূর্ণ শহরের উপস্থিতি। অগণিত গম্বুজ, পিরামিড, ওবেলিস্ক, মসজিদের মিনার আর সুউচ্চ টাওয়ার জানান দিচ্ছিলো সেই শহরটির আভিজাত্যের মাত্রা। তাদের শীর্ষভাগে শোভা পাচ্ছিলো এক অর্ধচন্দ্র। দূর থেকে ভেসে আসছিলো মুয়াজ্জিনের আজানের সুমধুর ধ্বনি। হাজার হাজার নাইটিঙ্গেলের মনমাতানো ডাকের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো সেই আজানের সুর।
মিষ্টি কন্ঠের অসংখ্য পাখির সমাবেশ ঘটেছিলো সেখানে। তাদের কিচিরমিচির ডাক যেন মাতাল করে ছাড়ছিলো গাছটিকেও। গাছটির প্রতিটি পাতাই ছিলো তুর্কীদের পুরনো আমলের খঞ্জরের মতো দেখতে। হঠাৎ করেই বাতাসের বেগ যেন বেড়ে গেলো। আর সেই সাথে পাতাগুলোর তীক্ষ্ম দিকগুলোও বিশ্বের নানা শহরের দিকে মুখ করে ঘুরে গেলো। তবে সেগুলো বিশেষভাবে কনস্টান্টিনোপলের দিকে মুখ করে ঘুরে ছিলো। দুটো সাগর ও দুটো মহাদেশের মিলনস্থলে অবস্থিত সেই শহরটিকে দুটো স্যাফায়ার ও দুটো এমারেল্ডের মাঝে বসানো একটি ডায়মন্ডের মতো লাগছিলো। এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান পাথরই যেন হয়ে উঠেছিলো সেটি। ওসমান গাজী যখন সেই দৃষ্টিনন্দন পাথর বসানো আংটি নিজের আঙুলে ঢোকাতে যাচ্ছিলেন, তখনই তার ঘুম ভেঙে যায়।”
ঘুম থেকে উঠে ওসমান এদেবালিকে তার স্বপ্নের কথা জানালেন। এদেবালি বুঝলেন যে, এটি কোনো সাধারণ স্বপ্ন নয়। বরং এর মাঝেই লুকিয়ে আছে ওসমান ও তার মেয়ে মাল হাতুনের এক হওয়া থেকে শুরু করে ওসমানের ভবিষ্যতে অনেক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির মালিক হওয়ার ইঙ্গিত। এরপর তাই আর আপত্তি করলেন তিনি। নিজের পছন্দের শিষ্য দরবেশ তোরুদকে ডেকে এনে ওসমান আর মাল হাতুনের বিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করেন তিনি।
এবার আসা যাক আসল কথায়। এতক্ষণ ধরে ওসমানের এত বড় স্বপ্নের কথা পড়ে অনেকেরই অবিশ্বাসে ভ্রু কুঁচকে গেছে নিশ্চিত। এটাই স্বাভাবিক। কারণ ওসমানের বিখ্যাত এ স্বপ্নের কথা কিন্তু লেখা হয়েছিলো তার মৃত্যুর একশ বছরেরও বেশি সময় পরে। তাই ধারণা করা হয় যে, এ স্বপ্নের কথা আসলে কোনো উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। অটোম্যান সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনের ইতিহাসকে আরো মহিমাময় করে তুলতে এবং সেই সাথে ওসমান গাজীর অর্জন ও সাফল্যকে আরো চমৎকারভাবে সবার কাছে তুলে ধরতেই এ কল্পনার আশ্রয় নেয়া হয়েছিলো। অবশ্য অটোম্যান ঐতিহাসিকেরা সব সময়ই তাদের সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনের এ ইতিহাসটিকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সবার সামনে তুলে ধরতেন।
তবে এটা সত্য যে, শেখ এদেবালি নামে আসলেই এক ব্যক্তি ছিলেন যার সাথে ওসমানের খাতিরের সূত্র ধরেই তার মেয়ে মাল হাতুনের সাথে ওসমানের বিয়ে হয়। তবে মাইকেল ও দরবেশ তোরুদের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ আছে কিছু কিছু ইতিহাসবিদের।
বিজয় অভিযান
১২৮৮ সালে বাবার স্থলাভিষিক্ত হন ওসমান গাজী। তার বাবা নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেলেও কখনো আশেপাশের এলাকাগুলো জয়ের দিকে নজর দেন নি। অন্যদিকে গোত্র প্রধানের দায়িত্ব নিয়েই ওসমান দেখতে পেলেন যে, আশেপাশের অন্যান্য গোত্র প্রধানরা তাদের এলাকা বিস্তারে সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন। এসব দেখে তিনি নিজেও তার এলাকার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তুতি নিতে থাকলেন।
শিল্পীর কল্পনায় ওসমান গাজী
১২৯৯ সালে ওসমান যখন মোঙ্গল সাম্রাজ্যে বার্ষিক কর পাঠালেন না, তখনই আসলে প্রতীকী অর্থে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৩০০ সাল থেকেই একে একে বিভিন্ন অঞ্চল জয় করতে শুরু করে ওসমান গাজীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী। সাকারয়া নদীর পশ্চিমাঞ্চল, এস্কিসেহিরের দক্ষিণ ভাগ, অলিম্পাস পর্বত ও মারমারা সাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল তার সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। এস্কিসেহির, বিলেজিক, ইনোনু থেকে শুরু করে ইয়েনিশেহিরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দূর্গ ও নগর নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় ওসমান বাহিনী। নবগঠিত অটোম্যান রাজ্যের রাজধানী হিসেবে বেছে নেয়া হয় ইয়েনিশেহিরকে। বার্সা, নিকাইয়া কিংবা নিকোমিডিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত নগরগুলো দখল করার মতো শক্তি অবশ্য তখনো অর্জন করতে পারে নি তার বাহিনী।
অলিম্পাস পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত বার্সা ছিলো বেশ সুরক্ষিত এক নগরী। এর চারদিক ছিলো উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেই সাথে বিভিন্ন দূর্গ ও প্রতিরক্ষা টাওয়ার প্রতিনিয়ত এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলেছিলো। ১৩০৮ সালে মারমারা সমুদ্রে পৌঁছে বার্সার পার্শ্ববর্তী স্থলভূমি দখলে নিয়ে তাদেরকে স্থলপথে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় ওসমান গাজীর বাহিনী। অবশ্য তখনও মুদান্‌য়া বন্দর দিয়ে বার্সার অধিবাসীরা দরকারি রসদ আনা-নেয়া ও অন্যান্য যোগাযোগের কাজ চালাতো। সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে নগরটি দখল করার সুযোগ না থাকায় ওসমান তার বাহিনীকে এর চারদিকে অবরোধ অব্যাহত রাখতে বলেন। ১৩২১ সালে শেষ পর্যন্ত ওসমানের বাহিনী মুদান্‌য়া বন্দরের দখল নিতে সক্ষম হলে বার্সা বাইরের জগত থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশ্য বার্সার অধিবাসীরাও এত সহজে হার মানতে রাজি ছিলো না। তাই এরপরেও আরো পাঁচ বছর পর্যন্ত তারা মাথা নত করে নি ওসমান গাজীর বাহিনীর কাছে। শেষ পর্যন্ত ১৩২৬ সালের ৬ এপ্রিল তারা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়।
যুদ্ধযাত্রায় ওসমানযুদ্ধযাত্রায় ওসমান
বার্সা জয় ছিলো অটোম্যান সাম্রাজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। এতদিন ধরে নানা যুদ্ধে ওসমান গাজী জয় পেলেও সেগুলো ছিলো বিভিন্ন বর্বর জাতির বিরুদ্ধে জয়। অন্যদিকে বার্সা ছিলো তৎকালীন এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এ জয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মানচিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠলো অটোম্যানরা।
800px-osman_i_area_mapওসমান গাজীর জীবনকালে অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি
ততদিনে অবশ্য বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছিলেন ওসমান গাজী। ১২৫৪ খ্রিষ্টাব্দকে তার জন্ম সাল ধরে নিলে তখন তার বয়স ছিলো ৭২ বছর। বয়সজনিত নানা অসুস্থতার জন্য তখন বড় ছেলে ওরহান গাজীর হাতেই নিজ বাহিনীর দায়িত্ব অর্পন করেছিলেন তিনি। অবশ্য সৌভাগ্যই বলতে হবে তার। কারণ মৃত্যুর আগে বার্সা দখল হওয়ার সুখবরটি ঠিকই জেনে যেতে পেরেছিলেন তিনি। কথিত আছে যে, মৃত্যুর আগে তিনি ওরহানকে উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন রাজ্য পরিচালনার ব্যাপারে-
“বাবা, আমি মারা যাচ্ছি। আমি কোনো দুঃখ ছাড়াই মারা যাবো। কারণ তোমার মতো একজনকে আমি উত্তরসূরি হিসেবে রেখে যাচ্ছি। ন্যায়পরায়ণ হয়ো, সদগুণকে ভালোবেসো আর দয়াশীল হয়ো। তোমার অধীনস্ত সবাইকেই সমান নিরাপত্তা দিও। আর নবীজীর (সাঃ) প্রচারিত আইনকে আরো প্রসারিত করো। দুনিয়াতে এগুলোই একজন রাজপুত্রের দায়িত্ব এবং এগুলোই তাদের জীবনে জান্নাতের আশীর্বাদ বয়ে আনে।”
সদ্য সাম্রাজ্যভুক্ত বার্সা নগরীতে তাকে কবর দিতে বলেছিলেন ওসমান। সেই সাথে একে অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজধানী বানানোর নির্দেশও দিয়ে যান তিনি। কিছুকাল পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমান গাজী। শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাকে বার্সাতেই কবর দেয়া হয়।
ওসমান গাজীর কবরওসমান গাজীর কবর
মৃত্যুকালে বাইজান্টাইন ও মোঙ্গল- এ উভয়পক্ষের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত এক স্বাধীন রাজ্য রেখে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন ওসমান গাজী। বাইজান্টাইনদের দুর্বলতা অনুধাবন করতে পেরে তিনি তাদের উপর বিভিন্ন সময়ই আক্রমণ চালিয়েছিলেন। তার যুদ্ধ জয়ের অন্যতম কারণ ছিলো যে, তিনি বিভিন্ন গোত্রপতীদেরকে তার যুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে এক পতাকাতলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। অধিকাংশ ইতিহাসবিদও এ ব্যাপারে একমত পোষণ করে থাকেন।
ব্যক্তি ও শাসক হিসেবে সকলের কাছেই বেশ সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন ওসমান গাজী। জনগণের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ ও সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখার ব্যাপারেও সুনাম ছিলো তার। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই তার কাছে সমমর্যাদা পেতো। তারপরেও ওসমান গাজী সম্পর্কে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে যার সত্যতা অবশ্য প্রশ্নবিদ্ধ। একবার তিনি নাকি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রীক দূর্গে আক্রমণ চালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার চাচা দুন্দার এমন চিন্তা-ভাবনাকে বেশ বিপদজনক মনে করে তাকে এসব থেকে দূরে থাকার উপদেশ দেন। চাচার এমন উপদেশকে নিজের সিংহাসন ও মর্যাদার প্রতি এক প্রকার হুমকি হিসেবেই দেখেছিলেন তিনি। তাই চুপচাপ ধনুকটা তুলে নিয়ে একটি তীর ছুঁড়ে চাচার জীবন সাঙ্গ করে দিয়েছিলেন ওসমান গাজী।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমান গাজীর জীবনী এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী লেখায় থাকবে দ্বিতীয় সম্রাট ওরহান গাজীকে নিয়ে বিস্তারিত কথাবার্তা। ততদিন পর্যন্ত সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করে আজ এখানেই বিদায় নিচ্ছি।





অটোম্যান সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়ঃ দ্বিতীয় সুলতান ওরহান গাজী
শুরুর কথা
অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমান গাজীর প্রথম সন্তানের নাম ছিলো ওরহান গাজী। ১২৮১ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়কালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দাদা আর্তুগ্রুল শখ করে নাতির নাম রেখেছিলেন ওরহান।
বাবা-মায়ের আদর-শাসনে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন ওরহান গাজী। তার শৈশব ও কৈশোর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় নি। সুঠাম দেহের অধিকারী ওরহান বাবা ওসমান গাজীর বেশ প্রিয় ছিলেন। ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হয়তো তিনি ছেলেকে সবসময় নিজের সাথে সাথে রাখতেন, হাতে-কলমে শেখাতে চাইতেন একজন সুলতানের নানা দায়িত্ব-কর্তব্য। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, বিশ বছর বয়সী ওরহানকে একবার ওসমান গাজী ছোট প্রদেশ নাকিহিরের দেখাশোনা করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ১৩০৯ সালে তিনি সেখান থেকে রাজধানী সগুতে ফিরে আসেন।
Osman_Gazi2ওসমান গাজী
১৩২৬ সালে সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান ওসমান গাজী। এরপরই তার স্থলাভিষিক্ত হন ওরহান গাজী, নাম লেখান উদীয়মান অটোম্যান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সুলতান হিসেবে। অত্যন্ত সহৃদয়, ক্ষমাশীল, ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন ওরহান গাজী। ধর্মশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞগণ ছিলেন তার বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র। চারিত্রিক দৃঢ়তা, ধৈর্যশীলতা, আশেপাশের লোকজনের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার মতো গুণাবলী অল্প সময়ের মাঝেই ওরহানকে জনতার হৃদয়ে পাকাপোক্ত আসন তৈরি করে দিয়েছিলো।
ওরহান গাজীর সিংহাসন প্রাপ্তি ও আলাউদ্দিন পাশার দূরদর্শিতা
ওরহান গাজী ওরহান গাজী
সিংহাসনে বসার পর অবশ্য ওরহান গাজী পুরো অটোম্যান সাম্রাজ্য নিজে চালানোর ভার নিতে চাইলেন না। ছোট ভাই আলাউদ্দিন পাশাকে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন দুই ভাই সাম্রাজ্য ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য। কিন্তু এতে দ্বিমত পোষণ করেন আলাউদ্দিন। যেহেতু তাদের বাবা ওরহানকেই সুলতানীর জন্য মনোনীত করে গেছেন, তাই সেখানে কোনো পরিবর্তন আনতে চাইলেন না তিনি। পাশাপাশি সাম্রাজ্য ভাগের ব্যাপারেও তার ছিলো ঘোরতর আপত্তি। নিজের ভাগ হিসেবে তাই আলাউদ্দিন কেবল বুর্সার কাছাকাছি একটি গ্রাম থেকে পাওয়া রাজস্বই চাইলেন। ওরহান অবশ্য আলাউদ্দিনের কোনো কথাই শুনতে চাইলেন না। বরং অটোম্যান সাম্রাজ্যের উজির হওয়ার জন্য তাকে আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানালেন। বড় ভাইয়ের এমন অনুরোধে সাড়া না দিয়ে পারেন নি আলাউদ্দিন।
আলাউদ্দিন পাশা অটোম্যান সাম্রাজ্যের উজির হয়ে আসা ছিলো ওরহান গাজীর জন্য বিশেষ কিছু। উত্তরসূরিদের মতো যদিও সেনাবাহিনীকে সরাসরি বিভিন্ন নির্দেশ পালন থেকে তিনি বিরত ছিলেন, তবে রাষ্ট্রের সামরিক-বেসামরিক বিষয়াদির সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজটি দক্ষ হাতে তিনিই সামলাতেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, আলাউদ্দিনের পরামর্শেই অটোম্যানরা নিজেদেরকে সেল্‌জুকদের সামন্ত রাজ্য ভাববার গণ্ডি থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলো। মুদ্রায় সেল্‌জুক সম্রাটের ছবি ব্যবহার ও দোয়ায় তার নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বাদ দেয়া হয় এর অংশ হিসেবে।
শুধু তাই নয়। এর আগে অটোম্যানদের নিয়মিত কোনো সেনাবাহিনী ছিলো না। যুদ্ধের কিছুকাল আগে ঘোষণা দেয়া হলে আগ্রহীরা তাতে সাড়া দিতো। সেখান থেকে তাদের বেছে দিয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়ার পর যুদ্ধে পাঠানো হতো। ক্রমবর্ধমান একটি সাম্রাজ্যের জন্য এ অবস্থার পরিবর্তন ছিলো খুব জরুরি। সেই সত্যটি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন আলাউদ্দিন পাশা। সেজন্য ‘জেনিসারি’ নামে বেতনভুক্ত ও নিয়মিত এক সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। পদাতিক বাহিনীর সদস্যদের বলা হতো পিয়াদা এবং অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্যদের বলা হতো সিপাই। কমান্ডারদের অধীনে দশজন, একশোজন ও এক হাজারজনের বিভিন্ন দলকে ভাগ করে দেয়া হতো। উচ্চ প্রশিক্ষণ ও উচ্চ বেতনপ্রাপ্তি জেনিসারিদের উচ্চ সামাজিক মর্যাদার ব্যাপারটিও নিশ্চিত করেছিলো।
জেনিসারিজেনিসারির সদস্যগণ জেনিসারিদের পোষাকে কামাল আতাতুর্কজেনিসারিদের পোষাকে কামাল আতাতুর্ক
১৩২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে বসলেও সাম্রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব আরো আগেই পেয়েছিলেন ওরহান গাজী। মূলত ওসমান গাজীর বার্ধক্যজনিত অসুস্থতাই ওরহান গাজীকে তখন অটোম্যান সাম্রাজ্যের শাসনভার নিজ হাতে তুলে নিতে বাধ্য করেছিলো।
রাজ্য জয়ের অভিযান
ওরহান গাজীর বিজয়গুলো এসেছিলো মূলত উত্তর-পশ্চিম আনাতোলিয়ায় বাইজান্টাইনদের অধিকৃত এলাকাগুলো নিজের দখলে আনার মাধ্যমে। ১৩২১ সাল থেকেই শুরু হয়েছিলো তার অভিযান। সেই বছর তার বাহিনী বুর্সার মুদান্‌য়া বন্দরের দখল নিয়ে নিলে বহির্বিশ্ব থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্নই হয়ে যায় বুর্সার বাসিন্দারা। এরপর তিনি একদল সেনাকে কৃষ্ণ সাগরের পশ্চিম উপকূলে, একটি দলকে কোসাইলীর দখল নিতে এবং আরেকটি দলকে মারমারা সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের দখল নিতে পাঠান। ইতোমধ্যে ১৩২৬ সালে পতন ঘটে যায় বুর্সার। বুর্সা দুর্গের কমান্ডার এভ্রোনোস বে অটোম্যানদের বশ্যতা স্বীকার করে নিলে তাকে একটি অশ্বারোহী বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে এভ্রোনোসের ছেলে এবং নাতিরাও অটোম্যানদের অধীনে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেয় এবং বলকান অঞ্চলে অটোম্যানদের আধিপত্য বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করে। বুর্সা নগরী দখলে আনার পর ওরহান বসফরাসের দিকে তার বাহিনী প্রেরণ করেন। মারমারা সাগরের উপকূলবর্তী শহরগুলোও ততদিনে চলে আসে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতাকাতলে।
পেলেকাননের যুদ্ধঃ ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন আন্দ্রোনিকোস তৃতীয় পালাইয়োলোগোস। ততদিনে বাইজান্টাইন তার অতীত শক্তি হারিয়ে ধুঁকতে থাকা এক সাম্রাজ্য। নতুন সম্রাট তাই হারানো এলাকাগুলো ফিরে পেতে চাইলেন, নিকোমিডিয়া ও নাইসীয়াতে বাইজান্টাইন শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন তিনি। কিন্তু পেলেকাননে হালকা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ওরহানের বাহিনীর কাছে শোচনীয় পরাজয়ের শিকার হতে হয় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত বাইজান্টাইন বাহিনীকে। হারানো রাজ্যাংশ পুনরুদ্ধার তো দূরের কথা, এরপর আর কখনোই কোনো বাইজান্টাইন সম্রাট এশিয়াতে সামরিক অভিযান চালানোর সাহস করে উঠতে পারেন নি।
320px-Андроник_III_Палеологআন্দ্রোনিকোস তৃতীয় পালাইয়োলোগোস
নাইসীয়া অবরোধঃ ১৩২৮ সালে নাইসীয়া (বর্তমান ইজ্‌নিক) শহর অবরোধ করে বসে ওরহান গাজীর বাহিনী। ১৩২৯ সালে তৃতীয় আন্দ্রোনিকোস অটোম্যানদের এ অবরোধ ভেঙে দিতে আক্রমণ করে বসেন। শুরুর দিকে কিছুটা সফলতা পেলেও শেষ পর্যন্ত অবশ্য আন্দ্রোনিকোসের মুখে হাসিটা আর লেগে থাকে নি। ১৩৩১ সালে পতন ঘটে নাইসীয়ার। তখনকার দিনে নাইসীয়া ছিলো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের এশীয় শহরগুলোর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে আরেকটু মজবুত ভিতের উপর দাঁড়াতে সক্ষম হয় অটোম্যান সাম্রাজ্য।
নিকোমিডিয়ার পতনঃ নাইসীয়ার পতনের পর নিকোমিডিয়ার (বর্তমান ইজ্‌মিত) পতন ছিলো কেবলই সময়ের ব্যাপার। এর পতন ঠেকাতে সম্রাট আন্দ্রোনিকোস ওরহানকে ঘুষ পর্যন্ত দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোনো ফায়দা হয় নি তাতে। অবশেষে ১৩৩৭ সালে অটোম্যান আক্রমণের মুখে পতন ঘটে এ শহরটিরও। ওরহান গাজীর ছেলে সুলায়মান পাশা দিয়েছিলেন এ অভিযানের নেতৃত্ব।
অন্যান্যঃ ১৩৩৮ সালে উস্কুদারও চলে আসে অটোম্যানদের অধীনে। তখন পর্যন্ত কৃষ্ণ সাগরের উপকূলবর্তী শহর সাইল থেকে শুরু করে উস্কুদারের আগপর্যন্ত এবং পাফ্লাগোনিয়ার বন্দর নগরী আম্‌সারাতে বাইজান্টাইনদের আধিপত্য বজায় ছিলো। কিন্তু বিচ্ছিন্ন সেসব এলাকা অটোম্যানদের জন্য কখনোই হুমকিস্বরুপ ছিলো না। সর্বশেষ ১৩৪৫ সালে কারেসীর (বর্তমান বালিকেসির ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ) দখলও নিয়ে নেন ওরহান গাজী। এর ফলে প্রায় পুরো উত্তর-পশ্চিম আনাতোলিয়া জুড়ে অটোম্যান সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বুর্সা, নিকোমিডিয়া, নাইসীয়া ও পার্গেমাম ছিলো এর চার শক্তিশালী স্তম্ভ।
অভ্যন্তরীন উন্নয়ন
কারেসী জয়ের পর হঠাৎ করেই রাজ্য জয়ের অভিযান থেকে সরে আসেন ওরহান গাজী। এবার তিনি নজর দেন নিজের ঘর তথা অটোম্যান সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ়করণের দিকে। সামরিক-বেসামরিক নানা স্থাপনা গড়ে উঠতে থাকে এ সময়। শাসন ব্যবস্থাকে আরো মজবুত ও কার্যকর করার পাশাপাশি নজর দেয়া হয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নের দিকেও। তাদেরকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য সবার মাঝে তুলে ধরতে নির্মাণ করা হয় অসংখ্য মসজিদ। তখন বিভিন্ন সুরম্য অট্টালিকাও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলো, যার কিছু কিছু আজও টিকে আছে।
John_VI_Kantakouzenosজন ষষ্ঠ ক্যান্টাকুজিনোস
১৩৪১ সালে তৎকালীন সম্রাট তৃতীয় আন্দ্রোনিকোসের মৃত্যু হলে সমস্যার মুখে পড়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য। সম্রাটের নয় বছর বয়সী ছেলে ও উত্তরাধিকার জন পঞ্চম পালাইয়োলোগোসের অভিভাবকত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যে বেঁধে যায় এক গৃহযুদ্ধ। প্রায় ৬ বছর ধরে চলা এ যুদ্ধের এক পক্ষে ছিলেন প্রধান মন্ত্রী জন ষষ্ঠ ক্যান্টাকুজিনোস এবং অপরপক্ষে সম্রাজ্ঞী আন্না, প্যাট্রিয়ার্ক অফ কনস্টান্টিনোপল জন ষষ্ঠ কালেকাস ও মেগাডিউক অ্যালেক্সিওস অ্যাপোককোস। শেষ পর্যন্ত অটোম্যানদের সাহায্য নিয়ে এ যুদ্ধে জয়লাভ করেন জন ষষ্ঠ ক্যান্টাকুজিনোস। অটোম্যান ও বাইজান্টাইনদের মাঝে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তিনি তার দ্বিতীয় মেয়ে থিওডোরার সাথে ওরহানের বিয়ে দিতে মনস্থির করেন। শেষ পর্যন্ত মহা ধুমধামে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
পতনোন্মুখ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য
ওরহান ও থিওডোরার বিয়ের মাধ্যমে অটোম্যানদের সাথে সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হলেও বাইজান্টাইনদের পতন তাতে ঠেকানো যায় নি। বরং দিনে দিনে সেই গতি যেন আরো বৃদ্ধিই পাচ্ছিলো। তখন তাদের শাসন ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো যে, পার্শ্ববর্তী সমুদ্র পথগুলোতে বাণিজ্য নিয়ে ইতালীর উপকূলীয় বাণিজ্যিক শহরগুলোর মাঝে দ্বন্দ্ব মারাত্মক আকার ধারণ করে।
IstanbulGoldenHorn1-01গোল্ডেন হর্ন
জলপথে বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ গোল্ডেন হর্নের একদিকে ছিলো জেনোয়ার শহর গালাতা। ১৩৪৮ সালে একবার বাইজান্টাইনরা তাদের অংশে বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে শুল্কের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিলো। এ নিয়ে তখন জেনোয়ার সাথে তাদের যুদ্ধও বেঁধেছিলো। ১৩৫২ সালে বাণিজ্যিক এসব বিষয় নিয়েই জেনোয়ার সাথে ভেনিসের যুদ্ধ বেঁধে যায়। যুদ্ধে ভেনিসের পক্ষাবলম্বন করেন বাইজান্টাইন সম্রাট। মজার ব্যাপার হলো, শ্বশুরের পক্ষকে সমর্থন জানানো বাদ দিয়ে এবার বরং জেনোয়াকে সাহায্য করতেই নিজের নৌবহর প্রেরণ করেছিলেন ওরহান গাজী। এর পেছনে অবশ্য ভেনিশিয়ান জলদস্যুদের হাতে তার সমুদ্র উপকূলবর্তী শহরগুলোর বিভিন্ন সময় নাজেহাল হওয়াই মূল কারণ ছিলো। যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয় লাভ করে জেনোয়া, শক্তি আরো হ্রাস পায় বাইজান্টাইনদের।
এমন ঘোলাটে অবস্থার মাঝেই আবার ওরহানের ছেলে সুলায়মান পাশা সিন্‌বি দুর্গ দখল করে নেন। এর ফলে দার্দানেলেস প্রণালীর ইউরোপিয়ান অংশে অটোম্যানদের স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। শুধু তাই নয়। ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্যালিপোলি শহরে সুলায়মান অভিবাসী ও বিভিন্ন শহরের অধিবাসী তুর্কীদের এনে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। এতে অটোম্যানদের সাথে বাইজান্টাইনদের সম্পর্ক আরো ঘোলাটে হয়।
John_V_Palaiologosজন পঞ্চম পালাইয়োলোগোস
ওদিকে বাইজান্টাইনদের মাঝে গেম অফ থ্রোন্স তখন ভালোই জমে উঠেছিলো। ১৩৪১ সালের বিদ্রোহে জন ষষ্ঠ ক্যান্টাকুজিনোসের জয়লাভের পর সিদ্ধান্ত হয়েছিলো যে, পরবর্তী দশ বছর তিনি রাজপ্রতিভূ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। এরপর জন পঞ্চম পালাইয়োলোগোস প্রাপ্তবয়স্ক হলে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব তার হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু ক্ষমতার লোভ ছাড়া তো আর অত সহজ নয়। তাই পঞ্চম পালাইয়োলোগোসকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন ষষ্ঠ ক্যান্টাকুজিনোস! কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই তিনি ফিরে আসেন এবং বিদ্রোহের মাধ্যমে বাইজান্টাইনদের সিংহাসন দখল করে নিতে সক্ষম হন। ক্ষমতার এ দ্বন্দ্বে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ওরহানের কাছে সাহায্য চাচ্ছিলো। আর ওরহানও যাকে তার সাম্রাজ্যের জন্য সুবিধাজনক মনে হচ্ছিলো, তাকেই সাহায্য করে যাচ্ছিলেন।
বেলা শেষের কাব্য
ওরহান গাজীর বড় ছেলে সুলায়মান পাশাই ছিলেন অটোম্যান সাম্রাজ্যের পরবর্তী সম্ভাব্য সুলতান। এ লক্ষ্যে তাকে সেভাবেই গড়ে তোলা হয়েছিলো। সামরিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন ব্যাপারে সুলায়মানের অভিজ্ঞতাও ছিলো প্রশংসনীয় পর্যায়ের। কিন্তু এক দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যায় ১৩৫৭ সালে। মারমারা সাগরের উপকূলে বোলায়ীরের কাছে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক আহত হন সুলায়মান পাশা। এ আহতাবস্থা থেকে আর সুস্থ হতে পারেন নি তিনি। সুলায়মানের কবরের পাশেই কবর দেয়া হয়েছিলো তার সেই ঘোড়াটিকে। সেই কবর দুটো আজও দেখা যায়।
নিজের বড় ছেলের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে বেশ ভেঙে পড়েন ওরহান গাজী। জীবনের শেষ দিনগুলোতে সাম্রাজ্যের অধিকাংশ শাসনভার দ্বিতীয় পুত্র মুরাদের হাতে তুলে দিয়ে বুর্সাতেই নীরবে-নিভৃতে সময় পার করতে থাকেন তিনি। অবশেষে ছত্রিশ বছরের বর্ণাঢ্য সুলতানীর পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ১৩৬২ সালে আশি বছর বয়সে বুর্সাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অটোম্যান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় এ সুলতান।
পরিবারের সদস্যদের সাথে চিরনিদ্রায় শায়িত ওরহান গাজীপরিবারের সদস্যদের সাথে চিরনিদ্রায় শায়িত ওরহান গাজী ওরহান গাজীর শাসনামলে অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রসারণওরহান গাজীর শাসনামলে অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রসারণ
অটোম্যানদের নিয়ে আজকের লেখার ইতি টানছি এখানেই। পরবর্তী পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে আজকের মতো এখানেই বিদায় নিচ্ছি।




ওসমানী সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়ঃ তৃতীয় সুলতান প্রথম মুরাদ
ফিরে দেখা
স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী ওরহান গাজীর পর ওসমানী সাম্রাজ্যের দায়িত্ব হাতে নেয়ার কথা ছিলো তার বড় ছেলে সুলায়মান পাশার। কিন্তু ১৩৫৭ সালে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান সুলায়মান। ফলে ওরহান গাজীর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া বিশাল ওসমানী সাম্রাজ্যের পরিচালনার হাল ধরেন সুলতান প্রথম মুরাদ।
ব্যক্তি মুরাদ
সুলতান প্রথম মুরাদসুলতান প্রথম মুরাদ
১৩৬২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ থেকে শুরু হয় প্রথম মুরাদের শাসনকাল। অক্ষরজ্ঞানহীন হলে কী হবে? প্রতিভার দিক থেকে কোনো কমতি ছিলো না তার। রাজনৈতিক বিভিন্ন পরিস্থিতির চমৎকার বিচার-বিশ্লেষণ করে সেই অনুযায়ী ভবিষ্যতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। ধার্মিক এ সুলতান অন্যান্য ধর্মের প্রতিও ছিলেন যথেষ্ট সহনশীল।
রাজ্য জয়ের অভিযান
আদ্রিয়ানোপল বিজয়
প্রথম মুরাদের নেতৃত্বাধীন ওসমানীয় বাহিনী ১৩৬২ সালে আদ্রিয়ানোপল দখল করে নেয়। কনস্টান্টিনোপল ও থেসালোনিকার পর এটি ছিলো বাইজান্টাইনদের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। ফলে এর দখল নিতে পারা ছিলো ওসমানীয়দের জন্য বিশেষ কিছু। পরবর্তীতে শহরটির নাম পাল্টে রাখা হয় এডার্ন।
সির্প সিন্দীর যুদ্ধ
পূর্বকথাঃ আদ্রিয়ানোপল ওসমানী সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসার ফলে কনস্টান্টিনোপল থেকে ইউরোপ যাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। বিপুল সংখ্যক তুর্কী অভিবাসী তখন থ্রেসে বসতি গড়তে শুরু করে দেয়। সাম্রাজ্য বিস্তারের কার্যক্রম থেকে ওসমানীয়রাও থেমে থাকে নি। সার্বিয়া, বুলগেরিয়া ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে তাদের অভিযান চলতে থাকে। তাদের এ ক্রমশ বিস্তৃতি বেশ ত্রাসের সঞ্চার করেছিলো বলকান অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে।
১৩৬৩ সালে বুলগেরিয়ার শহর প্লভ্‌দিভ চলে আসে ওসমানী সাম্রাজ্যের আওতায়। প্লভ্‌দিভের একটি দুর্গের কমান্ডার কোনোক্রমে জীবন নিয়ে সার্বিয়ায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপরই তিনি ক্রমবর্ধমান ওসমানী সাম্রাজ্যের বিস্তার ঠেকাতে সার্বিয়ান ও বুলগেরিয়ান কর্তৃপক্ষের কাছে জোর মিনতি জানাতে থাকেন। নাহলে যে অচিরেই দেশ দুটি ওসমানীয়দের অধীনে চলে যাবে, এ বিষয়ে সতর্ক করতেও ভোলেন নি সেই কমান্ডার।
কমান্ডারের এমন সতর্কবার্তায় কাজ হলো। দুটি দেশই একটি মিত্রশক্তি গঠন করে বলকান অঞ্চল থেকে ওসমানীয়দের হটিয়ে দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলো। তখন পোপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন পঞ্চম আরবান। তার উৎসাহে ওয়ালাশিয়া ও বসনিয়া এ মিত্রশক্তিতে তাদের কিছু সেনা পাঠাতে রাজি হয়। অপরদিকে বলকান অঞ্চলে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়তে থাকা হাঙ্গেরিও তাদের রাজা প্রথম লুইসের নেতৃত্বে এ অভিযানে শামিল হয়।
পোপ পঞ্চম আরবানপোপ পঞ্চম আরবান রাজা প্রথম লুইসরাজা প্রথম লুইস
যুদ্ধঃ ৩০,০০০-৬০,০০০ সেনা সদস্যের বিশাল এক বাহিনী রওনা হয়ে গেলো আদ্রিয়ানোপলের উদ্দেশ্যে। সুলতান প্রথম মুরাদ তখন বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীর কাতালান সৈন্যদের সাথে বিগাতে যুদ্ধরত ছিলেন। ওসমানীয়দের অধিকাংশ সৈন্যই তখন ছিলো এশিয়া মাইনরে। রুমেলিয়ার সর্বাধিনায়ক লালা শাহিন পাশা সুলতানের কাছে তাই কিছু সেনার জন্য সাহায্য চেয়ে দূত পাঠালেন। একই সময়ে তিনি হাসি ইল্‌বেকে একটি বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করলেন যাদের কাজ ছিলো সেই মিত্রবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন মতো আক্রমণ করে তাদের অগ্রযাত্রার গতিকে ধীর করে দেয়া।
এত চেষ্টা করেও দমানো যায় নি মিত্রবাহিনীকে। বলতে গেলে কোনো রকম বাধা ছাড়াই তারা মারিৎসা নদীটি পার হয়ে যায় এবং সারায়াক্‌পিনার গ্রামে ক্যাম্প স্থাপন করে। আদ্রিয়ানোপলের খুব কাছেই তারা এসে গিয়েছিলো। এত দূর এসেও কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন না হয়ে তাদের নেতারা ভেবেছিলো যে, আদ্রিয়ানোপল দখল করা হয়তো খুব একটা কঠিন কিছু হবে না। তাই সেই রাতে তারা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লো। এমনকি ক্যাম্পের প্রতিরক্ষার জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থাও তারা নেয় নি। এটিই ছিলো মিত্রবাহিনীর মস্ত বড় ভুল। কারণ দূর থেকে তাদের গতিবিধি ঠিকই নজরে রেখে চলেছিলো হাসি ইল্‌বের নেতৃত্বাধীন বাহিনী।
শত্রুকে এতটা অরক্ষিত অবস্থায় পেয়ে আর তর সইছিলো না হাসি ইল্‌বের। সুলতানের কাছ থেকে সাহায্য আসার জন্য তাই আর অপেক্ষা করতে চাইলেন না তিনি। বরং রাতের আঁধার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই আকিঞ্জিরা (অনিয়মিত, হালকা অস্ত্রসজ্জিত অশ্বারোহী বাহিনী) আক্রমণ করে বসলো মিত্রবাহিনীর ক্যাম্পে। মিত্রবাহিনীর বিশাল সেনাবাহিনীর বিপরীতে ওসমানীয়দের পক্ষে ছিলো মাত্র ১০,০০০ এর মতো সেনা। তাই কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নিলেন হাসি ইল্‌বে। তিনি তার বাহিনীকে দুটো মশাল বহন করে আক্রমণ করতে বললেন যাতে করে শত্রুরা ভাবে যে, ওসমানীয়রা বুঝি দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আক্রমণ করেছে। আশ্চর্যজনকভাবে অধিনায়কের এ কৌশলটি কাজে লেগে গেলো। ভরপেটে, তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে এমন মারাত্মক আক্রমণ দেখে ভয় পেয়ে গেলো মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা। তারা ভেবেছিলো যে, সুলতান মুরাদ বুঝি বিশাল বড় এক বাহিনী নিয়ে তাদের আক্রমণ করেছেন। এ ভয়ে তারা যে পথ ধরে এসেছিলো, সেই পথ ধরেই আবার পালাতে শুরু করলো। পলায়নপর সৈন্যদের এক বড় অংশ মারিৎসা নদীতে ডুবে মারা যায়, যাদের অধিকাংশই ছিলো সার্বিয়ান।
ফলাফলঃ হাসি ইল্‌বের অসাধারণ রণকৌশলে এ যুদ্ধে জয়লাভ করে ওসমানীয় বাহিনী। তাদের প্রায় ১,০০০ সেনা নিহত হয় এ যুদ্ধে। অপরদিকে মিত্রবাহিনীর প্রায় ৮,২৫০ জন সেনা নিহত হয়েছিলো। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, অসাধারণ রণনৈপুণ্য প্রদর্শনের পরও এরপর মাত্র এক বছরের মতো পৃথিবীর আলো-বাতাস গ্রহণ করতে পেরেছিলেন হাসি ইল্‌বে। কারণ তার এ দক্ষতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে লালা কামাল পাশা বিষ প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করেন। আদ্রিয়ানোপলকে এ যুদ্ধের পরই ওসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
মারিৎসার যুদ্ধ
পূর্বকথাঃ সির্প সিন্দীর যুদ্ধ শেষ হয়েছে প্রায় সাত বছর হতে চললো। কিন্তু সার্বিয়ানদের মনের মাঝে থাকা সেই হারের ক্ষত ততদিনেও বিন্দুমাত্র শুকায় নি।
সার্বিয়ার রাজা ভুকাশিন মৃন্‌য়াভ্‌চেভিচ চাইছিলেন স্কাডারকে (বর্তমান শ্‌কোডার) আবারো সার্বিয়ার সাম্রাজ্যভুক্ত করতে। এজন্য ভুকাশিন এবং তার ছেলে মার্কোর নেতৃত্বে সার্বিয়ান বাহিনী ১৩৭১ সালের জুন মাসে স্কাডারে পৌঁছে। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন যে, বিশাল এক ওসমানীয় বাহিনী পূর্ব দিক থেকে অগ্রসর হচ্ছে। এ খবর পেয়ে তারাও পূর্ব দিকে মারিৎসা নদীর দিকে যাত্রা করেন।
রাজা ভুকাশিন মৃন্‌য়াভ্‌চেভিচরাজা ভুকাশিন মৃন্‌য়াভ্‌চেভিচ
যুদ্ধঃ ১৩৭১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০,০০০-৭০,০০০ সদস্যের বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে মারিৎসার তীরে জড়ো হয় সার্বিয়ান বাহিনী। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন রাজা ভুকাশিন মৃন্‌য়াভ্‌চেভিচ এবং তার ভাই ডেস্পট জোভান উগ্লয়েশা। সেই তুলনায় ওসমানীয় বাহিনী ছিলো একেবারেই ছোট। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, ওসমানীয় বাহিনীতে সেদিন মাত্র আটশোর কাছাকাছি সেনা সদস্য ছিলো। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন লালা শাহিন পাশা এবং গাজী এভ্রেনস।
সংখ্যালঘু হলেও ওসমানীয়দের রণকৌশলের কাছেই শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয় সার্বিয়ানরা। শাহিন পাশার নেতৃত্বে ওসমানীয় বাহিনী রাতের আঁধারে অতর্কিত আক্রমণ চালালে পরাজিত হয় সুবিশাল সার্বিয়ান সেনাবাহিনী। যুদ্ধে রাজা ভুকাশিন এবং তার ভাই উগ্লয়েশা দুজনই নিহত হন। হাজার হাজার সার্বিয়ান সেনা সেদিন মারা পড়েছিলো সুলতান প্রথম মুরাদের বাহিনীর হাতে। মারিৎসা নদীতে ডুবেও মারা গিয়েছিলো অনেকে। হ্যারল্ড উইলিয়াম ভাজেইলের ‘হিস্টোরি অফ সার্বিয়া’ বই থেকে জানা যায় যে, মারিৎসা নদীর পানি সেদিন টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করেছিলো।
ফলাফলঃ এ যুদ্ধের ফলে মেসিডোনিয়া এবং গ্রীসের কিছু অংশ ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। আধুনিক গ্রীসের ড্রামা, কাভালা ও সের্‌রাই শহরও কালক্রমে এ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
প্লচনিকের যুদ্ধ
পূর্বকথাঃ ১৩৮১ সালের কথা। ওসমানীয় সেনাবাহিনী সার্বিয়ার পোমোরাভ্লয়ে ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে অভিযান চালায়। সেখানে তারা হত্যা ও লুন্ঠনের লীলাখেলায় মেতে উঠেছিলো। পরবর্তীতে তারা দুব্রাভ্‌নিকাতে হামলা চালালে তৎকালীন সার্বিয়ান শাসক লাজার রেবেল্‌য়ানোভিচ তাদের পরাস্ত করেন। পরবর্তীতে আরো বড় বাহিনী নিয়ে ১৩৮৬ সালে সুলতান প্রথম মুরাদ সার্বিয়ায় আক্রমণ চালান এবং নীস শহর জয় করে নেন। কারামানিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও ভাগ্য তার পক্ষে ছিলো।
 লাজার রেবেল্‌য়ানোভিচলাজার রেবেল্‌য়ানোভিচ
এসব যুদ্ধে সার্বিয়ান বেশ কিছু সামন্ত রাজ্যের রাজারা সুলতানের বাহিনীতে তাদের সেনাদের প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তার আদেশ অমান্য করে সেনারা জনসাধারণের সম্পদ লুটপাট করায় বেজায় ক্ষেপে গিয়েছিলেন সুলতান মুরাদ। বেশ কিছু সেনাকে এ অপরাধে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় যাদের মাঝে সামন্ত রাজ্যগুলো থেকে আসা সার্বিয়ান সেনারাও ছিলো। নিজেদের সেনাদের এভাবে হারানো ব্যাপারটি সহজভাবে নিতে পারেন নি সেসব রাজ্যের রাজারা। তাই তারা নিজেদের পক্ষ পরিবর্তন করে লাজারের আনুগত্যতা মেনে নিলেন।
ওদিকে একই সময়ে শ্‌কোডারের এক সামন্তরাজ মুরাদকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তিনি সুলতানের আনুগত্য মেনে নেয়ার ব্যাপারে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এমনকি তার প্রতিরক্ষার্থে সুলতান বাহিনী পাঠালে তাদের সহায়তার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। এমন চিঠি পেয়ে সুলতান চুপ থাকতে পারলেন না। তাই আকিঞ্জি কমান্ডার কুলা শাহিন বে-কে তিনি তার দল নিয়ে সেই সামন্ত রাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যেতে বললেন।
যুদ্ধঃ শাহিন বে ২০,০০০ আকিঞ্জি সেনাকে নিয়ে সার্বিয়ায় প্রবেশ করলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই তিনি খবর পেলেন যে, তার বাহিনীকে আক্রমণ করতে একত্রিত হয়েছে সার্বিয়ার সামন্তরাজগণ। এ খবর শুনে তিনি প্লচনিকের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনো সৈন্য সমাবেশ দেখতে না পেয়ে তিনি ভাবলেন যে, খবরটা হয়তো গুজব ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। ওদিকে শাহিন বে’র সাথে আসা সৈন্যদের ততক্ষণে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে গেছে। ফলে নেতার আদেশ অমান্য করে প্রায় ১৮,০০০ সেনা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে লুটপাট শুরু করে দিলো। শাহিন বে তার অনুগত ২,০০০ সেনাসহ রয়ে গেলেন। এখানেই মস্ত বড় ভুলটি করেছিলো ওসমানীয় সেনাবাহিনী। কারণ দূর থেকে ঠিকই তাদের উপর নজর রেখে চলেছিলো শত্রুপক্ষ।
হঠাৎ করেই ঝড়ের বেগে ৩০,০০০ শত্রু সেনা এসে চড়াও হলো ওসমানীয় বাহিনীর উপর। তাদের অধিকাংশই ছিলো অশ্বারোহী নাইট এবং তীরন্দাজ সেনা। প্রথমেই তারা চড়াও হয় শাহিন বে’র সাথে থাকা ২,০০০ সেনার উপর। শুরুতে সামান্য প্রতিরোধ গড়তে পারলেও অল্প সময়ের মাঝেই ওসমানীয়দের সেই প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে। যুদ্ধে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে কোনোক্রমে জীবন নিয়ে পালাতে সক্ষম হন শাহিন বে। এরপর সার্বিয়ান বাহিনী চড়াও হয় লুটপাটে ব্যস্ত থাকা সেই ১৮,০০০ সেনার উপর। নেতৃত্বহীন, অগোছালো সেই বাহিনী কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই কচুকাটা হতে শুরু করে সার্বিয়ান বাহিনীর হাতে। শেষ পর্যন্ত ২০,০০০ থেকে মাত্র ৫,০০০ ওসমানীয় সেনা প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলো। সার্বিয়ান বাহিনীর ক্ষতির পরিমাণ ছিলো খুবই কম।
প্লচনিকের এ যুদ্ধটি ঠিক কবে সংঘটিত হয়েছিলো তা নিয়ে অবশ্য ঐতিহাসিকদের দ্বিমত আছে। সিমা চির্কোভিচের মতে ১৩৮৫, জোভাঙ্কা কালিচ ও মার্কো শুইচার মতে ১৩৮৬ এবং কামাল নামিকের মতে ১৩৮৭ সালে যুদ্ধটি হয়।
ফলাফলঃ এ যুদ্ধের ফলে সার্বিয়ান বাহিনী তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলো। বলকান অঞ্চলে ওসমানীয়দের অগ্রযাত্রাতেও এর ফলে সাময়িক ছেদ পড়ে। এ অঞ্চলে এটিই ছিলো তাদের প্রথম বড় রকমের পরাজয়। এমনকি এর ফলে মুরাদ বলকান অঞ্চলে তার অভিযান বাতিল করার কথাও ভেবেছিলেন।
ওসমানীয় বাহিনীর পরবর্তী অভিযান ছিলো বসনিয়ার বিরুদ্ধে, ১৩৮৮ সালে। এখন আসছি সেই অভিযানের কথাতেই।
বিলেচার যুদ্ধ
বসনিয়ার বিলেচা শহরে ১৩৮৮ সালের ২৭ আগস্ট বসনীয় ও ওসমানীয় বাহিনীর মাঝে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে বসনীয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ভ্লাত্‌কো ভুকোভিচ ও রাদিচ স্যাঙ্কোভিচ। অন্যদিকে ওসমানীয় বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লালা শাহিন পাশা।
যুদ্ধে সেনা সংখ্যার বিচারে পিছিয়ে ছিলো বসনীয়রাই। তাদের পক্ষে ছিলো প্রায় ৭,০০০ সৈন্য। অপরপক্ষে ওসমানীয় বাহিনীতে ছিলো প্রায় ১৮,০০০ সৈন্য। কিন্তু সৈন্য সংখ্যার আধিক্যও ওসমানীয়দের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে নি। বরং প্লচনিকের যুদ্ধের পর এ যুদ্ধেও তারা পরাজিত হয়। শাহিন পাশা পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন। যুদ্ধে বসনীয়দের ক্ষতির পরিমাণ নগণ্য ছিলো বলেই উল্লেখ করেছেন ঐতিহাসিকগণ।
ততদিনে বলকান অঞ্চলের অনেক এলাকাই এসে গিয়েছিলো ওসমানী সাম্রাজ্যের অধীনে। উত্তর সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার শাসকেরা, এমনকি জন পঞ্চম পালাইয়োলোগোসও তখন ওসমানীয়দের কর দিতে বাধ্য হন। শাসনকার্যে সুবিধার জন্য সুলতান তার সাম্রাজ্যকে আনাতোলিয়া (এশিয়া মাইনর) ও রুমেলিয়া (বলকান) এ দুটি প্রদেশে ভাগ করেছিলেন।
সুলতান প্রথম মুরাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বলা হয় ‘কসোভোর যুদ্ধ’কে। এ যুদ্ধের সৈন্য সংখ্যা, সৈন্য সমাবেশ, রণকৌশল তথা পুরো যুদ্ধ নিয়েই বিস্তারিত লেখা থাকছে ওসমানী সাম্রাজ্য নিয়ে আমাদের পরবর্তী পর্বে। ততদিন পর্যন্ত সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করে আজকের মতো এখানেই বিদায় নিচ্ছি।




কসোভোর যুদ্ধঃ ওসমানীয় বাহিনীর কষ্টার্জিত এক বিজয়ের ইতিকথা
কসোভোর যুদ্ধ নিয়ে আলাপ করতে গেলে আমাদেরকে যুদ্ধেরও বেশ কয়েক বছর পেছনের ঘটনাগুলো বুঝতে হবে। ১৩৩১-১৩৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সার্বিয়ার রাজা ছিলেন চতুর্থ স্টিফান উরশ দুশান। তার মৃত্যুর পর সিংহাসনে আসেন তারই ছেলে পঞ্চম স্টিফান উরশ। কিন্তু বাবা আর ছেলের মাঝে ছিলো আকাশ-পাতাল পার্থক্য। চতুর্থ স্টিফান যেখানে রাজ্য পরিচালনায় অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন, তার ছেলে পঞ্চম স্টিফান সেখানে ছিলেন একেবারই ব্যর্থ। ১৩৫৫-১৩৭১ সাল পর্যন্ত তার শাসনামলে কেন্দ্রের ক্ষমতা বিপুল পরিমাণে হ্রাস পায় এবং অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য জন্ম নেয়। ১৩৭১ সালে নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান পঞ্চম স্টিফান। একই বছরে মারিৎসার যুদ্ধে ওসমানীয় বাহিনী অসাধারণ রণনৈপুণ্য প্রদর্শন করে বিজয় ছিনিয়ে নেয়। ওসমানীয়দের ক্রমশ অগ্রসরমান এ সামরিক অভিযান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন সার্বিয়ান শাসক লাজার রেবেল্‌য়ানোভিচ। তাই তাদের থামাতে সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে লাগলেন তিনি।
পঞ্চম স্টিফান উরশপঞ্চম স্টিফান উরশ
লাজারের এ তৎপরতার ফলস্বরুপ প্লচনিকের যুদ্ধ ও বিলেচার যুদ্ধে পরাজিত হয় সুলতান মুরাদের ওসমানীয় সেনাবাহিনী। এরপর সুলতান তার বাহিনীকে ফিলিপ্পোপোলিস থেকে ইহ্‌তিমানে সরিয়ে নেন। তারপর একসময় তার বাহিনী এসে পৌঁছায় কসোভোতে। এখানে বেশ বড় একটি অবস্থানগত সুবিধা পেয়েছিলেন সুলতান। কারণ এখান থেকে লাজার রেবেল্‌য়ানোভিচ কিংবা ভাক ব্রাঙ্কোভিচের রাজ্যে অনায়াসেই আক্রমণ করতে পারতেন তিনি। ১৩৮৯ সালের ১৪ জুন ওসমানীয় বাহিনী প্রিস্টিনাতে গিয়ে অবস্থান নেয়।
সৈন্য সংখ্যা
800px-Murat_Hüdavendigarসুলতান প্রথম মুরাদ
কসোভোর যুদ্ধে সুলতান মুরাদের বাহিনীতে ছিলো প্রায় ৪০,০০০ এর মতো সেনা। এদের মাঝে ছিলো ২,০০০ জেনিসারি, ২,৫০০ অশ্বারোহী সেনা, ৬,০০০ সিপাহী, ২০,০০০ আজাপ (হালকা অস্ত্রে সজ্জিত অনিয়মিত পদাতিক বাহিনী) ও আকিঞ্জি (অনিয়মিত, হালকা অস্ত্রসজ্জিত অশ্বারোহী বাহিনী)। অবশিষ্ট প্রায় ৮,০০০ সেনা এসেছিলো অধীনস্ত সামন্ত রাজ্যগুলো থেকে। তিন ভাগে বিভক্ত এ বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সুলতান মুরাদ এবং তার দুই ছেলে বায়েজিদ ও ইয়াকুব সেলেবি।
Knez_Lazar,_Vladislav_Titelbahলাজার রেবেল্‌য়ানোভিচ
প্রতিপক্ষের নেতৃত্ব ছিলেন লাজার রেবেল্‌য়ানোভিচ, ভাক ব্রাঙ্কোভিচ ও ভ্লাত্‌কো ভুকোভিচ। এ বাহিনীতে ছিলো প্রায় ২৬,০০০ এর মতো সেনা। এদের মাঝে ১২,০০০ সেনা ছিলো লাজারের নেতৃত্বাধীন, যাদের ১০,০০০ ছিলো পদাতিক ও ২,০০০ অশ্বারোহী। অপরদিকে ভাক ব্রাঙ্কোভিচ ও ভ্লাত্‌কো ভুকোভিচ প্রত্যেকেই প্রায় ৭,০০০ জন করে সেনা নিয়ে এসেছিলেন। এদের মাঝে ৫,০০০ ছিলো পদাতিক এবং ২,০০০ অশ্বারোহী। এছাড়া ক্রোয়েশিয়ান নাইট জন অফ পালিস্‌নার নেতৃত্বে কয়েক হাজার নাইটও সেই মিত্রপক্ষে যোগ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
সৈন্য সমাবেশ
কসোভোর ময়দানে মুখোমুখি হলো সুলতান প্রথম মুরাদের ওসমানীয় বাহিনী এবং লাজার-ব্রাঙ্কোভিচ-ভুকোভিচের মিত্রবাহিনী।
তিন ভাগে বিভক্ত মুরাদের বাহিনীর মাঝেখানে ছিলেন মুরাদ নিজে। তার ডান ও বামের বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে বায়েজিদ ও ইয়াকুব সেলেবি। বায়েজিদ ও ইয়াকুবের বাহিনীতে শুরুতেই ছিলো ১,০০০ জন করে তীরন্দাজ সেনা। এদের পরে ছিলো ৮,০০০ জন করে পদাতিক সেনা। আর সবার শেষে ছিলো ৩,০০০ জন করে অশ্বারোহী সেনার অবস্থান। মাঝখানে থাকা মুরাদের বাহিনীর শুরুতেই ছিলো জেনিসারি দল। এদের পেছনেই অশ্বারোহী দলের সাথে ছিলেন সুলতান মুরাদ।
Battle_of_Kosovo,_disposition_of_troopsকসোভোর যুদ্ধে দুই বাহিনীর সৈন্য সমাবেশ
সার্বিয়ান বাহিনীও তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিলো। মাঝখানের অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন লাজার। তার ডান ও বামে ছিলেন যথাক্রমে ভাক ও ভ্লাত্‌কো। তাদের সৈন্য সমাবেশ ছিলো ওসমানীয়দের উল্টো। সম্মুখভাগে ছিলো ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অশ্বারোহী বাহিনী। অশ্বারোহী তীরন্দাজ বাহিনীর অবস্থান ছিলো দুই পাশে। আর পেছনে অবস্থান নিয়েছিলো পদাতিক বাহিনী।
যুদ্ধ
১৩৮৯ সালের ১৫ জুন কসোভোর ময়দানে সংঘটিত হয় ওসমানীয় ও সার্বিয়ান বাহিনীর মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘কসোভোর যুদ্ধ’।
শুরুটা করেছিলেন লাজার রেবেল্‌য়ানোভিচ। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত অশ্বারোহী বাহিনীকে তিনি সামনে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। সাথে সাথেই ঘোড়ার পিঠে চড়ে ধুলোর ঝড় তুলে এগিয়ে যেতে থাকে হাজার হাজার যোদ্ধা। ওসমানীয় সেনারাও সাথে সাথে নিজেদের প্রস্তুত করে নেয়। সামনের দিকে থাকা প্রায় ২,০০০ তীরন্দাজের হাত থেকে যেন তীরের বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হয়ে যায়। তীরের আঘাতে সার্বিয়ানদের ক্ষতি হলেও তারা পিছু না হটে সামনে এগোতে থাকে।
Battle_of_Kosovo_planযুদ্ধরত দুই বাহিনীর সৈন্য সমাবেশের চিত্র
সার্বিয়ান ও ওসমানীয় বাহিনীর মধ্যকার দূরত্ব যখন মাত্র ১,০০০ গজের কাছাকাছি, তখনই হঠাৎ করে বিন্যাস পরিবর্তন করে ফেলে সার্বিয়ানরা। ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতো হয়ে গিয়ে তারা আঘাত হানে ওসমানীয়দের উপর।
ভাক ব্রাঙ্কোভিচভাক ব্রাঙ্কোভিচ কসোভোর যুদ্ধ - ১ কসোভোর যুদ্ধ – ১
ভাক ব্রাঙ্কোভিচের বাহিনী গিয়ে আঘাত হানে ইয়াকুব সেলেবির বাহিনীর উপর। শুরুতে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত অশ্বারোহী বাহিনীর সামনে দাঁড়াতে পারে নি হালকা অস্ত্রে সজ্জিত সেলেবির বাহিনী। এরপর লাজার ব্রাঙ্কোভিচের অশ্বারোহী বাহিনীকে নির্দেশ দেন ওসমানীয়দের মধ্যভাগে আঘাত হানতে, কারণ সেখানেই রয়েছেন সুলতান মুরাদ। তার নির্দেশে অশ্বারোহী সেনারা নিজেদের দিক পরিবর্তন করতে শুরু করে। ঠিক এমন সময়ই ইয়াকুব সেলেবি নিজের খেল দেখিয়ে দেন। প্রতিপক্ষের এমন অবস্থায় নিজের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে ঝড়ের বেগে তাদের উপর চড়াও হন ইয়াকুব। এমন প্রতি-আক্রমণের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না ব্রাঙ্কোভিচের বাহিনী। অন্যদিকে ভারী অস্ত্রশস্ত্র তাদের চলাফেরাতেও সমস্যা করছিলো। ফলস্বরুপ মারাত্মক ক্ষতির শিকার হতে হয় তাদের।
ভ্লাত্‌কো ভুকোভিচভ্লাত্‌কো ভুকোভিচ কসোভোর যুদ্ধ - ২কসোভোর যুদ্ধ – ২
শুরুতে সার্বিয়ানদের আক্রমণের তীব্রতায় সুলতানের নেতৃত্বাধীন বাহিনীও পিছু হটতে বাধ্য হয়। ডান পাশে থাকা বায়েজিদের বাহিনী অবশ্য ভ্লাত্‌কো ভুকোভিচের বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলো। এরপরই সুলতানের নির্দেশে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু করে বায়েজিদের বাহিনী। ততক্ষণে বাম দিকে ইয়াকুব সেলেবির বাহিনী সার্বিয়ানদের বেশ ক্ষতি সাধন করেছিলো। এদিকে এবার বায়েজিদের বাহিনীও ভুকোভিচের বাহিনীকে চেপে ধরলো। ওসমানীয়দের আক্রমণের মুখে টিকে থাকতে না পেরে ভুকোভিচ তখন ক্ষতি পোষাতে মধ্যভাগে থাকা সার্বিয়ান বাহিনীর সাথে যোগ দিলেন।
কসোভোর যুদ্ধ - ৩কসোভোর যুদ্ধ – ৩
নিজের বাহিনীর এমন অবস্থা দেখে প্রতিশোধস্পৃহা দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো লাজারের মনে। তাই অবশিষ্ট বাহিনী নিয়েই মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মুরাদের বাহিনীর সাথে। এমন বেপরোয়া আক্রমণে ওসমানীয় বাহিনী বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আক্রমণ চলাকালেই আহত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যান লাজার। ওসমানীয় সেনারা সাথে সাথেই তাকে বন্দী করে সুলতানের সামনে নিয়ে আসে। মুহুর্তের মাঝেই শিরশ্ছেদ করার হয় লাজারের।
সার্বিয়ান বাহিনীর ডান প্রান্তে থাকা ব্রাঙ্কোভিচ লাজারকে বন্দী হতে দেখেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে জয়ের আশা তিনি ছেড়ে দেন। তাই সাথে থাকা প্রায় ৫,০০০ সেনা নিয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান।
অল্প সময়ের মাঝেই লাজারের মৃত্যু ও ব্রাঙ্কোভিচের পলায়নের খবর ছড়িয়ে পড়ে সবদিকে। সার্বিয়ান সেনারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তখন যে যেভাবে পারে পালাতে শুরু করে।
মিলোস ওবিলিচমিলোস ওবিলিচ
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলো। মুরাদের সামনে দিয়েই নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো যুদ্ধবন্দীদের। এদের মাঝে ছিলেন সার্বিয়ান এক অভিজাত বংশীয় লোক, নাম তার মিলোস ওবিলিচ। হঠাৎ করেই হাতের বাঁধন ছুটিয়ে সাথে থাকা গোপন ছোরাটি বের করে সুলতানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন ওবিলিচ। উপর্যুপরি আঘাত করে সেখানেই সুলতানকে খুন করেন তিনি। এরপর অবশ্য ওবিলিচকেও হত্যা করেন সুলতানের দেহরক্ষীরা। কিন্তু ক্ষতি যা হবার তা তো ঠিকই হয়ে গেছে, মারা গেছেন ওসমানী সাম্রাজ্যের তৃতীয় সুলতান প্রথম মুরাদ।
অবশ্য আরেক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মুরাদ আসলে যুদ্ধ চলাকালেই মারা গিয়েছিলেন। ১২ জন সার্বিয়ান অভিজাত বংশীয় লোক ওসমানীয়দের বাঁধা ভেঙে সামনে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়। তাদের মাঝেই একজন সুলতানের গলা ও পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিয়ে হত্যা করেন তাকে।
ফলাফল
যুদ্ধে উভয় পক্ষই মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সার্বিয়ানদের প্রায় ৬,০০০ অশ্বারোহী ও ১৪,০০০ পদাতিক সেনা এতে নিহত হয়। যুদ্ধবন্দীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১,০০০। ওদিকে ওসমানীয় বাহিনীর ক্ষতিও ছিলো ব্যাপক। তাদের প্রায় ৫,০০০ অশ্বারোহী ও ২০,০০০ পদাতিক সেনা এতে প্রাণ হারায়। এ যুদ্ধে সার্বিয়ানরা তাদের অধিকাংশ সেনা হারিয়েছিলো। ফলে কিছুদিনের মাঝেই সার্বিয়ার বিভিন্ন ক্ষুদ্র রাজ্য একে একে ওসমানীয়দের সামন্ত রাজ্যের তালিকায় নাম লেখাতে শুরু করে।
সুলতান প্রথম মুরাদের মৃত্যুর পর ওসমানীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা কিছুদিনের জন্য হলেও থমকে যায়। এরপর সিংহাসনে আসেন তার ছেলে বায়েজিদ। ওসমানীয়রা আবার নজর দেয়া শুরু করে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য দখলের দিকে।
ওসমানীয় সাম্রাজ্যের গল্প আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী পর্ব আসছে ইনশাআল্লাহ কিছুদিন পরই। ততদিন পর্যন্ত সবার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে আজ এখানেই বিদায় নিচ্ছি।



প্রাচীন মিশরীয়রা মৃতদেহ থেকে যেভাবে মমি বানাতো (সচিত্র বর্ণনা)
ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন কার্টুন আর সিনেমার বদৌলতে ‘মমি’ শব্দটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। আসলে মমি আমাদের মাথায় এমনভাবে গেঁথে গেছে যে মিশরের নাম শুনলে আমাদের চোখে শুরুতেই এই মমি আর সেই সাথে পিরামিডের ছবি ভেসে উঠে। মমি বলতে সাধারণত আমরা বুঝি একটি মৃতদেহ যাকে এক ‘বিশেষ প্রক্রিয়ায়’ সংরক্ষণ করা হয়েছে। একটি মৃতদেহকে মমি বানানোর সেই বিশেষ প্রক্রিয়াটি নিয়ে আলোচনা করতেই আজকের এই লেখা।
2ওট্‌জির মমিকে বলা হয়ে থাকে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত সবচেয়ে প্রাচীন মমি 3বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত এক মমি 4গুয়ান্চে‌ মমি (স্পেন)
মমিকরণ প্রক্রিয়ার শুরুর দিকে এর সাথে জড়িত ব্যক্তিরা মৃতদেহটিকে রজনে (গাছের আঠালো রস) সিক্ত পাটের কাপড় দিয়ে ভালোভাবে মুড়িয়ে দিতেন। এভাবে ব্যান্ডেজ করার ফলে মৃতদেহটি অনেকটা জীবিত মানুষের দেহাবয়ব পেলেও এর পচন প্রক্রিয়াকে ব্যান্ডেজ রোধ করতে পারে নি। ব্যান্ডেজের ভেতরে ঠিকই ব্যাকটেরিয়া থেকে যেত। একসময় মৃতদেহটি তাই কঙ্কালে পরিণত হয়ে যেত যা ছিলো একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অবশেষে মিশরীয়রা বুঝতে পারে যে, শরীরের ভেতরে থাকা অঙ্গগুলোর পচনই তাদের হতাশার মূল কারণ। তাই তারা শরীরের ভেতরের সেই অঙ্গগুলো অপসারণ করে মৃতদেহ সংরক্ষণের চমৎকার, বুদ্ধিদীপ্ত এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। চমৎকার সেই পদ্ধতিটিই এখন ধাপে ধাপে সচিত্র বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরছি।
5ইবু
মৃতদেহকে মমি করার আগে শুরুতেই তাকে নিয়ে যাওয়া হতো ‘ইবু (Ibu)’ বা বিশুদ্ধিকরণ স্থানে। এখানে দেহটিকে প্রথমে সুগন্ধযুক্ত তাড়ি (তালের রস থেকে তৈরি মদ) দিয়ে ধোয়া হতো। এরপর নীল নদের পানি দিয়ে দেহটিকে ভালোভাবে পরিষ্কার করা হতো।
6নাক দিয়ে মগজ বের করার পদ্ধতি
এখান থেকে দেহটিকে নিয়ে যাওয়া হতো ‘পার-নেফার (Per-Nefer)’ বা মমিকরণ কক্ষে। এখানেই মৃতদেহকে মমিতে পরিণত করার মূল কাজটি শুরু হতো। পার নেফারে নেবার পর দেহটিকে একটি কাঠের টেবিলের উপর রাখা হতো। এবার মৃতদেহকে পচনের হাত থেকে রক্ষার জন্য চলতো এর ভেতরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপসারণের কাজ। শুরু করা হতো মস্তিষ্ক দিয়ে। এজন্য তারা প্রথমে নাকের ভেতর দিয়ে তীক্ষ্ম কোনো কিছু একেবারে মাথার খুলি পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিতো। এরপর লম্বা, লোহার তৈরি হুকের সাহায্যে তারা নাকের ভেতর দিয়েই পুরো মগজটুকু বের করে আনতো। বোঝাই যায় যে, একটি হুক দিয়ে পুরো মগজ ঠিক মতো বের করে আনা সম্ভব নয়। তাই তারা এরপর লম্বা একটি চামচের সাহায্যে মগজের অবশিষ্টাংশ বের করে আনতো। মজার ব্যাপার হলো, মিশরীয়রা কিন্তু এত কসরত করে বের করা মগজ সংরক্ষণ করতো না। তারা আসলে বুঝে উঠতে পারে নি যে, মগজ কী কাজে লাগে! তবে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলো যে, পরকালে এ মগজ আর কোনো কাজেই আসবে না!
সরিয়ে নেয়া হচ্ছে যকৃত, ফুসফুস, পাকস্থলী এবং অন্ত্রসরিয়ে নেয়া হচ্ছে যকৃত, ফুসফুস, পাকস্থলী এবং অন্ত্র
এবার মমিকরণ প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিরা অবসিডিয়ান (Obsidian) নামক শক্ত পাথরে তৈরি ব্লেডের সাহায্যে মৃতের দেহের বাম পাশে সামান্য একটু জায়গা কেটে ফেলতেন। সেখান দিয়ে একে একে যকৃত, ফুসফুস, পাকস্থলী এবং অন্ত্র বের করে আনতেন তারা। প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করতো হৃৎপিণ্ডই মানুষের সকল আবেগ আর অনুভূতির মূল কেন্দ্র। তাই শরীরের এ অংশটিকে তারা কিছু করতো না। পৃথক করা অংশগুলো ভালোমতো ধুয়ে, রজনের প্রলেপ দিয়ে, পাটের কাপড়ে পেঁচিয়ে এক বিশেষ ধরণের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন তারা। মিশর বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণ এ পাত্রকে ‘ক্যানোপিক জার (Canopic Jar)’ বলে থাকেন। প্রাচীন মিশরের অধিবাসীদের মতে- এ পাত্রগুলোতে সংরক্ষণ করা অঙ্গগুলো পরকালে মৃতব্যক্তির সঙ্গী হতো।
ক্যানোপিক জারের কথা যখন আসলো তাহলে এরকম কয়েকটি জারের সাথে পরিচিত হয়ে নেওয়া যাক (বাম থেকে):
8ক্যানোপিক জার
(১) মানুষের মাথার মতো এ জারটির নাম ইমসেটি। এখানে যকৃত রাখা হতো।
(২) হাপি নামের বেবুনের মাথার মতো দেখতে এ জারে ফুসফুস রাখা হতো।
(৩) ডুয়ামেটেফ নামের খেঁকশেয়ালের মাথার মতো এ জারে পাকস্থলী রাখা হতো।
(৪) কেবেহ্‌সেনুয়েফ নামের বাজপাখির মাথা সদৃশ এ জারে অন্ত্র রাখা হতো।
9ভরে দেয়া হয়েছে ভেতরের ফাঁপা জায়গা
এখন শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলো অপসারণের জন্য যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হলো, পরিশুদ্ধির জন্য সেই জায়গাটি আবারো তাড়ি দিয়ে ধুয়ে দেওয়া হতো। এরপর মৃতদেহকে যেন জীবিতের মতোই দেখায়, যেন চামড়া শুকিয়ে গেলে পেটের দিকে তা ভেতরে ঢুকে না যায়, সেজন্য ফাঁকা জায়গাটি ধুপ এবং অন্যান্য পদার্থ দিয়ে ভরাট করে দেয়া হতো।
10ন্যাট্রনে ঢাকা দেহ
এবার পুরো দেহটিকে ন্যাট্রন (Natron) পাউডারে (এক ধরণের লবণ) ঢেকে দেওয়া হতো। এ ন্যাট্রন পাউডার চামড়ার রঙ খুব বেশি পরিবর্তন করা অথবা শক্ত করা ছাড়াই মৃতদেহের জলীয় পদার্থ শোষণ করে নিতো। দেহটিকে এভাবে ৩৫-৪০ দিন ন্যাট্রনের মাঝে রাখা হতো। এ সময়ের মাঝে দেহটি পুরোপুরি শুকিয়ে যেত। তবে মৃতদেহের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তো বলে নানা রকম শবভূক প্রাণির আগমনও ঘটতো। এদের হাত থেকে মৃতদেহকে বাঁচাতে পাহারাদার নিযুক্ত করা হতো।
11ওয়াবেট
৪০ দিন পর দেহটি নিয়ে আসা হতো ‘ওয়াবেট (Wabet)’ বা বিশুদ্ধিকরণ ঘরে। এখানে এনে এতদিন ধরে মৃতের দেহের শূণ্যস্থান পূরণ করতে থাকা সব পদার্থ বের করে ফেলা হতো। এরপর সেই জায়গাটি ন্যাট্রন, রজনে সিক্ত পাটের কাপড় এবং অন্যান্য পদার্থ দিয়ে পূর্ণ করে দেয়া হতো। এরপর কাটা স্থানগুলো সেলাই করে আর্দ্রতা শোষণের জন্য পুরো শরীরের উপর রজনের আস্তরণ দেয়া হতো। এরপর শুরু হতো ব্যান্ডেজ দিয়ে দেহটিকে মুড়িয়ে দেওয়ার কাজ।
12ব্যান্ডেজে মোড়ানো দেহ
ব্যান্ডেজ করার পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিলো বেশ জটিল এবং এজন্য প্রায় এক থেকে দু’সপ্তাহ সময় লেগে যেতো। শুরু করা হতো মাথা ও গলা দিয়ে। এরপর একে একে হাত, পা এবং পুরো শরীরটিকে ব্যান্ডেজ দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হতো। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদা আলাদা করে ব্যান্ডেজ করা হয়ে গেলে পুরো শরীরটি আরেকবার ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়ানো হতো। নতুন নতুন স্তর দেয়ার সময় সেগুলোর মাঝে রজনকে আঠা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এ ব্যান্ডেজ করার পুরো প্রক্রিয়াটির সময় মমিকরণে জড়িত লোকজন নানা মন্ত্র উচ্চারণ করতো আর মৃতের দেহে নানা মন্ত্রপূত কবচ ছড়িয়ে দিতো। হাত-পা একসাথে বেঁধে দেয়া হতো। হাতের মাঝে ‘বুক অফ ডেড’ থেকে সংগৃহীত প্যাপিরাসে লেখা মন্ত্র আটকানো থাকতো।
13শরীরের বিভিন্ন অংশে লাগানো খাঁচা ও মুখে লাগানো মুখোশ
পুরো দেহটিকে ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়ানো শেষ হলে শরীরের বিভিন্ন অংশে শক্ত খাঁচা আর মাথার অংশে একটি মুখোশ পড়িয়ে দেওয়া হতো। মুখোশটি দেখতে হয় মৃতের মুখের মতো অথবা কোনো মিশরীয় দেবতার মুখের মতো হতো। তাদের ভাষ্যমতে- এটি তাদের পরকালে যাত্রার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। এটি মৃতের আত্মাকে সঠিক দেহ খুঁজে বের করতে সাহায্য করতো।
14মৃতব্যক্তির মমির পাশে স্বজনদের আহাজারির কল্পিত দৃশ্য
মমি করা খাঁচায় আবদ্ধ দেহটিকে এবার একটি কফিনে রেখে দেয়া হতো। কফিনে মৃতব্যক্তির পরকালে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য, মূল্যবান গয়না ইত্যাদি দিয়ে দেওয়া হতো।
এভাবেই শেষ হতো একটি মৃতদেহকে মমিতে পরিণত করার পুরো প্রক্রিয়াটি। এতক্ষণ ধৈর্য ধরে মমিদের সাথে সময় কাটানোর জন্য নির্বাক মমিদের পক্ষ থেকে আপনাকে একটি সবাক ধন্যবাদ।





মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশলের কাহিনী
শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিক আঘাতের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার ফলাফল সবসময়ই সুদুরপ্রসারী হয়ে থাকে। বিভিন্ন খেলাধুলার সময় একপক্ষ যে নিজের দল সম্পর্কে নানা ভীতিকর কথা বলে এবং অপরপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে, সেটিও এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই না। একই কথা বলা যায় যুদ্ধ-বিগ্রহের বেলাতেও। যুদ্ধের সময়ও একটি বাহিনীর নেতারা এমন সব কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করেন যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়া যায়। ফলে চেতনাশক্তিতে দুর্বল সেই প্রতিপক্ষকে তখন যুদ্ধের ময়দানে হারানোটা অনেকটাই সহজ হয়ে যায় তাদের জন্য। পৃথিবীর ইতিহাস থেকে এমনই কিছু মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল তুলে এনেই সাজানো হয়েছে আজকের লেখাটি।
পেলুসিয়ামের যুদ্ধ
৫২৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পার্সিয়ান সাম্রাজ্য এবং প্রাচীন মিশরের মাঝে পেলুসিয়ামের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের ফলে শাসনক্ষমতা তৎকালীন ফারাওদের হস্তচ্যুত হয় এবং সিংহাসনে বসেন পার্সিয়ান রাজা দ্বিতীয় ক্যাম্বাইসেস। এ যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে এ লেখাটা লিখছি না। বরং কীভাবে সূক্ষ্ম এক চালের সাহায্যে পুরো মিশরীয় বাহিনীকে প্রথমে মানসিক ও পরে শারীরিকভাবে পর্যুদস্ত করেছিলো পার্সিয়ানরা, সেটা বলতেই এ লেখা।
শিল্পীর তুলিতে আঁকা পেলুসিয়ামের যুদ্ধশিল্পীর তুলিতে আঁকা পেলুসিয়ামের যুদ্ধ
প্রাচীন মিশরে বিড়াল ছিলো বেশ সমাদৃত এক প্রাণী। বর্তমানে আমাদের কাছে ‘কিউট’, ‘সো সুইট’, ‘এত্তগুলা সুন্দর’ বিড়ালের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভয়ের এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করতো মিশরীয়দের মাঝে। এটা জানতো আক্রমণকারী পার্সিয়ান বাহিনী। সত্যি কথা বলতে, এটা ছিলো মিশরীয়দের এক ধরনের দুর্বলতা। আর এ দুর্বলতার সুযোগ পুরোপুরিই কাজে লাগিয়েছিলো তারা।
বাস্টেটবাস্টেট
পার্সিয়ান বাহিনী তাদের ঢালগুলোতে বিড়ালের ছবি এঁকে নিয়েছিলো। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, পার্সিয়ান বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষার জন্য একেবারে আসল বিড়ালই ব্যবহার করেছিলো। মিশরীয়রা তখন ‘বাস্টেট’ নামে এক দেবীর পূজা করতো যার দেহাবয়ব ছিলো বিড়ালের মতোই। তাকে তারা বিড়াল, নিরাপত্তা, আনন্দ, নৃত্য, সঙ্গীত, পরিবার ও ভালোবাসার দেবী মনে করতো। তাই বাস্টেটের প্রতীকে আক্রমণ করতে অস্বীকৃতি জানায় মিশরীয় সৈন্যরা। দ্বিতীয় শতাব্দীর মেসিডোনিয়ান লেখক পলীনাসের মতে, পার্সিয়ান বাহিনীর সম্মুখভাগ সাজানো হয়েছিলো কুকুর, বিড়াল, ভেড়া ও আইবিস পাখির মাধ্যমে। এদের সবগুলোই মিশরীয়দের কাছে বেশ পবিত্র ছিলো। ফলে সেসবে আক্রমণ করতে অনীহাই তাদের প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রীক ঐতিহাসিক টেসিয়াসের মতে, এ যুদ্ধে মিশরীয়রা প্রায় ৫০,০০০ ও পার্সিয়ানরা প্রায় ৭,০০০ সেনা হারায়।
অবশ্য এ যুদ্ধের কারণটাও ছিলো বেশ অদ্ভুত, বলা যায় হৃদয়ের লেনদেন বিষয়ক। গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের মতে, ক্যাম্বাইসেস তৎকালীন মিশরের ফারাও দ্বিতীয় অ্যামাসিসের মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অ্যামাসিস ভেবেছিলেন যে, তার মেয়ে হয়তো প্রকৃত রাণীর মর্যাদা পাবে না। বরং তাকে রাখা হবে উপপত্নী হিসেবে। এটা ভেবে তিনি তার আগের ফারাওয়ের মেয়েকেই নিজের মেয়ে হিসেবে ছদ্মবেশে বিয়ে দিতে পাঠান ক্যাম্বাইসেসের কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য অ্যামাসিসের, কারণ ক্যাম্বাইসেস এ কৌশলটি ধরে ফেলেন। এতেই মারাত্মক ক্ষেপে গিয়ে তিনি মিশর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর কী হলো তা তো শুরুতেই বলেছি।
মেসিডনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ
৩৫৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে শুরু করে গুপ্তঘাতকের হাতে খুন হওয়ার আগে ৩৩৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত প্রাচীন গ্রীক রাজ্য মেসিডনের রাজা ছিলেন দ্বিতীয় ফিলিপ। তাকে যদি চিনতে কষ্ট হয়, তবে জেনে নিন তিনিই বিশ্বখ্যাত আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বাবা।
দ্বিতীয় ফিলিপের ভাষ্কর্যদ্বিতীয় ফিলিপের ভাষ্কর্য
ফিলিপ যখন মেসিডনের শাসনভার নিজ হাতে তুলে নিলেন, তখন সেটি বলার মতো কিছুই ছিলো না। বরং বারবার বহিঃশক্তির আক্রমণে পঙ্গু অবস্থায় ছিলো রাজ্যটি। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার মাত্র বছরখানেকের মাঝেই তিনি সকল অন্তর্কলহ কঠোর হস্তে দমন করলেন এবং মেসিডনকে এক শক্তিশালী রাজ্য বানানোর দিকে এগিয়ে নিতে থাকলেন।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশলে বেশ নিপুণ এক খেলোয়াড় ছিলেন দ্বিতীয় ফিলিপ। চালসিডিয়ান লীগের সাথে যুদ্ধের সময় তিনি স্টাগিরাস শহরটি একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দেন। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মতে, ফিলিপ শহরটি এমনভাবেই ধ্বংস করেছিলেন যে, একজন আগন্তুক যদি কোনো কারণে সেখানে আসতো, তবে সেখানে যে এককালে জনবসতি ছিলো এ কথাটি তাকে বিশ্বাস করাতেও কষ্ট হতো। ফিলিপের এমন কর্মকান্ডে মারাত্মক ভয় পেয়ে অন্যান্য চালসিডিয়ান শহরগুলো বিনা প্রতিরোধে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
শিল্পীর তুলিতে যুদ্ধরত দ্বিতীয় ফিলিপশিল্পীর তুলিতে যুদ্ধরত দ্বিতীয় ফিলিপ
৩৩৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে কীরোনিয়ার যুদ্ধের সময়ও তিনি চমৎকার কৌশল খাটান। এথেন্স ও থীবসের বিদ্রোহীদের রোদ্রের প্রখর তাপের মাঝে দাঁড় করিয়ে রেখে প্রথমে ক্লান্ত করে ছাড়েন তিনি। পরবর্তীতে তাদের তিনি একটি আক্রমণ করেন যা আসলে মূল আক্রমণ ছিলো না। এ আক্রমণের ফলে বিদ্রোহীরা তার বাহিনীকে ধাওয়া করে এগিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু ওদিকে ফিলিপের সৈন্যরা আগে থেকেই এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলো। তাই তারা চারদিক থেকে তখন সেই বিদ্রোহীদের ঘিরে ফেললে তারাই ফাঁদের মাঝে পড়ে যায়। শুরুতে রোদে পুড়ে ক্লান্ত হওয়া সৈন্যরা যখন পরে এভাবে ফাঁদে পা রাখে, তখন তাদের মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
তুর্কী-মোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ তৈমুর লং
তুর্কী-মোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ তৈমুর লং ছিলেন তিমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত পঁয়ত্রিশ বছর ছিলো তার রাজত্ব। আজকের দিনের তুরষ্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ (কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, পাকিস্তান, ভারত, এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত) তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ১৪০৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মারা যান সুপরিচিত এ বিজেতা।
তৈমুর লং-এর ভাষ্কর্যতৈমুর লং-এর ভাষ্কর্য
ঐতিহাসিকদের মতে, তৈমুরের বাহিনীর হাতে প্রায় ১,৭০,০০,০০০ লোক নিহত হয়েছিলো, যা ছিলো তৎকালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ ভাগ। তার হাতে পরাজিতদের ভাগ্য হতো বেশ করুণ। পরাজিতদের খুলি দিয়ে পিরামিড বানানোর কুখ্যাতি আছে তার নামে। আর শত্রুর নামে যদি এমন কিছু প্রচলিত থাকে, তাহলে যে তার প্রতিপক্ষের শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যাবে, তা তো না বললেও চলে।
শিল্পীর কল্পনায় খাঁচায় বন্দী সুলতান প্রথম বায়েজিদশিল্পীর কল্পনায় খাঁচায় বন্দী সুলতান প্রথম বায়েজিদ
কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে- ১৪০১ সালে তার বাহিনীর বাগদাদ আক্রমণে ৯০,০০০ এর মতো মানুষ মারা যায়। মৃতদের খুলি দিয়ে তখন ১২০টি পিরামিড বানানো হয়েছিলো। দিল্লী বিজয়ের পর তার গণহত্যা অনেকদিন ভারতের জনগণের কাছে দুঃস্বপ্নের নামান্তর হয়ে ছিলো। অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিজয়ের পর তিনি বাইজান্টাইন গেট খুলে নিজের প্রাসাদে নিয়ে আসেন। সেই সাথে খাঁচায় বন্দী করে তিনি নিয়ে এসেছিলেন সুলতান প্রথম বায়েজিদকেও যাকে তিনি তার বৈঠকখানায় প্রদর্শনের জন্য রেখে দিয়েছিলেন। তবে এ ব্যাপারে অবশ্য দ্বিমত পোষণ করেন তৈমুরের পক্ষের ঐতিহাসিকেরা। তাদের মতে, তৈমুর তার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। এমনকি তার মৃত্যুর পর তিনি শোকও প্রকাশ করেছিলেন।
মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্রাট চেঙ্গিস খান
চেঙ্গিস খানচেঙ্গিস খান
বিশ্বখ্যাত মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্রাট চেঙ্গিস খানের নাম শোনে নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর তিনি রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন। তার সময়কালে অধিকাংশ ইউরাশিয়া মোঙ্গল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়া কারা খিতাই, ককেশাস ও খারেজমিয়ান সাম্রাজ্য এবং ওয়েস্টার্ন শিয়া ও জিন রাজপরিবারের বিরুদ্ধেও অস্ত্র হাতে নিয়েছিলো চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বাধীন মোঙ্গল বাহিনী। ঐতিহাসিকদের মতে, চেঙ্গিস খানের গোটা জীবনকাল ধরে চলা বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ৪,০০,০০,০০০ লোক প্রাণ হারিয়েছিলেন। মধ্যযুগের বিভিন্ন আদমশুমারি থেকে জানা যায় যে, তার জীবনকালে চীনের জনসংখ্যা প্রায় এক কোটির মতো হ্রাস পেয়েছিলো। ওদিকে ঐতিহাসিকদের মতে, খারেজমিয়ানদের সাথে তার যুদ্ধকালে আধুনিক ইরানের তিন-চতুর্থাংশ লোক প্রাণ হারায়! সব মিলিয়ে, মোঙ্গল বাহিনীর আক্রমণে তখন বিশ্বের প্রায় এগারো শতাংশ লোক প্রাণ হারিয়েছিলো।
যে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনী এত ত্রাসের সঞ্চার করেছিলো গোটা বিশ্বজুড়ে, সেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশলকে খুব গুরুত্ব সহকারে দেখবেন, সেটা তো না বললেও চলে।
চলছে যুদ্ধচলছে যুদ্ধ
যুদ্ধের সময় তিনি ইচ্ছা করেই নিজের বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বাড়িয়ে বলতেন যাতে করে প্রতিপক্ষ সেটা জেনে শুরুতেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বেশি দেখাতে মাঝে মাঝেই তার বাহিনীর ঘোড়ার পিঠে ডামি চড়িয়ে দেয়া হতো। এছাড়া তার বিখ্যাত এক কৌশল ছিলো রাতের বেলায় ক্যাম্পফায়ার জ্বালানোর মাধ্যমে দৃষ্টিভ্রম তৈরি করা। চেঙ্গিসের বাহিনীর সৈন্যদের প্রতি নির্দেশ ছিলো যে, রাতের বেলায় তারা প্রত্যেকেই যাতে কিছুটা দূরে দূরে আগুন জ্বেলে রাখে। এভাবে যখন প্রতিটি সৈন্যই আগুন জ্বালাতো, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাতটা হয়ে উঠতো অনেক বেশি আলোকিত। দূর থেকে শত্রুপক্ষ তাদের দেখতে পেয়ে প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা সম্পর্কে অনুমানে যেমন ব্যর্থ হতো, তেমনি সংখ্যাধিক্যের কথা চিন্তা করে ভড়কেও যেত।
মাঝে মাঝে চেঙ্গিস খানের মেকি পশ্চাদপসরণে শত্রু ভুল বুঝে তার বাহিনীকে তাড়া করে শেষ পর্যন্ত তার তীরন্দাজ বাহিনীর কাছেই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে সবসময় বেশ ভালো জ্ঞান রাখতেন তিনি। পরবর্তীতে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে এ জ্ঞানকেই কাজে লাগাতেন তিনি। তার আরো একটি কৌশল ছিলো উটের গায়ে নাকাড়া লাগিয়ে সেগুলোকেও অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পাঠানো। এতে বাদ্যযন্ত্রের শব্দও প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন তুলে দিত।



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতম যুদ্ধ ব্যাটেল অব স্ট্যালিনগ্রাডের কাহিনী
ক্ষয়ক্ষতি, ভয়াবহতা কিংবা প্রাণহানির বিচারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর যেকোন সময়ের যেকোন যুদ্ধের চেয়ে মারাত্মক। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত টানা ৬ বছর ধরে চলা এই বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৬ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এই বিশ্বযুদ্ধে একদিকে ছিল জার্মানি, জাপান, ইতালি এবং তাদের মিত্রদের নিয়ে গড়া অক্ষশক্তি অন্যদিকে ছিল আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া ও তাদের মিত্রদের নিয়ে গড়া মিত্রশক্তি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব সভ্যতার ইতিহাসে সৃষ্টি করেছিল এক নতুন বাঁকের। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর এতগুলো জাতি ইতিহাসে আর কখনই এভাবে টোটালিটারিয়ান ওয়ারে অর্থাৎ যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। তাই শেষ হয়ে যাওয়ার ৭১ বছর পর আজও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস সমরকৌশলবিদ ও সমরবিদ্যায় আগ্রহীদের যেন চুম্বকের মত আকর্ষণ করে। শুধু তাই নয় সাধারণ মানুষের কাছেও ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর জার্মানদের পরাজয়ের অন্যতম নিয়ামক হিসাবে বিবেচনা করা হয় এডলফ হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে। রাশিয়াতে জার্মান বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল স্ট্যালিনগ্রাডের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে হেরে যাওয়া। তাই বলা চলে এই একটি যুদ্ধই বদলে দিয়েছিল গোটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট।
ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যালিনগ্রাড যুদ্ধের ইতিবৃত্ত নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের প্রতিবেদনটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস কয়েক ভলিউমে লিখেও শেষ করা যাবে না কারণ রাজনৈতিক, সামরিক ও পারিপার্শিকতার বিচারে এই যুদ্ধের ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জটিল এবং সুদূরপ্রসারী। তাই পাঠকের কাছে সহজবোদ্ধ করে উপস্থাপনের জন্য এই প্রতিবেদনটি শুধু স্ট্যালিনগ্রাড যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
হিটলারের রাশিয়া আক্রমণ
২২ জুন ১৯৪১, ইতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিন এডলফ হিটলারের নির্দেশে জার্মান আর্মির এক বিশাল বহর সোভিয়েত ইউনিয়ন জয় করার উদ্দেশ্যে পূর্বদিকে যাত্রা শুরু করল। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল অপারেশন বারবারোসা। তিনটি বড় বড় সেনাদলে বিভক্ত জার্মান বাহিনীর সংখ্যা কম করে হলেও ত্রিশ লক্ষের কম ছিল না। মোট দেড়শটি বিভিন্ন ডিভিশনের সাথে ছিল তিন হাজার ট্যাংক এবং অজস্র আর্টিলারি পিস। ধরা হয় বিংশ শতাব্দীর সেরা আর্মি ছিল রাশিয়া দখল করতে যাওয়া হিটলারের জার্মান বাহিনী।
অপারেশন বারবারোসার কিছু দুর্লভ ছবি source: https://s-media-cache-ak0.pinimg.com/originals/4d/04/1b/4d041b91a7714ce25501671d1f2589f0.jpgঅপারেশন বারবারোসার কিছু দুর্লভ ছবি source: https:s-media-cache-ak0.pinimg.com
যুদ্ধের শুরুতে ফায়ার পাওয়ার কিংবা টেকিনিক্যাল দিক বিবেচনায় জার্মান আর্মি সোভিয়েত রেড আর্মির চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী ছিল। ফলে যা হাওয়ার তাই হল বিভিন্ন ফ্রন্টে পিছু হটতে শুরু করল রেড আর্মি। দুর্বার বেগে একে একে ইউক্রেন হয়ে রাশিয়ার ইউরোপ অংশের অনেকটা দখল করে ফেলল জার্মান সেনারা। হিটলারের লক্ষ্য তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সোভিয়েত রাশিয়াকে পরাজিত করা। ক্রম অগ্রসরমান জার্মান বাহিনী তখন মস্কোর উপকন্ঠে কিন্তু ১৯৪১ এর ডিসেম্বরের প্রচন্ড শীত এবং রেড আর্মির প্রবল প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হয় যায় জার্মান আর্মির মস্কো অভিযান। যার ফলস্বরূপ সোভিয়েত রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করার পরও সুপিরিয়র জার্মান বাহিনী তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হল। তবে এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না হিটলার। এবার নিজেই দায়িত্ব নিলেন ইস্টার্ণ ফ্রন্টের।
২) মানচিত্রে অপারেশন বারবারোসামানচিত্রে অপারেশন বারবারোসা
এদিকে খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল সোভিয়েত রাশিয়াতে অবস্থান করা জার্মান আর্মির তেলের রিজার্ভ। তাই হিটলার সিদ্ধান্ত নিলেন যে করেই হোক চেচনিয়ার তেলের খনিগুলো দখল করতে হবে। তাই ইস্টার্ণ জোনে সেনাবাহিনীর একটি অংশকে হিটলার পাঠিয়ে দিলেন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ককেশাস অঞ্চলে অর্থাৎ চেচনিয়ার উদ্দেশ্যে। অন্য অংশকে পাঠালেন স্ট্যালিনগ্রাডের দিকে। তবে যতক্ষণে জার্মান আর্মি চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনিতে পৌঁছল ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। খনিগুলো রক্ষা করতে পারবে না জেনে সোভিয়েতরা শত্রুর হাতে পড়ার আগে তেলের খনিগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল।
 জার্মান ট্যাংক বহর source: www.gethistory.co.ukজার্মান ট্যাংক বহর source: www.gethistory.co.uk
স্ট্যালিনগ্রাড আক্রমণ
কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল ভল্গার তীরে অবস্থিত স্ট্যালিনগ্রাড শহরটি। ভল্গা নদী শুধু ইউরোপের দীর্ঘতম নদীই নয়, ভল্গা বিভক্ত করেছে এশিয়া ও ইউরোপ এই দুই মহাদেশকে। ভল্গার ঐ পাড়ে অর্থাৎ এশিয়া অংশে অবস্থিত ছিল স্ট্যালিনগ্রাড। ডিক্টেটর স্ট্যালিন নিজের নামানুসারে রেখেছিলেন শিল্পোন্নত কিন্তু সাজানো গোছানো এই ছোট্ট শহরটির নাম। অন্যদিকে হিটলারের দুচোখের বিষ ছিলেন স্ট্যালিন। হিটলারও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন যেকোন মূল্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যালিনগ্রাড দখলের জন্য।
অগ্রসরমান স্ট্যালিনগ্রাডের দিকে জার্মান সিক্সথ আর্মি source: rarehistoricalphotos.comঅগ্রসরমান স্ট্যালিনগ্রাডের দিকে জার্মান সিক্সথ আর্মি. source: rarehistoricalphotos.com
সে সময়ে জার্মান সিক্সথ আর্মি হিটলারের অত্যন্ত এলিট ফোর্স হিসাবে পরিচিত ছিল। এর আগে ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ইউক্রেনে বেশ কয়েকটি সফল অভিযান শেষে সিক্সথ আর্মির বীরত্বগাঁথা তখন দিকে দিকে। হিটলারের সিক্সথ আর্মি আস্তে আস্তে পৌঁছে গেল ভল্গার পাড়ে। সাত লক্ষ লোকের আবাস্থল স্ট্যালিনগ্রাড তখন জার্মান আর্মির অবরোধের মুখে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ফোর্থ প্যাঞ্জার আর্মিরও যোগ দেওয়ার কথা ছিল সিক্সথ আর্মির সাথে। কিন্তু তেল শঙ্কটে ভুগতে থাকা জার্মানরা কাঙ্খিত গতিতে এগুতে পারছিলনা। বলা বাহুল্য ট্যাংকের জার্মান প্রতিশব্দ হল প্যাঞ্জার। মূলত সিক্সথ আর্মিকে আর্মার সাপোর্ট দিয়ে স্ট্যালিনগ্রাড ঘিরে ফেলতে সাহায্য করার জন্য ফোর্থ প্যাঞ্জার আর্মিকে পাঠানো হয়েছিল।
যুদ্ধের আগের স্ট্যালিনগ্রাড source: www.awesomestories.comযুদ্ধের আগের স্ট্যালিনগ্রাডের চিত্র source: www.awesomestories.com
ব্যাটেল অব স্ট্যালিনগ্রাড
ব্যাটেল অব স্ট্যালিনগ্রাড শুরু হয়েছিল ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসের ২৩ তারিখে। শহরের বাইরে অবস্থান করতে থাকা সিক্সথ আর্মির পদাতিক সৈন্যরা আক্রমণের আগেই জার্মান বিমান বাহিনী ক্রমাগত এক সপ্তাহ ধরে বোমাবর্ষণ করতে থাকে স্ট্যালিনগ্রাডে। দুর্ধর্ষ জার্মান জঙ্গি বিমানের মুহুর্মুহু আক্রমণের ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যায় স্ট্যালিনগ্রাড। তারপর জার্মান পদাতিক সৈন্যরা প্রবেশ করতে শুরু করে স্ট্যালিনগ্রাডে। জার্মান আর্মি মনে করেছিল খুব সহজেই পতন হয়ে যাবে স্ট্যালিনগ্রাডের। কিন্তু নিজের নামানুসারে রাখা শহর স্ট্যালিনগ্রাডকে রক্ষা করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন জোসেফ স্ট্যালিন। তাই জার্মানদের তখনও ধারণা ছিল না আসল যুদ্ধ এখনও বাকি।
৫) ধ্বংসস্তূপের মধ্যে গেরিলাযুদ্ধরত সোভিয়েত রেড আর্মি source: www2today.comধ্বংসস্তূপের মধ্যে গেরিলাযুদ্ধরত সোভিয়েত রেড আর্মি source: www2today.com
শহরে প্রবেশের পর প্রবল বাঁধার সম্মুখীন হল জার্মানরা। তাই প্রত্যাশার চেয়ে ধীর গতিতে আগ্রসর হচ্ছিল জার্মান বাহিনী। শহরের ভগ্ন বিল্ডিংগুলো হয়ে উঠল রাশিয়ানদের একেকটি দুর্গ। দেখা যেত যে এলাকাগুলো জার্মানরা দিনের বেলায় দখল করত সে এলাকাগুলোই রাতে আবার পুনর্দখল করে নিত রাশিয়ানরা। সুপিরিয়র জার্মান আর্টিলারি ও আর্মার কোন কাজেই আসছিল না রাশিয়ান চোরাগুপ্তা গেরিলা হামলার কাছে। পুরো যুদ্ধটা তখন হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট। স্ট্যালিনগ্রাড পরিণত হল জার্মান বাহিনীর কাছে দুঃস্বপ্নপুরীতে। তাই গেরিলা যুদ্ধে ত্যক্ত বিরক্ত জার্মানরা এই যুদ্ধের নাম দিয়েছিল র‍্যাটেনক্রিয়েগ বা ইঁদুরের যুদ্ধ। যুদ্ধের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে স্ট্যালিনগ্রাডের উপকণ্ঠে মামায়েভ কুরগান নামক পাহাড়টির মোট ১৪ বার দখল ও পাল্টা দখল হয়েছিল দুই শিবিরের মধ্যে। প্রচন্ড শীতের মধ্যেও সেবার এই পাহাড়টিতে তুষারের আচ্ছাদন পড়েনি কারণ এতবেশি শেলিং করা হয়েছিল যে পাহাড়ের সমস্ত বরফ গলে গিয়েছিল। তবে এত কিছুর পরেও জার্মান সৈন্যরা শহরের প্রায় ৯০% নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছিল।
সোভিয়েত রেড আর্মির পাল্টা হামলা
কিছুটা সংগঠিত হওয়ার পর ১৯ নভেম্বর শহরের বাইরে রাশিয়ান রিইনফোর্সমেন্ট এসে ঘিরে ধরল জার্মান বাহিনীকে। জার্মান ফোর্থ প্যাঞ্জার আর্মি তখন মাত্র তিন দিনের দূরত্বে ছিল স্ট্যালিনগ্রাড থেকে। তাই পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে পুরো শহরকে ঘিরে ধরা সম্ভব হল না জার্মান আর্মির পক্ষে। অর্থাৎ শহরের ভেতরে থাকা সিক্সথ আর্মি ফোর্থ প্যাঞ্জার আর্মির কোন সাহায্যই পেল না এই সামান্য দেরির কারণে। শুধু তাই নয় ১৯ নভেম্বরের আগে জার্মান বাহিনীকে স্ট্যালিনগ্রাডের বাইরে থেকে সাহায্য করে যাচ্ছিল রুমানিয়, ইতালিয় ও হাঙ্গেরীয়দের সম্মিলিত বাহিনী। কিন্তু রেড আর্মির নতুন সৈন্য সমাগমের পর বাইরের সাহয্য থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল শহরের ভেতরে থাকা জার্মান সিক্সথ আর্মি। অর্থাৎ অবরোধ করতে গিয়ে উল্টো অবরোধের শিকার হল জার্মানরা। রাশিয়ান অবরোধের শুরুর দিকে জার্মানরা চাইলেই অবরোধ ভেঙে পিছু হটে আসত পারত। অন্তত জার্মান সিক্সথ আর্মির প্রধান জেনারেল ফ্রেডরিখ পাউলাস সেটাই চাচ্ছিলেন।
১) ফিল্ড মার্শাল ফ্রেডরিখ পাউলাস http://www.i60.cz/images/00_201509221040370.jpgফিল্ড মার্শাল ফ্রেডরিখ পাউলাস source: www.i60.cz
কিন্তু হিটলার চাইছিলেন জার্মানরা যাতে একচুলও পরিমাণও সরে না আসে। নতুন বছরের শুরুতে অর্থাৎ ১৯৪৩ এর জানুয়ারিতে হিটলার জেনারেল পাউলাসকে প্রমোশন দিয়ে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করলেন উৎসাহ দিতে। আর কড়া নির্দেশ দিলেন যেকোন মূল্যে শহরটি ভেতর থেকেই দখল করতে। এদিকে জার্মানদের গোলাবারুদ এবং রসদ ফুরিয়ে আসছিল। কিন্তু হিটলার আশ্বাস দিলেন বিমানযোগে পৌঁছে দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় রসদ ও অস্ত্র। সে সময় স্ট্যালিনগ্রাডে থাকা জার্মান সৈন্যদের প্রতিদিন দরকার ছিল ৮০০ টন রসদের অথচ বিমানযোগে সাপ্লাই ছিল মাত্র ১৪০ টন! শেষের দিকে অবশ্য হিটলার পিছু হটার অনুমতি দিয়েছিলেন তবে শহরের ভেতরের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুন্ন রেখে। কিন্তু অস্ত্র ও খাবারের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়া জার্মান আর্মির পক্ষে এটি করা আদৌ সম্ভব ছিল না। বরং অনেকগুলো ছোট ছোট পকেটে বিভক্ত হয়ে পড়ল আটকে পড়া জার্মান বাহিনী। অনাহারে ও অস্ত্র শঙ্কটে একে একে মারা পড়তে শুরু করল সিক্সথ আর্মির সৈন্যরা। বলা হয় স্ট্যালিনগ্রাড যুদ্ধে প্রায় দেড় লক্ষ জার্মান সৈন্য মারা পড়েছিল আর বন্দী হয়েছিল আরও ৯৫ হাজার যার মধ্যে মাত্র ৫-৬ হাজার জার্মানকে জীবিত ফেরত দেওয়া হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। তবে সোভিয়েত রেড আর্মির ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।
৭) স্ট্যালিনগ্রাডে ৯৫ হাজার যুদ্ধবন্দী জার্মান সৈন্যদের কিছু অংশ source: www2today.com৭) স্ট্যালিনগ্রাডে ৯৫ হাজার যুদ্ধবন্দী জার্মান সৈন্যদের কিছু অংশ source: www2today.com
জার্মান বাহিনীর আত্মসমর্পণ
প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলার পর, ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণ করল জার্মান বাহিনী। এর আগেই ৩০ জানুয়ারি বন্দী করা হয়েছিল ফিল্ডমার্শাল ফ্রেডরিখ পাউলাসকে। এদিকে জার্মান বাহিনীর এই শোচনীয় পরাজয় সম্পর্কে শুরুতে দেশে থাকা জার্মানদের কিছুই জানানো হয়নি। যুদ্ধচলাকালীন ক্রিসমাসে ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে সারা দেশের মানুষ জানত জীবন বাজি রেখে লড়ে যাচ্ছে বীর জার্মান সেনারা। আর কিছুদিনের মধ্যেই চলে আসবে বিজয়ের সু সংবাদ। কিন্তু ততক্ষণে রেড আর্মির ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে জার্মান আর্মি। একদিকে ডিসেম্বরের প্রচণ্ড শীত এবং অন্যদিকে রসদের অভাবে তাদের পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত নাজুক। তারপরও হিটলারের আদর্শে মোহমুগ্ধ লড়াকু জার্মানরা লড়ে যাচ্ছিল শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। একমাস পরেই ফ্রেব্রুয়ারির শুরুতে সারেন্ডার করতে বাধ্য হল সিক্সথ আর্মি।
একজন আহত যুদ্ধবন্দী জার্মান সৈন্য source: rarehistoricalphotos.comএকজন আহত যুদ্ধবন্দী জার্মান সৈন্য source: rarehistoricalphotos.com
জার্মানদের পরাজয়ের কারণ
স্পষ্টতই হিটলারের কিছু হটকারী সিদ্ধান্ত স্ট্যালিনগ্রাডে জার্মানদের পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিটলার শীত আসার আগেই স্ট্যালিনগ্রাড বিজয়ের ব্যাপারে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে জার্মান বাহিনীকে রাশিয়ার প্রচন্ড শীত মোকাবেলা করার মত পর্যাপ্ত গরম কাপড়ও সরবরাহ করা হয়নি। এছাড়া এত কিছুর পরও জেনারেল পউলিসকে ডিসেম্বরের শুরুতে পিছু হটার অনুমতি দিলে হিটলার হয়ত বাঁচাতে পারতেন তার এলিট সিক্সথ আর্মিকে। সাথে সাথে হয়ত সে যাত্রায় তারা এড়াতে পারতেন ভয়াবহ বিপর্যয়। হয়ত পরের বছর গ্রীষ্মে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারত জার্মান আর্মি। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও জাত্যভিমানে ভুগতে থাকা হিটলারের আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত স্ট্যালিনগ্রাডে শুধু আড়াই লক্ষ জার্মান সৈন্যের কবরই খুঁড়েনি সাথে সাথে সূচনা করেছিল অক্ষশক্তির পরাজয়েরও!
৭)হিটলারের কিছু ঐতিহাসিক ভুলকে জার্মান বাহিনীর ভয়াবহ পরাজয়ের জন্য দায়ী করা হয় source: www.s-media-cache-ak0.pinimg.comহিটলারের কিছু ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্তকে জার্মান বাহিনীর ভয়াবহ পরাজয়ের জন্য দায়ী করা হয় source: www.s-media-cache-ak0.pinimg.com
শেষকথা
এতক্ষণ পর্যন্ত এই প্রতিবেদনে লেখা সব ইতিহাসই কোন না কোনভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী রুশ, মার্কিন কিংবা মিত্রশক্তির ভাষ্য অনুসারে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই এই পর্যায়ে একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবে চলে আসবে স্ট্যালিনগ্রাডে আসলেও কি জার্মানরা হিটলারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে হেরে গিয়েছিল? নাকি এর পেছনে অন্য কোন অজানা কারণ আছে? সেসব কন্সপিরেসি থিওরি এই ফিচারে ইচ্ছে করেই বাদ দেওয়া হয়েছে। কেননা স্ট্যালিনগ্রাডের প্রতিটি ইটে ইটে, প্রতিটি অভুক্ত জার্মান সৈন্যদের ডায়েরিতে কিংবা বোমার আঘাতে চিরপঙ্গু সোভিয়েত যুবকের কান্নায় যে ইতিহাস লেখা হয়েছে তাকে মাত্র দেড় হাজার শব্দে কোনদিনও পুরোপুরি বন্দী করা সম্ভব নয়।



ঐতিহাসিক কিছু অভিশাপের কাহিনী
আমাদের জীবনে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যায় যার ব্যাখ্যা পাওয়া বেশ দুষ্কর। কেউ কেউ সেগুলোকে কাকতালীয় ঘটনা বলে ভাবতে চান, কেউ আবার একধাপ এগিয়ে গিয়ে সেগুলোকে কারো ‘অভিশাপ’ হিসেবে ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ইতিহাসেও এমন কিছু কাকতালীয় ঘটনা আছে যা অনেকের কাছেই অভিশাপ হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসের বিখ্যাত তেমনি কিছু অভিশাপের কাহিনী নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখা।
তৈমুর লং-এর হুঁশিয়ারি
তুর্কী-মোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ তৈমুর লং ছিলেন তিমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছর পর্যন্ত ছিলো তার রাজত্ব। আজকের দিনের তুরষ্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ (কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, পাকিস্তান, ভারত, এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত) তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ১৪০৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মারা যান সুপরিচিত এ বিজেতা।
তৈমুর লং-এর ভাষ্কর্য তৈমুর লং-এর ভাষ্কর্য
এখন কয়েক শতাব্দী সামনে আসা যাক। ১৯৪১ সালের কথা। স্থানীয় মুসলমান বাসিন্দা ও ইমামের সতর্কতা উপেক্ষা করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্টালিন একদল ভূতত্ত্ববিদকে উজবেকিস্তানের সমরকন্দে পাঠিয়েছিলেন তৈমুরের কবরটি খনন করে দেহাবশেষ বের করে আনার জন্য। অবশেষে ১৯৪১ সালের ১৯ জুন দলনেতা মিখাইল গেরাসিমভের নেতৃত্বে তৈমুর লং-এর কবরটি পুনরায় খনন করা হয়। কবর খোড়ার পর তারা একটি কফিন পান যাতে লেখা ছিলো- “যে আমার কবর খুলবে, সে আমার চেয়েও ভয়াবহ এক আক্রমণকারীকে লেলিয়ে দিবে।”
কাকতালীয়ভাবে এর মাত্র দু’দিনের মাথায় হিটলার আক্রমণ করে বসেন সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং এর ধাক্কায় প্রায় ২৬ মিলিয়ন লোক প্রাণ হারায়। ঐতিহাসিকদের মতে, তৈমুরের যুদ্ধাভিযানে ১৭ মিলিয়নের মতো মানুষ মারা গিয়েছিলো। ১৯৪২ সালে স্টালিন তৈমুরের দেহাবশেষ ইসলামিক রীতি অনুযায়ী পুনরায় কবর দেয়ার নির্দেশ দেন। আবারো কাকতালীয়ভাবে এর কিছুদিন পরেই স্টালিনগ্রাদে জার্মান বাহিনী আত্মসমপর্ণ করে।
অভিশপ্ত রত্ন
সতের শতকে ফরাসী রত্ন ব্যবসায়ী জিন-ব্যাপ্টিস্ট ট্যাভার্নিয়ার ভারতে এসে এক দেবীর মূর্তি থেকে ১১৫.১৬ ক্যারাটের নীলরঙা একটি ডায়মন্ড চুরি করেন। এটি সেই দেবীর চোখের জায়গায় লাগানো ছিলো।
জিন-ব্যাপ্টিস্ট ট্যাভার্নিয়ারজিন-ব্যাপ্টিস্ট ট্যাভার্নিয়ার
১৬৬৯ সালে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই এটি ট্যাভার্নিয়ারের কাছ থেকে কিনে নেন। ১৬৭৩ সালে তিনি একে পুনরায় কাটানোর ব্যবস্থা করেন। তখন এটি ‘The Blue Diamond Of The Crown’ অথবা ‘French Blue’ নামে পরিচিত ছিলো। ৭২ বছর বয়সে গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
রাজা চতুর্দশ লুইরাজা চতুর্দশ লুই
চতুর্দশ লুইয়ের রাজস্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রক ছিলেন নিকোলাস ফুকুয়েট, যিনি কিনা কিছু উৎসবে এ ডায়মন্ডটি নিজের শোভাবর্ধনের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। এর কিছুদিন পরেই রাজার সাথে কিছু কারণে তার সম্পর্ক খারাপ হয় এবং তাকে ফ্রান্স থেকে নির্বাসন দেয়া হয়। পরবর্তীতে রাজা এ শাস্তি পরিবর্তন করে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। পিগ্নেরল দূর্গে ফুকুয়েটকে ১৫ বছর বন্দী রাখা হয়।
পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সূত্রে এ ডায়মন্ডটি পান রাজা ষোড়শ লুই। তাই স্ত্রী মেরি অ্যান্টোইনেট এটি ব্যবহার করতেন। ফরাসী বিদ্রোহে দুজনেরই শিরোচ্ছেদ করা হয়েছিলো।
একসময় এ ডায়মন্ডটি যায় ইংল্যান্ডের লর্ড ফ্রান্সিস হোপের কাছে। তিনি আমেরিকান এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। দুজনেরই টাকা ওড়ানোর অভ্যাস ছিলো। ফলে একসময় তারা ডায়মন্ডটি বেঁচে দেন এবং পরবর্তীতে দারিদ্র্য তাদের আরো ঘিরে ধরেছিলো।
ডাচ রত্ন ব্যবসায়ী উইলহেল্‌ম ফল্‌সের হাতে ডায়মন্ডটি পড়লে তিনি এটিকে আবারো কেটেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিজের ছেলের হাতে তিনি খুন হন। ছেলেটি নিজেও আত্মহত্যা করেছিলো।
গ্রীক বণিক সাইমন মাওন্‌কারিড্‌স একবার ডায়মন্ডটির মালিক হয়েছিলেন। খাঁড়া পাহাড় থেকে গাড়িসহ পড়ে গিয়ে স্ত্রী, সন্তানসহ মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
নীল বর্ণের এ ডায়মন্ডটির সর্বশেষ মালিক ছিলেন আমেরিকার নাগরিক এভালিন ওয়ালশ ম্যাকলীন। ডায়মন্ডটি কেনার আগপর্যন্ত তার জীবন বেশ চমৎকারভাবেই কাটছিলো। ডায়মন্ডটি তিনি মাঝে মাঝেই গলায় ঝোলাতেন। এমনকি কখনো কখনো নিজের পোষা কুকুরের নেকলেসেও শোভা পেতো সেটি। এরপরই যেন তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। প্রথমেই মারা যান তার শাশুড়ি। এরপর মাত্র নয় বছর বয়সে মারা যায় তার ছেলে। পরবর্তীতে আরেক মহিলার আশায় তাকে ছেড়ে যান তার স্বামী (যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত এক মানসিক হাসপাতালে মারা যান)। পঁচিশ বছর বয়সে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবনের ফলে মারা যায় তার মেয়ে। অর্থ সংকটে ভুগে নিজের সহায়-সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। ঋণগ্রস্ত অবস্থায়ই মারা যান এভালিন।
এভালিন ওয়ালশ ম্যাকলীনএভালিন ওয়ালশ ম্যাকলীন
এভালিনের বেঁচে থাকা সন্তানেরা এ ডায়মন্ডটি হ্যারি উইনস্টন নামে আরেক লোকের কাছে বিক্রি করে দেন। নয় বছর পর তিনি এ ডায়মন্ডটি স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টোরিতে কিছু অর্থের বিনিময়ে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেন। সেই ডায়মন্ড নিয়ে যাওয়া ডাকপিয়ন জেমস টড এক ট্রাক দুর্ঘটনার শিকার হয়েও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে। কিছুদিন পরই বেচারার স্ত্রী ও পোষা কুকুরটি মারা যায়। আরেকটি দুর্ঘটনায় মাথাতেও আঘাত পেয়েছিলেন টড। আরেকবার তার বাড়িতেও আগুন ধরে গিয়েছিলো।
অবশেষে ১৯৫৮ সাল থেকে ডায়মন্ডটি স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামেই আছে। এরপর থেকে একে ঘিরে আর কোনো দুর্ঘটনার কথা শোনা যায় নি।
মমি রহস্য
১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কথা। অস্ট্রিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ওট্‌জাল পর্বতমালায় খুঁজে পাওয়া গেলো প্রায় ৩,৩০০ বছরের পুরনো এক প্রাকৃতিক মমির সন্ধান। জায়গার নাম অনুযায়ী মমিটির নাম রাখা হলো ওটজি। সন্ধান পাবার বছরখানেক পর থেকেই ওটজিকে ঘিরে এমন সব কান্ডকারখানা ঘটতে থাকলো যে, লোকে তাকে অভিশপ্ত ভাবা শুরু করে দিলো।
ওটজিওটজি
ওটজিকে প্রথম দেখতে পান জার্মান ট্যুরিস্ট হেলমুট সাইমন। ২০০৪ সালে হাইকিংয়ের সময় পড়ে গিয়ে মারা যান তিনি। তিনি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রথম ওটজিকে দেখেছিলেন, এর কাছাকাছি জায়গাতেই তার মৃত্যু হয়। সাইমনের নিখোঁজ হবার খবর পাওয়া গেলে তাকে খুঁজে বের করতে এক উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয় যার প্রধান ছিলেন ডিয়েটার ওয়ারনেক। সাইমনের মৃতদেহ খুঁজে পাবার পর আয়োজন করা হয় শেষকৃত্যানুষ্ঠানের। এর এক ঘন্টার মাথায় হার্ট অ্যাটাকে মারা যান ওয়ারনেক। এপ্রিলে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে মারা যান প্রত্নতত্ত্ববিদ কন্‌রাড স্পিন্ডলার যিনি প্রথম ওটজির দেহটি পরীক্ষা করেছিলেন। ওটজিকে নিয়ে পরীক্ষা করা ফরেনসিক টিমের প্রধান রেইনার হেন তাকে নিয়ে এক লেকচার দিতে যাবার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। কার্ট ফ্রিৎজ নামক যে পর্বতারোহী হেনকে ওটজির কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিও তুষারধ্বসে মারা যান। আবার ওটজিকে বরফের নিচ থেকে তুলে আনার দৃশ্য ধারণ করা অস্ট্রিয়ান সাংবাদিক রেইনার হোয়েলজ্‌ল মারা যান ব্রেইন টিউমারে।
রহস্যময় চেয়ার
এখনের ঘটনাটি একটু অদ্ভুত। এজন্য ১৭০২ সালের উত্তর ইয়র্কশায়ারে চলে যেতে হবে আমাদের। থমাস বাস্‌বি নামক এক লোক শ্বশুরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে তাকে খুন করে বসে। বাস্‌বির আবার মাঝে মাঝেই মদ্যপানের অভ্যাস ছিলো। তার প্রিয় চেয়ারে তার শ্বশুর বসায় তিনি তাকে খুন করেছিলেন!
এরপর যথারীতি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি। বাস্‌বির মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আগে তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি চান একবার সেই পানশালায় যাবার। তারপর সেখানে গিয়ে তিনি অভিশাপ দিয়ে আসেন যে, তার চেয়ারে যে লোকই বসবে, শীঘ্রই তার মৃত্যু হবে। বাস্‌বির এমন অভিশাপের কথা শুনে তখনকার সময়ের মানুষ ভয়ে আর সেই চেয়ারে বসতে সাহস পেত না।
বাস্‌বির সেই চেয়ার মিউজিয়ামের দেয়ালে ঝোলানোবাস্‌বির সেই চেয়ার মিউজিয়ামের দেয়ালে ঝোলানো
এরপর একসময় আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পানশালাটিতে প্রায় সময়ই বিমান বাহিনীর সদস্যরা ভিড় জমাতেন। খেয়াল করে দেখা গেলো- যারা বাস্‌বির সেই চেয়ারটিতে বসছেন, তারা কেউই আর যুদ্ধ থেকে ফেরত আসেন নি! পরবর্তীকালে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের দুজন সদস্য, এক মিস্ত্রী, এক শ্রমিক এবং এক মালামাল সরবরাহকারী ব্যক্তি এ চেয়ারে বসেছিলেন। এদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো দুর্ঘটনায় মারা যান।
সব শেষে পানশালার মালিক নিজেও এতে ভয় পেয়ে যান। তিনি এরপর থার্স্ক মিউজিয়ামে এ চেয়ারটি দিয়ে দেন। সেখানেও চেয়ারটিকে দেয়ালের সাথে ঝুলিয়ে রাখা আছে যাতে কেউ সেখানে বসতে না পারে! অর্থাৎ এতসব অপঘাতে মৃত্যু দেখে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষও ‘বাস্‌বির অভিশাপ’ নামক কুসংস্কারটিতে বিশ্বাস করেছিলো।
রাসপুতিনের ভবিষ্যৎ বাণী
গ্রিগরি রাসপুতিনের নাম শুনেছেন অনেকেই। সাইবেরিয়ার কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া রাসপুতিন তার অদ্ভুত রোগ সারানোর ক্ষমতার বলে একসময় রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসের সভায় জায়গা করে নিতে সক্ষম হন। রাসপুতিনের করা ভবিষ্যৎ বাণীগুলোর কার্যকারিতা দেখে সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রা ফিওদোরোভ্‌না তাকে তার ব্যক্তিগত পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন।
গ্রিগরি রাসপুতিনগ্রিগরি রাসপুতিন
রাসপুতিন অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন এক জাদুকর হিসেবে। সেন্ট পিটার্সবার্গের অভিজাত ব্যক্তিবর্গ তার এমন কাজকর্মে মুগ্ধ হলেও তার মতো একজন লোকের সাথে সম্রাজ্ঞীর ঘনিষ্ঠতাকে তারা সহজভাবে নিতে পারে নি। তাই এরপর থেকে নানা কারণে শুরু হয় তাকে হত্যার নানা প্রচেষ্টা। বিষ খাইয়ে, অমানুষিকভাবে পিটিয়ে, এমনকি বেশ কয়েকটি গুলি গায়ে লাগার পরও বেঁচে যান তিনি। অবশ্য শেষ রক্ষা আর হয় নি। শেষ পর্যন্ত হাত-পা বেঁধে এক নদীতে ফেলে দিলে সেখানেই ডুবে মৃত্যু হয় বেচারার।
মৃত্যুর আগে রাসপুতিন সম্রাটের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তাকে খুন করা হলে রাশিয়ার রাজ পরিবারের কী হবে সেই সম্পর্কে চমৎকার ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন যে, আর বছরখানেকের মাঝেই সপরিবারে নিহত হবেন সম্রাট এবং সত্যি সত্যিই সেটি ঘটেছিলো। মাত্র দেড় বছরের মাঝেই সম্রাট, সম্রাজ্ঞী এবং তাদের পাঁচ সন্তান নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন।
সপরিবারে সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসসপরিবারে সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাস
ইতিহাস ঘাঁটলে এমন আরো অনেক ঘটনারই সন্ধান পাওয়া যাবে। আপনি এটাকে কাকতালীয়ও ভাবতে পারেন, আবার অভিশাপও ভাবতে পারেন। এ অধিকার আপনার আছেই। তবে এসব কাকতালীয় ঘটনার একের পর এক ঘটে যাওয়ার ইতিহাস মাঝে মাঝে আমাদের আশ্চর্য করে বৈকি!





জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গঃ ইতিহাসের এক গোয়েন্দা দম্পতির কাহিনী
আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগেকার কথা। ১৯১৮ সালের ১২ মে নিউ ইয়র্কের ইহুদী অভিবাসী একটি পরিবারে জন্ম নেয় এক ছেলে, নাম তার জুলিয়াস রোজেনবার্গ। ছোট্ট জুলিয়াসের বয়স যখন এগারো বছর, তখন তার পরিবার নিউইয়র্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লোয়ার ইস্ট সাইডে চলে আসে। সেখানকার দোকানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো তার বাবা-মা। অন্যদিকে সিওয়ার্ড পার্ক হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে নিজের পড়াশোনাকে চালিয়ে নিতে থাকে জুলিয়াস। নিউইয়র্কের সিটি কলেজে পড়ার সময় আমেরিকার ইয়াং কমিউনিস্ট লীগের একজন নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৩৯ সালে একই কলেজ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রী নিয়ে বের হন জুলিয়াস।
এবার আসা যাক আরেকজনের কথায়। আবারও এক শতাব্দী আগেকার প্রেক্ষাপটে ফিরে যেতে হবে। ১৯১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক শহরেরই আরেক ইহুদী পরিবারে জন্ম নেয় এক মেয়ে, নাম তার ইথেল গ্রীনগ্লাস। বড় হয়ে একইসাথে অভিনেত্রী ও গায়িকা হবার ইচ্ছা ছিলো ইথেলের। কিন্তু ভাগ্যে বোধহয় সেটা লেখা ছিলো না। তাই একসময় জীবিকার তাগিদে শিপিং কোম্পানিতে যোগদান করেন তিনি। সেখানে কর্মচারীদের বেতন নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে বিবাদের জের ধরে একসময় ইথেলও যোগ দেন ইয়াং কমিউনিস্ট লীগে।
800px-julius_and_ethel_rosenberg_nywtsইথেল ও জুলিয়াস রোজেনবার্গ
খেয়াল করে দেখুন, জুলিয়াস এবং ইথেল দুজনই ইয়াং কমিউনিস্ট লীগে যোগ দিয়েছিলেন। আপনি যা ভাবছেন, ঠিক তা-ই ঘটেছিলো তাদের মাঝে। ১৯৩৬ সালে এ দুজনের পরিচয় হয়। আস্তে আস্তে এ পরিচয় গাঢ় হতে থাকে। অবশেষে ১৯৩৯ সালে শুভ কাজটাও সেরে ফেলেন তারা, হয়ে যান ইথেল-জুলিয়াস দম্পতি। বিয়ের পর ইথেল অবশ্য স্বামীর সাথে মিলিয়ে তার নামও পরিবর্তন করে ইথেল রোজেনবার্গ রেখেছিলেন। আর আমাদের আজকের ইতিহাসের গল্প শুরু এখান থেকেই।
১৯৪০ সালে নিউ জার্সির ফোর্ট মনমাউথে অবস্থিত আর্মি সিগনাল কর্প্‌সের ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন জুলিয়াস। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সেখানে প্রকৌশলী-পরিদর্শক হিসেবে কাজ করেন তিনি। কিন্তু এরপর বেঁধে যায় বিপত্তি। আর্মি কর্তৃপক্ষ অতীতে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে জুলিয়াসের যোগসূত্রের কথা জেনে যায়। যেহেতু ইলেকট্রনিক্স, কমিউনিকেশন, রাডার, দূর নিয়ন্ত্রিত মিসাইল ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি নিয়ে ল্যাবরেটরিটিতে কাজ করা হতো, তাই নিরাপত্তার স্বার্থে জুলিয়াসকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এর মাঝেই অবশ্য আজকের লেখার যে মূল উপজীব্য, অর্থাৎ গোয়েন্দাগিরি, তার খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছিলেন জুলিয়াস রোজেনবার্গ। ১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্ট পার্টিরই এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সহায়তায় তুখোড় গোয়েন্দা সিম্‌য়োন সিম্‌য়োনভের সাথে পরিচয় ঘটে তার। সিম্‌য়োনভই জুলিয়াসকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এনকেভিডি (Narodnyi Komissariat Vnutrennikh Del – People’s Commissariat for Internal Affairs)- এর সাথে যুক্ত হতে সাহায্য করেন।
176px-emblema_nkvdএনকেভিডির প্রতীক
এরপরই শুরু হয়ে যায় জুলিয়াসের গোয়েন্দাসুলভ কাজকারবার। অত্যন্ত গোপনীয় হাজারখানেক নথি তিনি ধীরে ধীরে পাচার করে দেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। এ নথিগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা বোঝাতে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। জুলিয়াস যেসব তথ্য পাচার করেছিলেন তার মাঝে একটি প্রক্সিমিটি ফিউজের পূর্ণাঙ্গ বিবরণও ছিলো। ১৯৬০ সালে গ্যারি পাওয়ার্স নামে আমেরিকান এক পাইলট সিআইএ’র U-2 মডেলের একটি স্পাই প্লেন চালাচ্ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশসীমায়। জুলিয়াসের সরবরাহ করা মডেলটির এক উন্নত সংস্করণ ব্যবহার করেই সেই স্পাই প্লেনটিকে ভূপাতিত করা হয়।
800px-rian_archive_35172_powers_wears_special_pressure_suitগ্যারি পাওয়ার্স usaf-u2-750pixLockheed U-2S
পরবর্তীতে জুলিয়াসের হাত ধরেই এনকেভিডিতে আরো যোগ দেন জোয়েল বার, আলফ্রেড সারান্ট, উইলিয়াম পার্ল ও মর্টন সোবেল। ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ফর অ্যারোনটিক্সের হাজার হাজার গোপন নথি সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেন পার্ল। এর মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীয় প্রথম জেট ফাইটার লকহিড পি-৮০ শুটিং স্টারের পূর্ণাঙ্গ ডিজাইনও ছিলো!
ADB-ZB Mittelstädt, 19.4.1976 Berlin: Robert Meeropol-Rosenberg zu DDR-Besuch eingetroffen Robert Meeropol (2 v.r.), der Sohn des vom USA-Imperialismus ermordeten Ehepaars Ethel und Julius Rosenberg, ist am 19.4.1976 in Berlin eingetroffen. Robert Meeropol, der auf Einladung des Friedensrates der DDR und des Paul-Robeson-Komitees zu einem mehrtägigen Besuch in der DDR weilt, wird von dem mitverurteilten im Rosenberg-Prozeß Morten Sobell (l.) und dem Rechtsanwalt der Rosenberg-Sohne, Marshal Perlin (2 v.l., dahinter) begleitet. Auf dem Flughafen Berlin-Schönefeld wurden die Gäste vom Vorsitzenden des Paul-Robeson-Komitees, Prof. Dr. Franz Loeser (r.), sowie dem Generalsekretär des DDR-Friedensrates, Werner Rümpel, herzlich willkommen geheißen.মর্টন সোবেল (বামে) p80-1_300Lockheed P-80 Shooting Star
জুলিয়াসের স্ত্রী, অর্থাৎ ইথেল রোজেনবার্গের ভাই ডেভিড গ্রীনগ্লাস কাজ করতেন লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির টপ সিক্রেট ম্যানহাটন প্রজেক্টে। এ কথা জেনে তাকেও নিজেদের দলে টানতে পরামর্শ দেন জুলিয়াসের প্রশিক্ষক আলেকজান্ডার ফেক্লিসভ। কিছুদিনের মাঝে ডেভিডও হয়ে যান সেই গোয়েন্দা চক্রেরই এক সদস্য। ১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জুলিয়াস ম্যানহাটন প্রজেক্টের আরেক ইঞ্জিনিয়ার রাসেল ম্যাকনাট্‌কে তাদের দলের অন্তর্ভুক্ত করেন। জুলিয়াসের এমন কাজে খুশি হয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে ১০০ ডলার বকশিশ দিয়েছিলো। ম্যাকনাটের যোগদানের ফলে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে ক্ষেপনাস্ত্র বানানোর তথ্যভান্ডারে গোপন প্রবেশাধিকার পেয়ে যায় সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ।
klaus_fuchs_-_police_photographক্লস ফুখ্‌স u-s-_vs-_julius__ethel_rosenberg_and_martin_sobell_government_exhibit_5_photograph_of_harry_gold_-_nara_-_278750হ্যারি গোল্ড
এভাবে গোপনে গোপনে আমেরিকার গোপনীয় অনেক তথ্য হস্তগত করে বেশ দ্রুতগতিতেই উন্নতি করছিলো সোভিয়েত প্রযুক্তি। বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট সকাল সাতটায় যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের প্রথম পারমাণবিক ক্ষেপনাস্ত্র আরডিএস-১ এর সফল পরীক্ষা চালায়, তখন স্তম্ভিত হয়েছিলো পশ্চিমা বিশ্ব। এ নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়েই ১৯৫০ সালে অনুসন্ধানকারী কর্তৃপক্ষের চোখে ধরা পড়ে যে, ম্যানহাটন প্রজেক্টে কাজ করা তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী ক্লস ফুখ্‌স যুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়েই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন গোপন নথি সরবরাহ করে এসেছেন! কর্তৃপক্ষের জেরার মুখে ফুখ্‌স জানান যে, কেমিস্ট হ্যারি গোল্ড তার বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করতেন। একই বছরের ২৩ মে গোল্ডকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি তার অপরাধ স্বীকার করে নেন এবং জানান যে, ডেভিড গ্রীনগ্লাসও তাদের চক্রের এক সদস্য।
এভাবে ম্যানহাটন প্রজেক্টে কাজ করা সকল গোয়েন্দার পরিচয়ই ফাঁস হয়ে যায়। জুনে গ্রেফতার করা হয় ডেভিডকে। তিনিও দোষ স্বীকার করে ফাঁস করে দেন নিজের ভগ্নি এবং ভগ্নিপতির মাধ্যমে এ গোয়েন্দা চক্রে যুক্ত হওয়ার তথ্য। ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ বলে কথা! এ চক্রের আরেক সদস্য সোবেল পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছিলেন।
১৯৫০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, সেদিন রুদ্ধদ্বার মিটিংয়ে বসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উচ্চপদস্থ বিশ কর্মকর্তা। জুলিয়াস রোজেনবার্গই যে পালের গোদা, তা নিয়ে তাদের কারোরই সন্দেহ ছিলো না। এ নিয়ে তাদের হাতে সাক্ষী-প্রমাণও ছিলো যথেষ্ট। কিন্তু সমস্যা বেঁধে যায় ইথেলকে নিয়ে। কারণ তার বিরুদ্ধে শক্ত কোনো প্রমাণই তাদের হাতে ছিলো না।
1024px-david_greenglass_mugshotডেভিড গ্রীনগ্লাস ruth_greenglass_mugshotরুথ গ্রীনগ্লাস
ইথেলকে ফাঁদে ফেলতে ব্যবহার করা হলো তারই ভাই ডেভিড এবং ডেভিডের স্ত্রী রুথকে। আগে ডেভিড বলেছিলেন, নিউ ইয়র্কের এক রাস্তার মোড়ে তিনি জুলিয়াসকে ফাইলগুলো দিয়েছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যখন তাকে জানালো যে, তথ্য পরিবর্তন করে সাক্ষ্য দিলে রুথকে ছেড়ে দেয়া হবে, তখন তিনি বক্তব্য পাল্টে ফেললেন। তখন তিনি বললেন যে, রোজেনবার্গ দম্পতির নিউ ইয়র্কের ফ্ল্যাটের বেড রুমে তিনি জুলিয়াসকে ফাইলগুলো দিয়েছিলেন। পরে জুলিয়াসের অনুরোধে ইথেল সেগুলো টাইপ করে রাখেন। রুথও তার স্বামীর কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেন, তবে আরো বেশি রংচং মাখিয়ে। এর ফলে রুথের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ তুলে নেয়া হয়, যদিও গোয়েন্দা চক্রের তিনিও ছিলেন এক সদস্য!
সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ যোগাড় শেষে ১৯৫১ সালের ৬ মার্চ বিচার শুরু হয়। বিচারক হিসেবে ছিলেন আর্ভিং কফম্যান। ডেভিড গ্রীনগ্লাস জানান যে, তিনি জুলিয়াসের হাতে একটি ইমপ্লোশান টাইপ এটম বোমের প্রস্থচ্ছেদের স্কেচ তুলে দিয়েছিলেন। এছাড়া গুপ্তচর হিসেবে নিজের বোনের জড়িত থাকার ব্যাপারেও বলেন তিনি। ২৯ মার্চ জুলিয়াস ও ইথেল রোজেনবার্গ দুজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ৫ এপ্রিল গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাদের মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়া হয়।
greenglass_bomb_diagramইমপ্লোশান টাইপ এটম বোমের প্রস্থচ্ছেদের সেই স্কেচ julius_rosenberg_mugshotপুলিশের কাছে থাকা জুলিয়াসের ছবি ethel_rosenberg_mugshotপুলিশের কাছে থাকা ইথেলের ছবি
রায় শুনে এটিকে রাজনৈতিক একটি সাজানো নাটক উল্লেখ করে জুলিয়াস রোজেনবার্গ সেদিন বলেছিলেন- “This death sentence is not surprising. It had to be. There had to be a Rosenberg case, because there had to be an intensification of the hysteria in America to make the Korean War acceptable to the American people. There had to be hysteria and a fear sent through America in order to get increased war budgets. And there had to be a dagger thrust in the heart of the left to tell them that you are no longer gonna get five years for a Smith Act prosecution or one year for contempt of court, but we’re gonna kill ya!”
জুলিয়াস ও ইথেলের মৃত্যুদন্ডের এ রায়ে অবশ্য আমেরিকা জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আমেরিকার অনেকেই মনে করতেন যে, তারা নির্দোষ। তাই তাদের মৃত্যুদন্ডের রায়ের প্রতিবাদে ক্যাম্পেইন শুরু হয়ে যায়। এছাড়া অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, হ্যারল্ড উরের মতো নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী এবং সমাজের আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এ রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন তখন। কিন্তু ১৯৫৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সবার আবেদন নাকচ করে দেন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার।
অবশেষে ১৯৫৩ সালের ১৯ জুন সূর্যাস্তের সময় ইলেকট্রিক চেয়ারে রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। দুজনের মৃত্যুদন্ড আলাদাভাবে কার্যকর করা হয়েছিলো। প্রথমে চেয়ারে আসেন জুলিয়াস রোজেনবার্গ। প্রথম ইলেকট্রিক শকেই মারা যান তিনি। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা যায় ইথেলের বেলায়। প্রথম শকে তিনি মারা যান নি। নিয়ম মোতাবেক তিনবার শক দেয়ার পরও ডাক্তাররা পরীক্ষা করে তার হৃদস্পন্দন খুঁজে পান! তখন বাধ্য হয়ে আরো দু’বার শক দেয়া হয় তাকে। এরপরই মারা যান ইথেল রোজেনবার্গ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, তখন ইথেলের মাথা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গিয়েছিলো!
আর এভাবেই সমাপ্তি ঘটেছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে কাজ করা এক গোয়েন্দা দম্পতির জীবনের। তাদের কবর দেয়া হয়েছিলো নিউ ইয়র্কের ওয়েলউড সিমেট্রিতে। সেদিন তাদের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে প্রায় ৫০০ লোক অংশ নিয়েছিলো। আর বাইরে দাঁড়িয়েছিলো প্রায় ১০,০০০ এর মতো জনতা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন